০৮:৪৮ অপরাহ্ন, বুধবার, ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬
নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে ভারত এগিয়ে, কিন্তু বিদ্যুৎ গ্রিডে বাড়ছে চাপ প্রজ্ঞাপন জারি: জ্বালানি তেলের দাম বাড়ায় বাস-মিনিবাসের ভাড়া কিলোমিটারে ১৭ পয়সা বৃদ্ধি ২০ তলা থেকে সাইকেলসহ নানা জিনিস ছুড়ে দিলেন ব্যক্তি, ৬ ঘণ্টার পুলিশি অভিযানে আটক চাঁদের আলোয় সায়েন্স সেন্টারে এক রাতের নাচ-গান, সিঙ্গাপুরে ‘মুনবিটস: আফটারডার্ক’ একা থাকা ৭২ বছরের বৃদ্ধের মৃত্যু, দরজার নিচ দিয়ে রক্ত গড়িয়ে আসতেই মিলল মরদেহ টোকিওর কাছে টাইফুন দুজুয়ানের আঘাত, নিহত ৯, নিখোঁজ ৪ এল নিনোর তাপে ভারতে ফেব্রুয়ারির মধ্যে ১৫ হাজার ৮০০ মৃত্যুর শঙ্কা ইতিহাসের সবচেয়ে শক্তিশালী এল নিনো, চূড়ায় ওঠার আগেই ভাঙল রেকর্ড চ্যাটজিপিটি ব্যবহার করে স্কুলে গুলি, ওপেনএআইকে নতুন স্কুল গড়ে দিতে মামলা ১৮৯৭ থেকে পথিকের আশ্রয়, আধুনিক জীবনের ক্লান্তি কাটাতে নতুন করে জেগে উঠছে আর্কটিকের ছোট্ট দ্বীপ

১৮৯৭ থেকে পথিকের আশ্রয়, আধুনিক জীবনের ক্লান্তি কাটাতে নতুন করে জেগে উঠছে আর্কটিকের ছোট্ট দ্বীপ

  • Sarakhon Report
  • ০৭:৪৪:০৪ অপরাহ্ন, বুধবার, ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬
  • 9

নরওয়ের উত্তর প্রান্তে, আর্কটিক সার্কেলের সামান্য উত্তরে সমুদ্রের বুকের ছোট্ট দ্বীপপুঞ্জ স্টোট্ট। চারদিকে ধূসর সমুদ্র, কুয়াশা, পাথুরে পাহাড় আর উত্তরের তীব্র প্রকৃতি। একসময় ঝড়ের কবলে পড়া জেলেদের জন্য এই দ্বীপ ছিল নিরাপদ আশ্রয়। এখন সেই পুরোনো পরিচয় নতুন অর্থ পাচ্ছে—আধুনিক জীবনের ব্যস্ততা, অতিরিক্ত কাজ আর শহুরে চাপ থেকে কিছুদিনের জন্য মানুষকে দূরে সরিয়ে নেওয়ার আশ্রয় হিসেবে।

স্টোট্টের সবচেয়ে বড় বসতিপূর্ণ দ্বীপ ইনারস্টোট্টে একসময় ছিল গুরুত্বপূর্ণ একটি বাণিজ্যকেন্দ্র। উত্তরের সমৃদ্ধ আর্কটিক কড মাছের এলাকায় যাওয়ার পথে জেলেরা এখানে নৌকা থামাতেন, প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম, রুটি, চিনি ও ময়দা সংগ্রহ করতেন। খারাপ আবহাওয়ার সময় অপেক্ষা করতেন শান্ত সমুদ্রের জন্য।

এই ঐতিহ্যের সঙ্গে জড়িয়ে আছে অ্যান্ডারসেন পরিবারের ইতিহাস। ১৮৯৭ সাল থেকে পরিবারটি স্টোট্টের পুরোনো বাণিজ্যকেন্দ্রটির মালিক। বর্তমানে সেটিই রূপ নিয়েছে ‘স্টোট্ট ব্রিগে’ নামের একটি ছোট হোটেলে। হোটেলটির দেখভাল করছেন ইভা অ্যান অ্যান্ডারসেন।

অ্যান্ডারসেনের কাছে স্টোট্ট কেবল পারিবারিক সম্পত্তি নয়। তাঁর কাছে এটি এমন একটি জায়গা, যেখানে মানুষ আবার প্রকৃতির সঙ্গে নিজের সম্পর্ক খুঁজে পেতে পারে।

