তাইওয়ান ইস্যু চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্কের সবচেয়ে স্পর্শকাতর বিষয়গুলোর একটি। চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং চলতি সপ্তাহে ওয়াশিংটনে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে বৈঠকে তাইওয়ানের কাছে মার্কিন অস্ত্র বিক্রি বন্ধের দাবি তুলতে পারেন বলে ধারণা করা হচ্ছে। বেইজিংয়ের কাছে তাইওয়ান শুধু একটি ভূখণ্ডের প্রশ্ন নয়; এটি জাতীয় সার্বভৌমত্ব, ভৌগোলিক অখণ্ডতা এবং চীনের রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তার সঙ্গে সরাসরি যুক্ত একটি বিষয়।
চীন তাইওয়ানকে তার ভূখণ্ডের অংশ বলে দাবি করে এবং একে ‘মূল স্বার্থের মূল’ হিসেবে বিবেচনা করে। বেইজিংয়ের ভাষায়, তাইওয়ান প্রশ্নে বাইরের কোনো দেশের হস্তক্ষেপ মেনে নেওয়া হবে না। অন্যদিকে তাইওয়ান নিজেকে একটি গণতান্ত্রিক ও স্বশাসিত রাষ্ট্র হিসেবে পরিচালনা করে এবং চীনের সার্বভৌমত্বের দাবি প্রত্যাখ্যান করে।
এই বিরোধের শিকড় বহু দশকের ইতিহাসে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ১৯৪৫ সালে তাইওয়ানের নিয়ন্ত্রণ চীন প্রজাতন্ত্রের সরকারের হাতে যায়। এরপর ১৯৪৯ সালে চীনের গৃহযুদ্ধে মাও সেতুংয়ের নেতৃত্বাধীন কমিউনিস্ট বাহিনী বিজয়ী হলে পরাজিত চীন প্রজাতন্ত্রের সরকার তাইওয়ানে চলে যায়। একই বছর মূল ভূখণ্ডে প্রতিষ্ঠিত হয় গণপ্রজাতন্ত্রী চীন।
বেইজিংয়ের দৃষ্টিতে, সেই গৃহযুদ্ধের সমাপ্তি হয়নি এবং তাইওয়ান এখনো চীনের একটি অংশ। চীন তাইওয়ানকে এমন একটি প্রদেশ হিসেবে দেখে, যার স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে আত্মপ্রকাশের অধিকার নেই। যদিও বেইজিং বারবার বলে আসছে, তারা ‘শান্তিপূর্ণ পুনরেকত্রীকরণ’ চায়, একই সঙ্গে প্রয়োজনে শক্তি প্রয়োগের পথও খোলা রেখেছে।
তাইওয়ান কী বলে
তাইওয়ানের অবস্থান সম্পূর্ণ ভিন্ন। তাইপে বলছে, তাইওয়ান ইতোমধ্যেই একটি স্বাধীন ও গণতান্ত্রিকভাবে পরিচালিত দেশ, যার আনুষ্ঠানিক নাম ‘চীন প্রজাতন্ত্র’। তাইওয়ানের যুক্তি, গণপ্রজাতন্ত্রী চীন কখনোই দ্বীপটি শাসন করেনি। ফলে বেইজিংয়ের তাইওয়ানের ওপর সার্বভৌমত্ব দাবি করার কোনো অধিকার নেই।
তাইওয়ানের প্রেসিডেন্ট লাই চিং-তে চীনের সঙ্গে আলোচনার প্রস্তাব দিয়ে আসছেন। তবে বেইজিং তার সঙ্গে আলোচনায় আগ্রহ দেখায়নি। চীন লাইকে ‘বিচ্ছিন্নতাবাদী’ হিসেবে অভিহিত করে এবং তাকে ‘প্রেসিডেন্ট’ বলতেও অস্বীকৃতি জানায়।
লাইয়ের অবস্থান হলো, তাইওয়ান যেহেতু বাস্তবেই একটি স্বাধীন রাষ্ট্রের মতো পরিচালিত হচ্ছে, তাই নতুন করে স্বাধীনতা ঘোষণা করার প্রয়োজন নেই।
যুক্তরাষ্ট্র কোথায় দাঁড়িয়ে
তাইওয়ান সংকটে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান আরও জটিল। ১৯৭৯ সালে ওয়াশিংটন তাইপের সঙ্গে আনুষ্ঠানিক কূটনৈতিক সম্পর্ক ছিন্ন করে বেইজিংয়ের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপন করে। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের ‘তাইওয়ান সম্পর্ক আইন’ অনুযায়ী তাইওয়ানকে আত্মরক্ষার সক্ষমতা বজায় রাখতে প্রয়োজনীয় অস্ত্র ও প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম দেওয়ার ব্যবস্থা রয়েছে।
ওয়াশিংটন আনুষ্ঠানিকভাবে তাইওয়ানের সার্বভৌমত্বের প্রশ্নে কোনো অবস্থান নেয় না। যুক্তরাষ্ট্রের ‘এক চীন’ নীতির পাশাপাশি তাইওয়ানের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ অর্থনৈতিক ও নিরাপত্তা সম্পর্কও বজায় রয়েছে।

