ইথিওপিয়ার গ্র্যান্ড রেনেসাঁ বাঁধ নির্মাণ শেষ হয়েছে, কিন্তু নীলনদের পানি ব্যবস্থাপনা নিয়ে মিসর, সুদান ও ইথিওপিয়ার বিরোধের মূল প্রশ্নগুলো এখনো অমীমাংসিত। বাঁধ নির্মাণ শেষ হওয়া কোনোভাবেই এর পরিচালনা, পানি ছাড়ার নিয়ম, তথ্য বিনিময় কিংবা দীর্ঘস্থায়ী খরার সময়ে ভাটির দেশগুলোর পানির নিশ্চয়তা নিয়ে সমঝোতার বিকল্প হতে পারে না।
কায়রোতে বিদেশি সংবাদদাতাদের সঙ্গে এক ব্রিফিংয়ে মিসরের পানি সম্পদ ও সেচমন্ত্রী হানি সুয়েইলাম যে অবস্থান তুলে ধরেছেন, তার মূল কথা হলো—উজানে নেওয়া সিদ্ধান্তের ঝুঁকি ভাটির দেশগুলোকে একতরফাভাবে বহন করতে হবে, এমন ব্যবস্থা মেনে নেওয়া সম্ভব নয়। নীলনদের মতো আন্তঃসীমান্ত নদীর ক্ষেত্রে স্থায়ী ও পূর্বানুমেয় নিয়ম ছাড়া দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা কঠিন।
মিসরের পানি সংকটের বাস্তবতা
মিসরের পরিস্থিতি বোঝার জন্য দেশটির পানি নির্ভরতার মাত্রাটিই যথেষ্ট। সুয়েইলাম উপস্থাপিত তথ্য অনুযায়ী, মিসরের নবায়নযোগ্য পানিসম্পদের ৯৮ শতাংশের বেশি দেশের সীমান্তের বাইরে থেকে আসে। মাথাপিছু বার্ষিক পানির প্রাপ্যতা প্রায় ৪৭২ ঘনমিটার, যা চরম পানি সংকটের স্বীকৃত সীমারও নিচে।
এই বাস্তবতায় নীলনদের প্রবাহ নিয়ে অনিশ্চয়তা কেবল কূটনৈতিক উদ্বেগ নয়। এর সঙ্গে কৃষি, খাদ্য উৎপাদন এবং কোটি মানুষের দৈনন্দিন জীবন সরাসরি যুক্ত। একজন কৃষক সেচের প্রয়োজন মেটাতে কূটনৈতিক বিরোধের সমাধানের অপেক্ষা করতে পারেন না। একইভাবে মিসরের পানি ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষকে এমন তথ্যের ওপর নির্ভর করতে হয়, যা আগেভাগে পাওয়া যায় এবং যার ভিত্তিতে পরিকল্পনা করা সম্ভব।
বিদ্যুৎ উৎপাদনের যুক্তি যথেষ্ট নয়
ইথিওপিয়া গ্র্যান্ড রেনেসাঁ বাঁধকে বিদ্যুৎ উৎপাদন ও অর্থনৈতিক উন্নয়নের প্রকল্প হিসেবে উপস্থাপন করে। সেই উন্নয়নের প্রয়োজন অস্বীকার করার সুযোগ নেই। কিন্তু বিদ্যুৎ উৎপাদনের সঙ্গে পানির সংরক্ষণ ও নির্গমনের সিদ্ধান্তও যুক্ত। আর সেই সিদ্ধান্তের প্রভাব বাঁধের সীমানা ছাড়িয়ে সুদান ও মিসর পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে।
সুয়েইলাম সতর্ক করেছেন, সমন্বয়হীনভাবে বাঁধ পরিচালনা করলে নদীর প্রবাহে হঠাৎ বড় ধরনের বৃদ্ধি বা পতন ঘটতে পারে। এতে ভাটির দেশগুলো এমন পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে পারে, যার জন্য তারা আগে থেকে প্রস্তুত থাকার সুযোগ পায়নি।
সীমান্ত অতিক্রম করা পানির ক্ষেত্রে তাই আগাম তথ্য, নিয়মিত যোগাযোগ এবং গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনের আগে পরামর্শ কোনো অতিরিক্ত কূটনৈতিক সৌজন্য নয়; এগুলো কার্যকর নদী ব্যবস্থাপনার মৌলিক শর্ত।
উন্নয়ন ও নিরাপত্তাকে মুখোমুখি দাঁড় করানো যাবে না