সমুদ্রের ঝড় থেকে জীবনের ঝড়

স্টোট্টকে ঘিরে স্থানীয় একটি পুরোনো কিংবদন্তি রয়েছে। বলা হয়, ভয়াবহ শীতের ঝড়ে সমুদ্রে পথ হারানো জেলেদের সামনে কখনো কখনো কুয়াশার মধ্য থেকে দ্বীপটি যেন জাদুর মতো ভেসে উঠত। সেই দ্বীপ তাদের জীবন বাঁচাত।

কিংবদন্তির বাস্তব ভিত্তিও ছিল। উত্তর নরওয়ের কঠিন সমুদ্রপথে চলাচলকারী মাছ ধরার নৌকাগুলোর জন্য স্টোট্ট ছিল গুরুত্বপূর্ণ বিরতির জায়গা। এখানকার বাণিজ্যকেন্দ্রে প্রয়োজনীয় জিনিস পাওয়া যেত, আর ঝড়ের সময় নৌকাগুলো নিরাপদে আশ্রয় নিতে পারত।

কিন্তু সময়ের সঙ্গে মাছ ধরার শিল্প বদলে যায়। ১৯৮০-এর দশক থেকে বড়, নিরাপদ নৌকা ও ট্রলার ব্যবহারের ফলে জেলেদের আর আগের মতো ছোট ছোট দ্বীপের বাণিজ্যকেন্দ্রে থামার প্রয়োজন পড়েনি। ধীরে ধীরে ছোট আকারের মাছ ধরার অর্থনীতি ভেঙে পড়ে। স্টোট্টের জনসংখ্যাও কমতে থাকে।

একসময় যেখানে প্রায় ১২০ মানুষ বাস করতেন, বর্তমানে সারা বছর সেখানে স্থায়ীভাবে থাকেন মাত্র প্রায় ২৫ জন।What Life's Like in The World's Northernmost Naturally Inhabited Town |  Pulitzer Center

শহুরে জীবনের ক্লান্তি থেকে ফিরে আসা

এই পতনের গল্প অ্যান্ডারসেন খুব কাছ থেকে দেখেছেন। স্টোট্টেই তাঁর বেড়ে ওঠা। পরে বিশের কোঠায় তিনি নরওয়ের রাজধানী অসলোতে চলে যান এবং আন্তর্জাতিক করপোরেট জগতে ক্যারিয়ার গড়ে তোলেন।

কিন্তু ২০১১ সালে অতিরিক্ত কাজ ও ক্লান্তিতে তিনি আবার নিজের শিকড়ের দ্বীপে ফিরে আসেন। তখন অনেকেই মনে করেছিলেন, তিনি বেশিদিন সেখানে থাকবেন না।

অ্যান্ডারসেন অবশ্য অন্য কিছু দেখেছিলেন। তাঁর চোখে স্টোট্টের পতনের মধ্যেই ছিল নতুন সম্ভাবনা।

তিনি বুঝতে পারেন, যে জায়গাটি একসময় সমুদ্রের ঝড় থেকে জেলেদের আশ্রয় দিত, সেটিই এখন শহুরে জীবনের মানসিক চাপ থেকে মানুষকে দূরে রাখার জায়গা হতে পারে।

“আমি যখন ফিরে এসেছিলাম, সঙ্গে আশা নিয়ে এসেছিলাম”—তাঁর বক্তব্যের সারকথা এমনই।

পুরোনো মাছ ধরার কেন্দ্র থেকে নতুন পর্যটনকেন্দ্র

স্টোট্ট ব্রিগের বর্তমান হোটেলটি একাধিক পুরোনো ভবন নিয়ে গড়ে উঠেছে। রয়েছে মাছ ধরার পুরোনো জেলেদের কেবিন, পুনরুদ্ধার করা গুদামঘর এবং একসময়কার বেকারি ভবন। মোট ১৬টি কক্ষ রয়েছে সেখানে।

পুরোনো ভবনগুলোর চরিত্র ধরে রাখার চেষ্টা করা হয়েছে। কোথাও জেলেদের পুরোনো ছবি, কোথাও মাছ ধরার সরঞ্জাম, আবার কোথাও বহু বছরের হিসাবের খাতা ও ঐতিহাসিক পোস্টার। পুরোনো দোকানের কাউন্টারটিই এখন রেস্তোরাঁর বারে পরিণত হয়েছে।

