যুক্তরাষ্ট্রের বড় শহরগুলোতে শিশুদের সংখ্যা দ্রুত কমে যাচ্ছে। গত এক দশকে পাঁচ লাখের বেশি মানুষের বসবাস রয়েছে—এমন বড় শহরগুলোতে ১৮ বছরের কম বয়সী শিশুর সংখ্যা কমেছে প্রায় ৬ শতাংশ। একই সময়ে পুরো দেশজুড়ে এই কমার হার প্রায় ১ শতাংশ।
শুধু মোট শিশুর সংখ্যাই নয়, ছোট শিশুদের সংখ্যাও উল্লেখযোগ্যভাবে কমছে। বড় শহরগুলোতে পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুর সংখ্যা গত এক দশকে কমেছে প্রায় ১৫ শতাংশ। জাতীয় পর্যায়ে এই বয়সী শিশুর সংখ্যা কমেছে প্রায় ৭ শতাংশ।
শহরগুলোতে জনসংখ্যা বাড়লেও অনেক জায়গায় শিশু কমে যাচ্ছে। এর পেছনে একদিকে সন্তান জন্মের হার কমে যাওয়া, অন্যদিকে সন্তানসহ পরিবারের শহর ছেড়ে অপেক্ষাকৃত কম খরচের শহর, উপশহর বা ছোট এলাকায় চলে যাওয়াকে বড় কারণ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
বড় শহরেই বেশি প্রকট সংকট
যুক্তরাষ্ট্রের পাঁচ লাখের বেশি জনসংখ্যার ৩৮টি বড় শহরের মধ্যে প্রায় দুই-তৃতীয়াংশে শিশুদের সংখ্যা কমেছে। এর মধ্যে ১৭টি শহরে মোট জনসংখ্যা বাড়লেও শিশু কমেছে।
অন্যদিকে ১৩টি শহরে শিশুর সংখ্যা বেড়েছে। এসব শহরের বেশির ভাগই তুলনামূলকভাবে কম ব্যয়বহুল এবং মধ্যবিত্ত পরিবারের জন্য বসবাসের সুযোগ বেশি। এসব শহরে এক দশকে শিশুর সংখ্যা প্রায় ৭ শতাংশ বেড়েছে, যেখানে মোট জনসংখ্যা বেড়েছে প্রায় ১২ শতাংশ।
অর্থাৎ শুধু শহরের জনসংখ্যা বাড়লেই সেখানে পরিবার ও শিশু বাড়ছে—এমন নয়। বসবাসের খরচ, নিরাপত্তা, শিক্ষা, শিশু দেখাশোনার ব্যয় এবং জীবনযাত্রার মান এখন পরিবারগুলোর শহর বেছে নেওয়ার ক্ষেত্রে বড় ভূমিকা রাখছে।
বাড়ির দাম ও শিশুর যত্নের খরচ বড় বাধা
সান হোসেতে গত এক দশকে পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুর সংখ্যা কমেছে প্রায় ৩৪ শতাংশ, যা বড় শহরগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি। উচ্চ আয়ের শহর হওয়া সত্ত্বেও সেখানে পরিবার গড়ার খরচ অনেকের নাগালের বাইরে চলে গেছে।
এক দম্পতি অগ্নিনির্বাপক ও শিক্ষক হিসেবে কাজ করেও শহরে নিজেদের বাড়ি কেনার সামর্থ্য পাননি। দুই সন্তানের জন্য শিশু দেখাশোনার খরচ বছরে প্রায় ২৫ হাজার ডলার করে হওয়ায় পরিবারের ওপর আর্থিক চাপও ছিল বেশি। শেষ পর্যন্ত তারা আইডাহোর একটি ছোট শহরে চলে যান। সেখানে তুলনামূলক বড় বাড়ি কিনতে পেরেছেন এবং পরে তাদের তৃতীয় সন্তানও জন্ম নেয়।
আলবুকার্কিতে শিশুদের সংখ্যা কমেছে প্রায় ১৫ শতাংশ। মিলওয়াকিতে কমেছে প্রায় ১১ শতাংশ। ফিলাডেলফিয়ায় কমেছে প্রায় ৬ শতাংশ।