ইথিওপিয়ার বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়ানোর প্রয়োজন যেমন বাস্তব, তেমনি মিসরের পানি নিরাপত্তাও বাস্তব। নীলনদ নিয়ে একটি কার্যকর সমাধানের লক্ষ্য হওয়া উচিত এই দুই প্রয়োজনকে সংঘাতের পরিবর্তে একটি যৌথ কাঠামোর মধ্যে আনা।
ইথিওপিয়ার পক্ষ থেকে ভাটির দেশগুলোর পানির ওপর নিয়ন্ত্রণের ইঙ্গিতবাহী বক্তব্য তাই পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে। এমন বক্তব্য থেকে ধারণা তৈরি হতে পারে যে বাঁধটি শুধু বিদ্যুৎ উৎপাদনের অবকাঠামো নয়, বরং প্রতিবেশীদের ওপর কৌশলগত প্রভাব বিস্তারের একটি উপায়। এই ধারণা দূর করা ইথিওপিয়ার নিজের স্বার্থেও গুরুত্বপূর্ণ।
মিসরও অভ্যন্তরীণভাবে পানি ব্যবস্থাপনায় পরিবর্তন আনার চেষ্টা করছে। পানি পুনর্ব্যবহার, অবকাঠামো উন্নয়ন, অপচয় কমানো, পানি পরিশোধন এবং জলাধার ব্যবস্থাপনায় বিনিয়োগ বাড়ানো হয়েছে। মিসরের বার্ষিক পানি পুনর্ব্যবহারের পরিমাণ প্রায় ২৩ দশমিক ২ বিলিয়ন ঘনমিটার বলে সুয়েইলাম জানিয়েছেন।
তবে এসব উদ্যোগ ইথিওপিয়ার সঙ্গে সমন্বয়ের প্রয়োজনীয়তা দূর করে না। একইভাবে সমুদ্রের পানি লবণমুক্তকরণকেও নীলনদের সহজ বিকল্প হিসেবে দেখা যায় না। মিসরের বিপুল জনসংখ্যা ও কৃষি চাহিদার তুলনায় এই প্রযুক্তির অবদান মূল্যায়ন করতে হবে বাস্তব সক্ষমতা, ব্যয় ও ভৌগোলিক প্রয়োজন বিবেচনায় রেখে।
নাইল অববাহিকায় সবার বাস্তবতা এক নয়
নীলনদ অববাহিকার দেশগুলোর পানি ব্যবহারের ধরনও এক নয়। ইথিওপিয়ার বিস্তীর্ণ কৃষি এলাকা বৃষ্টির ওপর নির্ভরশীল এবং বৃষ্টিপাত ভূগর্ভস্থ পানির পুনর্ভরণেও ভূমিকা রাখে। মিসরের ক্ষেত্রে এমন বিকল্প অত্যন্ত সীমিত।
তাই অববাহিকার পানি ব্যবস্থাপনায় প্রতিটি দেশের ভৌগোলিক ও জলবায়ুগত বাস্তবতা বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন। নীলনদের ওপর মিসরের অতিরিক্ত নির্ভরতা এমন একটি বিষয়, যা দীর্ঘমেয়াদি পানি ব্যবস্থাপনার আলোচনায় উপেক্ষা করা যায় না।
সহযোগিতার নজিরও রয়েছে
মিসরের অবস্থানকে কেবল উজানের উন্নয়ন ঠেকানোর প্রচেষ্টা হিসেবে দেখলে পুরো চিত্রটি পাওয়া যায় না। সুয়েইলাম দক্ষিণ নীল অববাহিকায় ৩৬টি প্রকল্পের অর্থায়ন নিশ্চিত করতে মিসরের সহযোগিতার কথা উল্লেখ করেছেন। দক্ষিণ সুদানের প্রস্তাবিত গ্র্যান্ড ফোলা বাঁধের প্রতিও কায়রোর সমর্থনের কথা বলা হয়েছে।
মিসরের দাবি অনুযায়ী, এসব প্রকল্পে তথ্য বিনিময়, পরামর্শ এবং সম্ভাব্য প্রভাব মূল্যায়নের সুযোগ রাখা হয়েছে। অর্থাৎ অবকাঠামো ও জ্বালানি প্রকল্প এগিয়ে নেওয়ার পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর উদ্বেগ বিবেচনা করার একটি কাঠামো তৈরি করা সম্ভব।