একটি ছোট জাদুঘরে সংরক্ষিত আছে স্টোট্টের মাছ ধরার অতীত। সাদা-কালো ছবিতে দেখা যায় অ্যান্ডারসেনের দাদাকে কাঠের নৌকায় দাঁড়িয়ে থাকতে। অন্য ছবিতে দেখা যায় ছোট নৌকায় বিশাল পরিমাণ মাছ ধরার দৃশ্য।

তবে এটি কেবল অতীতকে ধরে রাখা কোনো জাদুঘর নয়। পুরোনো ঐতিহ্যের সঙ্গে আধুনিক পর্যটন সুবিধাও যুক্ত করা হয়েছে। পুরোনো বেকারি ভবনের কক্ষগুলোতে এখন আরামদায়ক থাকার ব্যবস্থা রয়েছে। আধুনিক প্রসাধনসামগ্রীর পাশাপাশি পুরোনো দিনের পরিবেশও বজায় রাখা হয়েছে।

যুদ্ধের স্মৃতিও রয়েছে দ্বীপে

স্টোট্টের ইতিহাস শুধু মাছ ধরা ও বাণিজ্যের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের স্মৃতিও দ্বীপটির ভূদৃশ্যের সঙ্গে মিশে আছে।

১৯৪১ সালে জার্মান দখলের পর দ্বীপে একটি উপকূলীয় সামরিক ঘাঁটি গড়ে তোলা হয়। সেখানে প্রায় ২০০ সেনা অবস্থান করত। পাহাড়ের ঢালে তৈরি করা হয়েছিল কংক্রিটের বাংকার ও সুড়ঙ্গ। ছিল ভূগর্ভস্থ হাসপাতাল, গোলাবারুদের গুদাম এবং কামানের অবস্থান।

আজ এসব স্থাপনা স্টোট্টের ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ নিদর্শন। পর্যটকেরা এসব সুড়ঙ্গ ও বাংকার ঘুরে দেখতে পারেন। এমনকি পুরোনো একটি যুদ্ধকালীন সুড়ঙ্গে বিশেষ নৈশভোজের ব্যবস্থাও করা হয়েছে।Svalbard: the Arctic islands where we can see the future of global heating  | Climate crisis | The Guardian

প্রকৃতিই এখানে সবচেয়ে বড় আকর্ষণ

তবে স্টোট্টের সবচেয়ে বড় সম্পদ কোনো ভবন বা জাদুঘর নয়—এর প্রকৃতি।

দ্বীপের চারপাশে নীল সমুদ্র, পাথুরে ভূমি, দূরের পাহাড়, ছোট ছোট সৈকত এবং বিচ্ছিন্ন লাল কেবিন। উপকূলের কাছাকাছি স্বচ্ছ নীলাভ পানিতে কায়াকিং করা যায়। সমুদ্রের ওপর দিয়ে নৌভ্রমণ করে পৌঁছানো যায় নিরিবিলি উপসাগর ও ছোট দ্বীপে।

এখানে দেখা মেলে সাদা-লেজের সামুদ্রিক ঈগলের। বসন্তে পরিযায়ী পাখিদের আনাগোনায় দ্বীপ আরও প্রাণবন্ত হয়ে ওঠে। গ্রীষ্মে আসে মধ্যরাতের সূর্যের সময়—দীর্ঘ সময় ধরে সূর্যের আলো থাকে, রাত নামলেও প্রকৃতি পুরোপুরি অন্ধকারে ডুবে যায় না।

শীতের চিত্র আবার সম্পূর্ণ আলাদা। নভেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারির মধ্যে উত্তর আকাশে দেখা যেতে পারে মেরুজ্যোতি। নির্মল আকাশে তারাভরা রাতও পর্যটকদের আকর্ষণ করে।

পর্যটনের মাধ্যমে দ্বীপকে আবার বাঁচানোর চেষ্টা

অ্যান্ডারসেনের পরিকল্পনা শুধু কয়েকটি হোটেলকক্ষ ভাড়া দেওয়া নয়। তাঁর বড় লক্ষ্য হলো পর্যটনের মাধ্যমে স্টোট্টের স্থানীয় সমাজকে আবার সক্রিয় করে তোলা।

