রেকর্ড শক্তিশালী এল নিনোর তাপে ভারতে আগামী ফেব্রুয়ারির মধ্যে প্রায় ১৫ হাজার ৮০০ মানুষের মৃত্যু হতে পারে। যুক্তরাষ্ট্রের শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয়ভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান ক্লাইমেট ইমপ্যাক্ট ল্যাব বুধবার এই প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। জার্মান সম্প্রচারমাধ্যম ডয়চে ভেলে খবরটি দিয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সারা বিশ্বে গত জুন থেকে আগামী ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত স্বাভাবিক বছরের তুলনায় অতিরিক্ত ৪ লাখ ৫১ হাজার মৃত্যুর জন্য এল নিনো দায়ী হতে পারে। এর মধ্যে ভারতের অংশ প্রায় ১৬ হাজার। তাপপ্রবাহ ও পানির সংকট এই মৃত্যুর প্রধান কারণ হবে। এল নিনোর তাপে মৃত্যু তাই শুধু আবহাওয়ার খবর নয়, জনস্বাস্থ্যের জরুরি প্রশ্ন।
এল নিনো একটি প্রাকৃতিক জলবায়ু প্রক্রিয়া। দুই থেকে সাত বছর পরপর এটি দেখা দেয়, সাধারণত বছরের শেষ দিকে। দক্ষিণ আমেরিকার পশ্চিম উপকূলের সমুদ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে দেড় ডিগ্রি সেলসিয়াস বেশি হলে তাকে শক্তিশালী এল নিনো ধরা হয়। যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় মহাসাগর ও বায়ুমণ্ডল প্রশাসন জুলাইয়েই মধ্য ও পূর্ব প্রশান্ত মহাসাগরে তিন ডিগ্রির বেশি উষ্ণতা দেখেছিল। সেপ্টেম্বরে এসে এটি রেকর্ডে থাকা সবচেয়ে শক্তিশালী এল নিনোতে পরিণত হয়েছে। ভারতের আবহাওয়া দপ্তরের হিসাবে ২২ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত বর্ষায় স্বাভাবিকের চেয়ে ১৫ শতাংশ কম বৃষ্টি হয়েছে। কম বৃষ্টি মানে বেশি গরম, শুকনো মাটি আর পানির টান। গবেষকদের হিসাবে এল নিনোর তাপে মৃত্যু সবচেয়ে বেশি হবে বয়স্ক, শিশু ও খোলা আকাশের নিচে কাজ করা মানুষের মধ্যে। দরিদ্র পরিবারে শীতাতপ যন্ত্র বা পর্যাপ্ত পানির সুবিধা না থাকায় ঝুঁকি আরও বাড়ে।
ক্লাইমেট ইমপ্যাক্ট ল্যাব বলছে, এবারের তাপ সবচেয়ে বিপজ্জনক সেসব জায়গায়, যেগুলো আগে থেকেই গরম ও তুলনামূলক দরিদ্র। তাই বৈশ্বিক দক্ষিণের দেশগুলোতে মৃত্যু বেশি হবে। প্রতিবেদনে কিছু প্রতিরোধমূলক পদক্ষেপের কথা বলা হয়েছে। আগাম তাপ সতর্কতা, পানি পানের প্রচার, শীতলীকরণ কেন্দ্র ও তাপ মোকাবিলার পরিকল্পনা জরুরি। হাসপাতালের সক্ষমতা বাড়ানো ও আগাম অর্থায়নের ব্যবস্থাও দরকার। ভারতের পরিবেশ সংগঠন এনআরডিসি ইন্ডিয়ার তাপ বিশেষজ্ঞ অভিয়ন্ত তিওয়ারি বলেন, এই পূর্বাভাসকে আতঙ্ক নয়, কাজের ডাক হিসেবে দেখা উচিত। তাঁর মতে, ভারতের ভালো পরিকল্পনা আছে, কিন্তু বাস্তবায়নই চ্যালেঞ্জ। তিনি বলেন, “কতগুলো সতর্কতা দিলাম তা নয়, কত মানুষকে রক্ষা করলাম, সেটিই প্রস্তুতির আসল মাপকাঠি।”
বাংলাদেশ এই ঝুঁকির বাইরে নয়। ভারতের পূর্বাঞ্চলের মতোই বাংলাদেশ গরম, আর্দ্র ও ঘনবসতিপূর্ণ। ঢাকার মতো শহরে তাপদ্বীপের প্রভাব তাপমাত্রা আরও বাড়িয়ে দেয়। রিকশাচালক, নির্মাণশ্রমিক, কৃষিশ্রমিক ও বস্তিবাসীরা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে। গত কয়েক বছরে দেশে তীব্র তাপপ্রবাহে স্কুল বন্ধ রাখতে হয়েছে, হাসপাতালে হিটস্ট্রোকের রোগী বেড়েছে। এল নিনোর তাপে মৃত্যু ঠেকাতে ভারতের জন্য যে পরামর্শ, বাংলাদেশের জন্যও তা প্রযোজ্য। শহরগুলোতে শীতলীকরণ কেন্দ্র, খোলা জায়গায় কাজের সময় বদল ও তাপ সতর্কতাব্যবস্থা এখনই চালু করা দরকার। স্থানীয় সরকার ও স্বাস্থ্য বিভাগের সমন্বয়ও জরুরি। বিদ্যুৎ ঘাটতির সময় লোডশেডিং তাপের কষ্ট বাড়িয়ে দেয়, তাই জ্বালানি পরিকল্পনাও এই প্রস্তুতির অংশ।
প্রতিবেদনের হিসাবে বিশ্বজুড়ে সাড়ে চার লাখের বেশি মানুষের জীবন ঝুঁকিতে, যার বড় অংশ গরিব দেশে। পরিসংখ্যানটি এক বছরের নয়, একটি মাত্র এল নিনো মৌসুমের, যা এখনো তার চূড়ায় পৌঁছায়নি।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