নিউইয়র্কেও পরিবার হারাচ্ছে শহর
যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে ব্যয়বহুল শহরগুলোর একটি নিউইয়র্কেও শিশুদের সংখ্যা গত এক দশকে প্রায় ৮ শতাংশ কমেছে।
দীর্ঘ সময় ধরে শহরটিতে সন্তানসহ মধ্যবিত্ত পরিবারের সংখ্যা কমেছে। একই সময়ে একক ব্যক্তি কিংবা সন্তানহীন পরিবারের সংখ্যা বেড়েছে। বাড়িভাড়া, শিশু দেখাশোনার খরচ এবং সন্তান পালনের সামগ্রিক ব্যয় অনেক পরিবারের জন্য বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
নিউইয়র্কে তিন বা তার বেশি শোবার ঘর রয়েছে এমন বাড়ির ভাড়া অনেক পরিবারের সামর্থ্যের বাইরে। আবার সন্তান নেওয়ার পরিকল্পনা করলেও চিকিৎসা, প্রসব, শিশুর যত্ন ও শিক্ষার সম্ভাব্য ব্যয় নিয়ে অনেকে পিছিয়ে যাচ্ছেন।
পরিবারগুলোকে শহরে ধরে রাখতে বিনা খরচে শিশু পরিচর্যার উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে। তবে এসব উদ্যোগ কতটা পরিবারকে সন্তান নিতে বা শহরে থেকে যেতে উৎসাহিত করবে, তা এখনো পরিষ্কার নয়।
মহামারির পর বদলে গেছে পরিবারের সিদ্ধান্ত
২০০৮-০৯ সালের অর্থনৈতিক সংকটের পর ভালো চাকরির সুযোগের কারণে অনেক মানুষ বড় শহরে থেকে গিয়েছিলেন। কিন্তু পরবর্তী সময়ে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড বিভিন্ন এলাকায় ছড়িয়ে পড়ার সঙ্গে সঙ্গে পরিবারগুলোর সামনে নতুন বিকল্প তৈরি হয়।
করোনাভাইরাস মহামারির সময় ঘরে বসে কাজের সুযোগ সেই পরিবর্তনকে আরও ত্বরান্বিত করে। অনেক পরিবার তখন শহরের ব্যস্ত ও ব্যয়বহুল জীবন ছেড়ে উপশহর কিংবা ছোট শহরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়।
এর পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রে সন্তান জন্মের হারও ধারাবাহিকভাবে কমছে। গত এক দশকে দেশটিতে জন্মের সংখ্যা প্রায় ৯ শতাংশ কমেছে। বিশেষ করে তরুণ বয়সে সন্তান নেওয়ার প্রবণতা কমে যাওয়ায় সামগ্রিক জন্মহারেও প্রভাব পড়েছে।
শহরের অর্থনীতিতে পড়ছে বড় প্রভাব
শিশুর সংখ্যা কমে যাওয়ার প্রভাব শুধু পরিবার বা বিদ্যালয়ে সীমাবদ্ধ থাকছে না। এর সঙ্গে শহরের অর্থনীতি ও ভবিষ্যৎ করব্যবস্থারও সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে।
শিশু ও সন্তানসহ পরিবার সাধারণত খাবার, পোশাক, শিক্ষা, বিনোদনসহ বিভিন্ন পণ্যে বেশি ব্যয় করে। ফলে মধ্যবিত্ত পরিবারের সংখ্যা কমলে স্থানীয় ব্যবসা ও ভোক্তা বাজারেও চাপ তৈরি হতে পারে।