তিনি পুরোনো মাছের কারখানাটিকে বিলাসবহুল থাকার জায়গায় রূপান্তর করছেন। লক্ষ্য আন্তর্জাতিক পর্যটক বাড়ানো এবং স্থানীয় মানুষের জন্য সারা বছর কাজের সুযোগ তৈরি করা।

হোটেলে এখন কায়াকিং, আর্কটিক সনা, দ্রুতগতির নৌভ্রমণ, মাছ ধরা এবং আশপাশের প্রকৃতি ঘুরে দেখার নানা আয়োজন রয়েছে। কাছের স্ভার্টিসেন হিমবাহেও নৌভ্রমণের ব্যবস্থা করা হয়।

অ্যান্ডারসেনের বিশ্বাস, স্টোট্টকে এমন একটি জায়গা বানানো সম্ভব যেখানে মানুষ শুধু বেড়াতে আসবে না, কিছু সময়ের জন্য আধুনিক জীবনের গতিও থামিয়ে দিতে পারবে।

‘জেন মোড’-এর দ্বীপ

অ্যান্ডারসেনের মেয়ে বেনেডিক্টও কিছু সময় অসলোতে থাকেন। কিন্তু স্টোট্টে ফিরে এলে তাঁর কাছে শহরের জীবন আর এই দ্বীপের পার্থক্য স্পষ্ট হয়ে ওঠে।

তাঁর ভাষায়, অসলোতে মানুষের জীবনে অনেক চাপ। কিন্তু স্টোট্টে এসে যেন অন্য এক শান্ত অবস্থায় চলে যাওয়া যায়। এখানে ব্যায়ামাগারে যাওয়ার কথা মনে রাখারও প্রয়োজন হয় না—বাইরে বের হয়ে পাহাড় আর প্রকৃতির দিকে তাকানোই যেন যথেষ্ট।

এই অনুভূতিটিই হয়তো স্টোট্টের নতুন পর্যটন পরিচয়ের মূল ভিত্তি।

কারণ আধুনিক পৃথিবীতে এমন জায়গার চাহিদা বাড়ছে, যেখানে মোবাইল, যানজট, অফিসের চাপ, নিরন্তর কাজ আর শহরের শব্দ থেকে দূরে থাকা যায়। স্টোট্ট সেই অভিজ্ঞতা দিতে পারে খুব স্বাভাবিকভাবেই।

নতুন মানুষের জন্য নতুন আশ্রয়

একসময় জেলেরা স্টোট্টে আসতেন বাঁচার জন্য। ঝড় থামার অপেক্ষায় তারা এখানে নোঙর করতেন। এখনকার পর্যটকেরা আসেন অন্য ধরনের ঝড় থেকে নিজেদের সরিয়ে নিতে—কাজের চাপ, মানসিক ক্লান্তি ও শহুরে ব্যস্ততা থেকে।

অ্যান্ডারসেনের স্বপ্ন আরও বড়। তিনি চান দ্বীপটিতে আবার মানুষের আনাগোনা বাড়ুক। নতুন কর্মসংস্থান তৈরি হোক, মানুষ দ্বীপ ছেড়ে চলে যাওয়ার বদলে থাকার কারণ খুঁজে পাক। এমনকি শিল্পী ও লেখকেরাও যেন এখানে এসে কাজ করার অনুপ্রেরণা পান।

তাঁর লক্ষ্য, পর্যটনের মাধ্যমে স্টোট্টের সমাজকে পুনর্গঠন করা।

এটি সহজ কাজ নয়। মাত্র ২৫ জন স্থায়ী বাসিন্দার একটি প্রত্যন্ত দ্বীপকে সারা বছর প্রাণবন্ত রাখা বড় চ্যালেঞ্জ। কিন্তু স্টোট্টের গল্পে এমন একটি বিষয় রয়েছে, যা হয়তো এই প্রচেষ্টাকে আলাদা করে তোলে—দ্বীপটি আগেও মানুষের আশ্রয় ছিল।

শুধু তখন আশ্রয় ছিল সমুদ্রের ঝড় থেকে। এখন সেটি হতে চাইছে আধুনিক জীবনের ঝড় থেকে মুক্তির জায়গা।