নীল অববাহিকার দেশগুলোর অগ্রাধিকারভিত্তিক প্রকল্পে সহায়তার জন্য মিসর ১০ কোটি ডলারের প্রাথমিক অর্থায়ন কাঠামোও চালু করেছে। পানি সরবরাহ, কূপ, বন্যা সুরক্ষা এবং অন্যান্য প্রকল্পে মিসরের সহযোগিতার মূল্য ১২ কোটি ডলারের বেশি বলে সুয়েইলাম জানিয়েছেন।
এই ধরনের বাস্তব সহযোগিতা কেবল অর্থনৈতিক সহায়তা নয়; এটি আঞ্চলিক আস্থা তৈরির একটি মাধ্যম। নীলনদ নিয়ে দীর্ঘস্থায়ী সমাধানও শেষ পর্যন্ত এমন বাস্তব সহযোগিতার ওপর নির্ভর করবে।
আলোচনার পথ বন্ধ করা যাবে না
নীল অববাহিকার ভবিষ্যৎ নির্ধারণে আঞ্চলিক কূটনীতির গুরুত্বও কম নয়। ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে সহযোগিতামূলক কাঠামো চুক্তি নিয়ে আরও আলোচনা থেকে ইথিওপিয়ার আপত্তির অভিযোগ করেছেন সুয়েইলাম। কিন্তু কোনো আলোচনায় অংশ না নেওয়ার মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর উদ্বেগ অদৃশ্য হয়ে যায় না।
একটি স্থায়ী আঞ্চলিক প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলতে হলে সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর অংশগ্রহণ এবং আস্থা দুটিই প্রয়োজন। আফ্রিকার পানি ব্যবস্থাপনা নিয়ে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনায় ভাটির দেশগুলোর স্বার্থও সমানভাবে আলোচনায় থাকতে হবে।
এখন প্রয়োজন নির্দিষ্ট নিয়ম
গ্র্যান্ড রেনেসাঁ বাঁধকে ঘিরে বিরোধের স্থায়ী সমাধান রাজনৈতিক বক্তব্যে নয়, নির্দিষ্ট ব্যবস্থাপনা কাঠামোয় নিহিত। বাঁধ পরিচালনার সুস্পষ্ট নিয়ম, দীর্ঘস্থায়ী খরার সময়ে পানি ছাড়ার ব্যবস্থা, নিয়মিত তথ্য বিনিময় এবং গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনের আগে আগাম নোটিশ—এসব বিষয়ে একটি কার্যকর সমঝোতা প্রয়োজন।
একই সঙ্গে তিন দেশের মধ্যে মতবিরোধ দেখা দিলে তা কীভাবে দ্রুত নিষ্পত্তি করা হবে, তারও একটি প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা থাকা জরুরি। সংকট তৈরি হওয়ার পর প্রতিক্রিয়া জানানোর চেয়ে সংকটের আগেই যোগাযোগের পথ খোলা রাখা অনেক বেশি কার্যকর।
মিসর বলছে, তার পানি নিরাপত্তা রক্ষার জন্য প্রয়োজনীয় সব আইনসম্মত পথ খোলা রয়েছে। এই বক্তব্যকে কেবল কঠোর কূটনৈতিক ভাষা হিসেবে দেখলে ভুল হবে। একই সঙ্গে কায়রো এখনো প্রযুক্তিগত সহযোগিতা ও আলোচনার পথ পুরোপুরি বন্ধ করেনি।
ইথিওপিয়া বাঁধ নির্মাণের কাজ শেষ করেছে। কিন্তু নীলনদ নিয়ে প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে এমন একটি সমঝোতায় পৌঁছানো, যার ওপর সবাই দীর্ঘমেয়াদে নির্ভর করতে পারে, সেই কাজ এখনো শেষ হয়নি। নীলনদের ভবিষ্যৎ তাই বাঁধের নির্মাণ শেষ হওয়ার চেয়ে বেশি কিছু—এটি নির্ভর করছে নদী ব্যবস্থাপনায় একতরফা সিদ্ধান্তের বদলে কতটা কার্যকর আঞ্চলিক সমন্বয় প্রতিষ্ঠা করা যায় তার ওপর।
ইজ্জাত ইব্রাহিম 

