তাইওয়ানে যুক্তরাষ্ট্রের একটি বড় কার্যত দূতাবাস রয়েছে, যার নাম আমেরিকান ইনস্টিটিউট ইন তাইওয়ান। যদিও যুক্তরাষ্ট্র ও তাইওয়ানের প্রেসিডেন্টরা আনুষ্ঠানিকভাবে একে অপরের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ করেন না, দুই পক্ষের আইনপ্রণেতা ও কর্মকর্তাদের মধ্যে নিয়মিত যোগাযোগ রয়েছে।
তাইওয়ানের প্রেসিডেন্টরা সাধারণত লাতিন আমেরিকা ও ক্যারিবীয় অঞ্চলের কূটনৈতিক মিত্রদের সফরের পথে যুক্তরাষ্ট্রে ‘ট্রানজিট’ সফর করেন। এসব সফরের সময় তারা মার্কিন আইনপ্রণেতাদের সঙ্গে বৈঠক করেন।
২০১৬ সালের শেষ দিকে তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত ডোনাল্ড ট্রাম্প তাইওয়ানের তৎকালীন প্রেসিডেন্ট সাই ইং-ওয়েনের সঙ্গে প্রায় ১০ মিনিট ফোনে কথা বলেছিলেন। ঘটনাটি নিয়ে বেইজিং কূটনৈতিকভাবে আপত্তি জানালেও প্রতিক্রিয়া তুলনামূলকভাবে সংযত ছিল।
অস্ত্র বিক্রি কেন এত বড় বিষয়
তাইওয়ানের কাছে মার্কিন অস্ত্র বিক্রি চীনের জন্য দীর্ঘদিনের বড় উদ্বেগ। বেইজিং মনে করে, এসব অস্ত্র তাইওয়ানকে সামরিকভাবে আরও শক্তিশালী করছে এবং দ্বীপটির স্বাধীনতার প্রবণতাকে উৎসাহিত করতে পারে।
চীন অতীতেও তাইওয়ানকে ঘিরে মার্কিন উচ্চপর্যায়ের যোগাযোগের জবাবে সামরিক মহড়া চালিয়েছে। ২০২২ সালে তৎকালীন মার্কিন প্রতিনিধি পরিষদের স্পিকার ন্যান্সি পেলোসি তাইপে সফর করার পর চীন তাইওয়ানের চারপাশে বড় ধরনের সামরিক মহড়া চালায়।
এরপরও যুক্তরাষ্ট্র-তাইওয়ান সামরিক সম্পর্ক আরও গভীর হয়েছে। চলতি বছরের ডিসেম্বরের শেষ দিকে চীন সর্বশেষ বড় ধরনের সামরিক মহড়া চালায়। তার আগে ট্রাম্প প্রশাসন তাইওয়ানের জন্য প্রায় ১১ বিলিয়ন ডলারের অস্ত্র বিক্রির অনুমোদন দেয়, যা ছিল দেশটির জন্য এ ধরনের সবচেয়ে বড় অস্ত্র প্যাকেজ।
শি-ট্রাম্প বৈঠকে কেন তাইওয়ান গুরুত্বপূর্ণ
এবার শি জিনপিং ও ডোনাল্ড ট্রাম্পের বৈঠকে তাইওয়ান বিশেষ গুরুত্ব পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। বেইজিং চাইবে ওয়াশিংটন তাইওয়ানের কাছে অস্ত্র বিক্রি সীমিত বা বন্ধ করুক। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের জন্য তাইওয়ান শুধু চীনের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্কের বিষয় নয়; এটির সঙ্গে এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের নিরাপত্তা, সামরিক ভারসাম্য এবং যুক্তরাষ্ট্রের মিত্রদের আস্থার প্রশ্নও জড়িত।
চীন বারবার বলেছে, তাইওয়ান তার সার্বভৌমত্ব ও ভূখণ্ডগত অখণ্ডতার প্রশ্নে একটি ‘লাল রেখা’। ফলে ওয়াশিংটনের সঙ্গে তাইপের প্রতিটি উচ্চপর্যায়ের যোগাযোগ কিংবা বড় অস্ত্র চুক্তি বেইজিংয়ের সঙ্গে উত্তেজনা বাড়াতে পারে।
অন্যদিকে তাইওয়ানের জন্য যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা সহযোগিতা গুরুত্বপূর্ণ। চীনের সামরিক শক্তি ও চাপ বাড়ার প্রেক্ষাপটে তাইপে মনে করে, আত্মরক্ষার সক্ষমতা ধরে রাখতে তাকে যুক্তরাষ্ট্রসহ অন্যান্য অংশীদারের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখতে হবে।
ফলে তাইওয়ান প্রশ্নটি এখন শুধু চীন ও তাইওয়ানের দ্বন্দ্ব নয়। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে যুক্তরাষ্ট্র-চীন প্রতিদ্বন্দ্বিতা, আঞ্চলিক নিরাপত্তা এবং এশিয়ায় সামরিক ভারসাম্যের বৃহত্তর হিসাব। শি জিনপিং ও ট্রাম্পের আলোচনায় তাইওয়ান নিয়ে কোনো সমঝোতা হয় কি না, তা দুই দেশের ভবিষ্যৎ সম্পর্কের পাশাপাশি পুরো অঞ্চলের কৌশলগত পরিস্থিতির ওপরও প্রভাব ফেলতে পারে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