সমুদ্রের ওপারে পশ্চিম দিকে তাকালে স্টোট্ট থেকে গ্রিনল্যান্ড পর্যন্ত বিস্তৃত খোলা জলরাশি। চারপাশে কুয়াশা, পাথর, বাতাস আর নীরবতা। আর সেই নীরবতার মাঝেই পুরোনো মাছ ধরার ঘরগুলো নতুন জীবনের অপেক্ষায়।

১৮৯৭ সাল থেকে যে জায়গা পথিক ও জেলেদের স্বাগত জানিয়ে এসেছে, অ্যান্ডারসেনের স্বপ্নে সেটিই হয়তো আবার নতুন এক অধ্যায়ের দিকে এগোচ্ছে—এবার মাছ ধরার নৌকার জন্য নয়, বরং এমন মানুষের জন্য যারা কিছুদিনের জন্য পৃথিবীর দ্রুতগতি থেকে দূরে গিয়ে নিঃশ্বাস নিতে চান।

জনপ্রিয় সংবাদ

নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে ভারত এগিয়ে, কিন্তু বিদ্যুৎ গ্রিডে বাড়ছে চাপ

১৮৯৭ থেকে পথিকের আশ্রয়, আধুনিক জীবনের ক্লান্তি কাটাতে নতুন করে জেগে উঠছে আর্কটিকের ছোট্ট দ্বীপ

০৭:৪৪:০৪ অপরাহ্ন, বুধবার, ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬

নরওয়ের উত্তর প্রান্তে, আর্কটিক সার্কেলের সামান্য উত্তরে সমুদ্রের বুকের ছোট্ট দ্বীপপুঞ্জ স্টোট্ট। চারদিকে ধূসর সমুদ্র, কুয়াশা, পাথুরে পাহাড় আর উত্তরের তীব্র প্রকৃতি। একসময় ঝড়ের কবলে পড়া জেলেদের জন্য এই দ্বীপ ছিল নিরাপদ আশ্রয়। এখন সেই পুরোনো পরিচয় নতুন অর্থ পাচ্ছে—আধুনিক জীবনের ব্যস্ততা, অতিরিক্ত কাজ আর শহুরে চাপ থেকে কিছুদিনের জন্য মানুষকে দূরে সরিয়ে নেওয়ার আশ্রয় হিসেবে।

স্টোট্টের সবচেয়ে বড় বসতিপূর্ণ দ্বীপ ইনারস্টোট্টে একসময় ছিল গুরুত্বপূর্ণ একটি বাণিজ্যকেন্দ্র। উত্তরের সমৃদ্ধ আর্কটিক কড মাছের এলাকায় যাওয়ার পথে জেলেরা এখানে নৌকা থামাতেন, প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম, রুটি, চিনি ও ময়দা সংগ্রহ করতেন। খারাপ আবহাওয়ার সময় অপেক্ষা করতেন শান্ত সমুদ্রের জন্য।

এই ঐতিহ্যের সঙ্গে জড়িয়ে আছে অ্যান্ডারসেন পরিবারের ইতিহাস। ১৮৯৭ সাল থেকে পরিবারটি স্টোট্টের পুরোনো বাণিজ্যকেন্দ্রটির মালিক। বর্তমানে সেটিই রূপ নিয়েছে ‘স্টোট্ট ব্রিগে’ নামের একটি ছোট হোটেলে। হোটেলটির দেখভাল করছেন ইভা অ্যান অ্যান্ডারসেন।

অ্যান্ডারসেনের কাছে স্টোট্ট কেবল পারিবারিক সম্পত্তি নয়। তাঁর কাছে এটি এমন একটি জায়গা, যেখানে মানুষ আবার প্রকৃতির সঙ্গে নিজের সম্পর্ক খুঁজে পেতে পারে।

সমুদ্রের ঝড় থেকে জীবনের ঝড়

স্টোট্টকে ঘিরে স্থানীয় একটি পুরোনো কিংবদন্তি রয়েছে। বলা হয়, ভয়াবহ শীতের ঝড়ে সমুদ্রে পথ হারানো জেলেদের সামনে কখনো কখনো কুয়াশার মধ্য থেকে দ্বীপটি যেন জাদুর মতো ভেসে উঠত। সেই দ্বীপ তাদের জীবন বাঁচাত।