শিশু কমে গেলে সরকারি বিদ্যালয়গুলোতেও শিক্ষার্থী কমে যায়। এতে অনেক শহরকে বিদ্যালয় বন্ধ করা কিংবা ব্যয় কমানোর মতো কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে হচ্ছে। এল পাসোতে শিক্ষার্থী কমে যাওয়ায় কয়েকটি প্রাথমিক বিদ্যালয় বন্ধ করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
অর্থনীতিবিদদের আশঙ্কা, কর্মক্ষম মানুষের তুলনায় বয়স্ক মানুষের সংখ্যা বাড়তে থাকলে ভবিষ্যতে করদাতার সংখ্যা কমতে পারে। তখন শহরের রাজস্ব আয় ও জনসেবা ব্যবস্থার ওপরও চাপ বাড়বে।
নিরাপত্তা ও জীবনযাত্রার মানও গুরুত্বপূর্ণ
শুধু অর্থনৈতিক কারণেই পরিবারগুলো শহর ছাড়ছে না। নিরাপত্তা, ভালো বিদ্যালয়, শিশুদের খেলাধুলার পরিবেশ এবং প্রতিবেশীদের সঙ্গে সামাজিক যোগাযোগও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
মিলওয়াকির এক দম্পতি সন্তান জন্মের পর শহরের জীবন নিয়ে নতুন করে ভাবতে শুরু করেন। বাড়ির সামনে থেকে জিনিস চুরি, ভাঙাচোরা খেলার মাঠ এবং নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ তাদের উপশহরে যাওয়ার পরিকল্পনা করতে বাধ্য করেছে।
তারা এমন একটি জায়গা চান যেখানে তাদের সন্তান নিরাপদে রাস্তায় সাইকেল চালাতে পারবে, ভালো বিদ্যালয়ে পড়তে পারবে এবং আশপাশের শিশুদের সঙ্গে খেলতে পারবে।
শুধু জনসংখ্যা নয়, বদলে যাচ্ছে শহরের চেহারা
যুক্তরাষ্ট্রের বড় শহরগুলোতে শিশু কমে যাওয়ার বিষয়টি তাই কেবল জন্মহার কমার গল্প নয়। এটি একই সঙ্গে বাড়ির মূল্য, ভাড়া, শিশু পরিচর্যার ব্যয়, নিরাপত্তা, শিক্ষা এবং পরিবারের জীবনযাপনের পছন্দের পরিবর্তনের প্রতিফলন।
কিছু শহর তুলনামূলক কম খরচের কারণে পরিবার আকর্ষণ করতে পারছে। কিন্তু ব্যয়বহুল শহরগুলোতে সন্তানসহ মধ্যবিত্ত পরিবার ধরে রাখা ক্রমেই কঠিন হয়ে উঠছে।
ফলে আগামী দিনে যুক্তরাষ্ট্রের বড় শহরগুলোর জন্য বড় প্রশ্ন হবে—কীভাবে শুধু কর্মজীবী একক মানুষ বা সন্তানহীন পরিবার নয়, বরং সন্তানসহ মধ্যবিত্ত পরিবারগুলোকেও শহরে বসবাসে উৎসাহিত করা যায়। কারণ শিশু কমে যাওয়া মানে শুধু আজকের খালি খেলার মাঠ নয়, এটি ভবিষ্যতের কর্মশক্তি, বিদ্যালয়, স্থানীয় বাজার ও নগর অর্থনীতির ওপরও দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রের বড় শহরগুলোতে শিশু কমার এই প্রবণতা নগরজীবনের ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন করে ভাবার প্রয়োজন তৈরি করেছে।
যুক্তরাষ্ট্রের বড় শহরে শিশুদের সংখ্যা কমছে; বাড়ির দাম, শিশু পরিচর্যার খরচ, নিরাপত্তা ও কম জন্মহার পরিবারগুলোকে শহর ছাড়তে বাধ্য করছে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