কিংবদন্তির বাস্তব ভিত্তিও ছিল। উত্তর নরওয়ের কঠিন সমুদ্রপথে চলাচলকারী মাছ ধরার নৌকাগুলোর জন্য স্টোট্ট ছিল গুরুত্বপূর্ণ বিরতির জায়গা। এখানকার বাণিজ্যকেন্দ্রে প্রয়োজনীয় জিনিস পাওয়া যেত, আর ঝড়ের সময় নৌকাগুলো নিরাপদে আশ্রয় নিতে পারত।

কিন্তু সময়ের সঙ্গে মাছ ধরার শিল্প বদলে যায়। ১৯৮০-এর দশক থেকে বড়, নিরাপদ নৌকা ও ট্রলার ব্যবহারের ফলে জেলেদের আর আগের মতো ছোট ছোট দ্বীপের বাণিজ্যকেন্দ্রে থামার প্রয়োজন পড়েনি। ধীরে ধীরে ছোট আকারের মাছ ধরার অর্থনীতি ভেঙে পড়ে। স্টোট্টের জনসংখ্যাও কমতে থাকে।

একসময় যেখানে প্রায় ১২০ মানুষ বাস করতেন, বর্তমানে সারা বছর সেখানে স্থায়ীভাবে থাকেন মাত্র প্রায় ২৫ জন।What Life's Like in The World's Northernmost Naturally Inhabited Town |  Pulitzer Center

শহুরে জীবনের ক্লান্তি থেকে ফিরে আসা

এই পতনের গল্প অ্যান্ডারসেন খুব কাছ থেকে দেখেছেন। স্টোট্টেই তাঁর বেড়ে ওঠা। পরে বিশের কোঠায় তিনি নরওয়ের রাজধানী অসলোতে চলে যান এবং আন্তর্জাতিক করপোরেট জগতে ক্যারিয়ার গড়ে তোলেন।

কিন্তু ২০১১ সালে অতিরিক্ত কাজ ও ক্লান্তিতে তিনি আবার নিজের শিকড়ের দ্বীপে ফিরে আসেন। তখন অনেকেই মনে করেছিলেন, তিনি বেশিদিন সেখানে থাকবেন না।

অ্যান্ডারসেন অবশ্য অন্য কিছু দেখেছিলেন। তাঁর চোখে স্টোট্টের পতনের মধ্যেই ছিল নতুন সম্ভাবনা।

তিনি বুঝতে পারেন, যে জায়গাটি একসময় সমুদ্রের ঝড় থেকে জেলেদের আশ্রয় দিত, সেটিই এখন শহুরে জীবনের মানসিক চাপ থেকে মানুষকে দূরে রাখার জায়গা হতে পারে।

“আমি যখন ফিরে এসেছিলাম, সঙ্গে আশা নিয়ে এসেছিলাম”—তাঁর বক্তব্যের সারকথা এমনই।

পুরোনো মাছ ধরার কেন্দ্র থেকে নতুন পর্যটনকেন্দ্র

স্টোট্ট ব্রিগের বর্তমান হোটেলটি একাধিক পুরোনো ভবন নিয়ে গড়ে উঠেছে। রয়েছে মাছ ধরার পুরোনো জেলেদের কেবিন, পুনরুদ্ধার করা গুদামঘর এবং একসময়কার বেকারি ভবন। মোট ১৬টি কক্ষ রয়েছে সেখানে।

পুরোনো ভবনগুলোর চরিত্র ধরে রাখার চেষ্টা করা হয়েছে। কোথাও জেলেদের পুরোনো ছবি, কোথাও মাছ ধরার সরঞ্জাম, আবার কোথাও বহু বছরের হিসাবের খাতা ও ঐতিহাসিক পোস্টার। পুরোনো দোকানের কাউন্টারটিই এখন রেস্তোরাঁর বারে পরিণত হয়েছে।

একটি ছোট জাদুঘরে সংরক্ষিত আছে স্টোট্টের মাছ ধরার অতীত। সাদা-কালো ছবিতে দেখা যায় অ্যান্ডারসেনের দাদাকে কাঠের নৌকায় দাঁড়িয়ে থাকতে। অন্য ছবিতে দেখা যায় ছোট নৌকায় বিশাল পরিমাণ মাছ ধরার দৃশ্য।

তবে এটি কেবল অতীতকে ধরে রাখা কোনো জাদুঘর নয়। পুরোনো ঐতিহ্যের সঙ্গে আধুনিক পর্যটন সুবিধাও যুক্ত করা হয়েছে। পুরোনো বেকারি ভবনের কক্ষগুলোতে এখন আরামদায়ক থাকার ব্যবস্থা রয়েছে। আধুনিক প্রসাধনসামগ্রীর পাশাপাশি পুরোনো দিনের পরিবেশও বজায় রাখা হয়েছে।

যুদ্ধের স্মৃতিও রয়েছে দ্বীপে

স্টোট্টের ইতিহাস শুধু মাছ ধরা ও বাণিজ্যের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের স্মৃতিও দ্বীপটির ভূদৃশ্যের সঙ্গে মিশে আছে।

১৯৪১ সালে জার্মান দখলের পর দ্বীপে একটি উপকূলীয় সামরিক ঘাঁটি গড়ে তোলা হয়। সেখানে প্রায় ২০০ সেনা অবস্থান করত। পাহাড়ের ঢালে তৈরি করা হয়েছিল কংক্রিটের বাংকার ও সুড়ঙ্গ। ছিল ভূগর্ভস্থ হাসপাতাল, গোলাবারুদের গুদাম এবং কামানের অবস্থান।

আজ এসব স্থাপনা স্টোট্টের ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ নিদর্শন। পর্যটকেরা এসব সুড়ঙ্গ ও বাংকার ঘুরে দেখতে পারেন। এমনকি পুরোনো একটি যুদ্ধকালীন সুড়ঙ্গে বিশেষ নৈশভোজের ব্যবস্থাও করা হয়েছে।Svalbard: the Arctic islands where we can see the future of global heating  | Climate crisis | The Guardian

প্রকৃতিই এখানে সবচেয়ে বড় আকর্ষণ

তবে স্টোট্টের সবচেয়ে বড় সম্পদ কোনো ভবন বা জাদুঘর নয়—এর প্রকৃতি।

দ্বীপের চারপাশে নীল সমুদ্র, পাথুরে ভূমি, দূরের পাহাড়, ছোট ছোট সৈকত এবং বিচ্ছিন্ন লাল কেবিন। উপকূলের কাছাকাছি স্বচ্ছ নীলাভ পানিতে কায়াকিং করা যায়। সমুদ্রের ওপর দিয়ে নৌভ্রমণ করে পৌঁছানো যায় নিরিবিলি উপসাগর ও ছোট দ্বীপে।

এখানে দেখা মেলে সাদা-লেজের সামুদ্রিক ঈগলের। বসন্তে পরিযায়ী পাখিদের আনাগোনায় দ্বীপ আরও প্রাণবন্ত হয়ে ওঠে। গ্রীষ্মে আসে মধ্যরাতের সূর্যের সময়—দীর্ঘ সময় ধরে সূর্যের আলো থাকে, রাত নামলেও প্রকৃতি পুরোপুরি অন্ধকারে ডুবে যায় না।

শীতের চিত্র আবার সম্পূর্ণ আলাদা। নভেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারির মধ্যে উত্তর আকাশে দেখা যেতে পারে মেরুজ্যোতি। নির্মল আকাশে তারাভরা রাতও পর্যটকদের আকর্ষণ করে।

পর্যটনের মাধ্যমে দ্বীপকে আবার বাঁচানোর চেষ্টা

অ্যান্ডারসেনের পরিকল্পনা শুধু কয়েকটি হোটেলকক্ষ ভাড়া দেওয়া নয়। তাঁর বড় লক্ষ্য হলো পর্যটনের মাধ্যমে স্টোট্টের স্থানীয় সমাজকে আবার সক্রিয় করে তোলা।

তিনি পুরোনো মাছের কারখানাটিকে বিলাসবহুল থাকার জায়গায় রূপান্তর করছেন। লক্ষ্য আন্তর্জাতিক পর্যটক বাড়ানো এবং স্থানীয় মানুষের জন্য সারা বছর কাজের সুযোগ তৈরি করা।

হোটেলে এখন কায়াকিং, আর্কটিক সনা, দ্রুতগতির নৌভ্রমণ, মাছ ধরা এবং আশপাশের প্রকৃতি ঘুরে দেখার নানা আয়োজন রয়েছে। কাছের স্ভার্টিসেন হিমবাহেও নৌভ্রমণের ব্যবস্থা করা হয়।

অ্যান্ডারসেনের বিশ্বাস, স্টোট্টকে এমন একটি জায়গা বানানো সম্ভব যেখানে মানুষ শুধু বেড়াতে আসবে না, কিছু সময়ের জন্য আধুনিক জীবনের গতিও থামিয়ে দিতে পারবে।

‘জেন মোড’-এর দ্বীপ

অ্যান্ডারসেনের মেয়ে বেনেডিক্টও কিছু সময় অসলোতে থাকেন। কিন্তু স্টোট্টে ফিরে এলে তাঁর কাছে শহরের জীবন আর এই দ্বীপের পার্থক্য স্পষ্ট হয়ে ওঠে।

তাঁর ভাষায়, অসলোতে মানুষের জীবনে অনেক চাপ। কিন্তু স্টোট্টে এসে যেন অন্য এক শান্ত অবস্থায় চলে যাওয়া যায়। এখানে ব্যায়ামাগারে যাওয়ার কথা মনে রাখারও প্রয়োজন হয় না—বাইরে বের হয়ে পাহাড় আর প্রকৃতির দিকে তাকানোই যেন যথেষ্ট।

এই অনুভূতিটিই হয়তো স্টোট্টের নতুন পর্যটন পরিচয়ের মূল ভিত্তি।

কারণ আধুনিক পৃথিবীতে এমন জায়গার চাহিদা বাড়ছে, যেখানে মোবাইল, যানজট, অফিসের চাপ, নিরন্তর কাজ আর শহরের শব্দ থেকে দূরে থাকা যায়। স্টোট্ট সেই অভিজ্ঞতা দিতে পারে খুব স্বাভাবিকভাবেই।

নতুন মানুষের জন্য নতুন আশ্রয়

একসময় জেলেরা স্টোট্টে আসতেন বাঁচার জন্য। ঝড় থামার অপেক্ষায় তারা এখানে নোঙর করতেন। এখনকার পর্যটকেরা আসেন অন্য ধরনের ঝড় থেকে নিজেদের সরিয়ে নিতে—কাজের চাপ, মানসিক ক্লান্তি ও শহুরে ব্যস্ততা থেকে।

অ্যান্ডারসেনের স্বপ্ন আরও বড়। তিনি চান দ্বীপটিতে আবার মানুষের আনাগোনা বাড়ুক। নতুন কর্মসংস্থান তৈরি হোক, মানুষ দ্বীপ ছেড়ে চলে যাওয়ার বদলে থাকার কারণ খুঁজে পাক। এমনকি শিল্পী ও লেখকেরাও যেন এখানে এসে কাজ করার অনুপ্রেরণা পান।

তাঁর লক্ষ্য, পর্যটনের মাধ্যমে স্টোট্টের সমাজকে পুনর্গঠন করা।

এটি সহজ কাজ নয়। মাত্র ২৫ জন স্থায়ী বাসিন্দার একটি প্রত্যন্ত দ্বীপকে সারা বছর প্রাণবন্ত রাখা বড় চ্যালেঞ্জ। কিন্তু স্টোট্টের গল্পে এমন একটি বিষয় রয়েছে, যা হয়তো এই প্রচেষ্টাকে আলাদা করে তোলে—দ্বীপটি আগেও মানুষের আশ্রয় ছিল।

শুধু তখন আশ্রয় ছিল সমুদ্রের ঝড় থেকে। এখন সেটি হতে চাইছে আধুনিক জীবনের ঝড় থেকে মুক্তির জায়গা।

সমুদ্রের ওপারে পশ্চিম দিকে তাকালে স্টোট্ট থেকে গ্রিনল্যান্ড পর্যন্ত বিস্তৃত খোলা জলরাশি। চারপাশে কুয়াশা, পাথর, বাতাস আর নীরবতা। আর সেই নীরবতার মাঝেই পুরোনো মাছ ধরার ঘরগুলো নতুন জীবনের অপেক্ষায়।

১৮৯৭ সাল থেকে যে জায়গা পথিক ও জেলেদের স্বাগত জানিয়ে এসেছে, অ্যান্ডারসেনের স্বপ্নে সেটিই হয়তো আবার নতুন এক অধ্যায়ের দিকে এগোচ্ছে—এবার মাছ ধরার নৌকার জন্য নয়, বরং এমন মানুষের জন্য যারা কিছুদিনের জন্য পৃথিবীর দ্রুতগতি থেকে দূরে গিয়ে নিঃশ্বাস নিতে চান।