০৯:৪২ অপরাহ্ন, বুধবার, ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬
যুদ্ধের ভাষার আড়ালে কূটনীতির শেষ দরজা টিকটক শপে চারুকলা: শিল্পবাজার বদলের শুরু, নাকি ব্যর্থ এক পরীক্ষা? নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে ভারত এগিয়ে, কিন্তু বিদ্যুৎ গ্রিডে বাড়ছে চাপ প্রজ্ঞাপন জারি: জ্বালানি তেলের দাম বাড়ায় বাস-মিনিবাসের ভাড়া কিলোমিটারে ১৭ পয়সা বৃদ্ধি ২০ তলা থেকে সাইকেলসহ নানা জিনিস ছুড়ে দিলেন ব্যক্তি, ৬ ঘণ্টার পুলিশি অভিযানে আটক চাঁদের আলোয় সায়েন্স সেন্টারে এক রাতের নাচ-গান, সিঙ্গাপুরে ‘মুনবিটস: আফটারডার্ক’ একা থাকা ৭২ বছরের বৃদ্ধের মৃত্যু, দরজার নিচ দিয়ে রক্ত গড়িয়ে আসতেই মিলল মরদেহ টোকিওর কাছে টাইফুন দুজুয়ানের আঘাত, নিহত ৯, নিখোঁজ ৪ এল নিনোর তাপে ভারতে ফেব্রুয়ারির মধ্যে ১৫ হাজার ৮০০ মৃত্যুর শঙ্কা ইতিহাসের সবচেয়ে শক্তিশালী এল নিনো, চূড়ায় ওঠার আগেই ভাঙল রেকর্ড

নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে ভারত এগিয়ে, কিন্তু বিদ্যুৎ গ্রিডে বাড়ছে চাপ

ভারতে নবায়নযোগ্য জ্বালানির উৎপাদন দ্রুত বাড়লেও সেই বিদ্যুৎ সবার কাছে পৌঁছে দিতে পারছে না দেশটির বিদ্যুৎ গ্রিড। ফলে একদিকে সৌর, বায়ু, জলবিদ্যুৎ ও পারমাণবিক বিদ্যুতের সক্ষমতা দ্রুত বাড়ছে, অন্যদিকে গ্রিডের সীমাবদ্ধতার কারণে উৎপাদিত পরিচ্ছন্ন বিদ্যুতের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ ব্যবহার করা যাচ্ছে না।

চলতি বছরের জুলাইয়ের এক গরম দুপুরে ভারতের নবায়নযোগ্য জ্বালানি থেকে উৎপাদিত বিদ্যুৎ অল্প সময়ের জন্য দেশটির সর্বোচ্চ বিদ্যুৎ চাহিদার অর্ধেকেরও বেশি পূরণ করে। গত এক বছরে এটি ছিল দ্বিতীয়বারের মতো এমন ঘটনা। এর আগে গত বছরের প্রায় একই সময়ে প্রথমবার নবায়নযোগ্য উৎস থেকে উৎপাদিত বিদ্যুৎ সর্বোচ্চ চাহিদার অর্ধেকের বেশি পূরণ করেছিল।

সৌর, বায়ু, জলবিদ্যুৎ ও পারমাণবিক বিদ্যুৎ মিলিয়ে ওই সময়ে ভারতীয় বিদ্যুৎ ব্যবস্থায় কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদনকেও ছাড়িয়ে যায়। এতে দেশটির জ্বালানি ব্যবস্থায় অ-জীবাশ্মভিত্তিক বিদ্যুতের দ্রুত উত্থান স্পষ্ট হয়েছে।

পরিচ্ছন্ন জ্বালানি কোম্পানি রিনিউ পাওয়ারের প্রধান নির্বাহী সুমন্ত সিনহা বিবিসিকে বলেন, এই ঘটনা দেখিয়েছে যে নবায়নযোগ্য জ্বালানি আর বিদ্যুৎ ব্যবস্থার প্রান্তিক কোনো উৎস নয়; এটি এখন ব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠেছে।

তবে বাস্তবতা হলো, ভারতের মোট বিদ্যুৎ উৎপাদনের গড়ে প্রায় ৭০ শতাংশ এখনো কয়লাভিত্তিক কেন্দ্র থেকে আসে। কারণ সৌর ও বায়ুবিদ্যুৎ কেন্দ্রের তুলনায় কয়লাভিত্তিক কেন্দ্র বেশি সময় ধরে বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে পারে।

এক দশকে নবায়নযোগ্য সক্ষমতায় বড় পরিবর্তন

প্রায় এক দশক আগে ভারতে নবায়নযোগ্য জ্বালানি থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের স্থাপিত সক্ষমতা ছিল মাত্র ৪ গিগাওয়াটের কাছাকাছি। এখন তা বেড়ে প্রায় ৩০০ গিগাওয়াটে দাঁড়িয়েছে।

ভারতের মোট ৫৫২ গিগাওয়াট স্থাপিত বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতার প্রায় ৫৪ শতাংশ এখন অ-জীবাশ্মভিত্তিক উৎস থেকে আসে। এর মাধ্যমে ২০৩০ সালের লক্ষ্যমাত্রার পাঁচ বছর আগেই ভারত স্থাপিত বিদ্যুৎ সক্ষমতার অর্ধেক অ-জীবাশ্ম উৎস থেকে আনার লক্ষ্য অর্জন করেছে।

কিন্তু বিদ্যুৎ উৎপাদনের সক্ষমতা দ্রুত বাড়লেও সেই বিদ্যুৎ পরিবহন ও সংরক্ষণের অবকাঠামো একই গতিতে তৈরি হয়নি। ফলে নতুন সক্ষমতা যুক্ত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে গ্রিডের ওপর চাপও বাড়ছে।

উৎপাদনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে বাড়েনি সঞ্চালন ব্যবস্থা

নবায়নযোগ্য বিদ্যুৎ উৎপাদনের বিস্তার বিদ্যুৎ সঞ্চালন অবকাঠামোর সম্প্রসারণকে অনেকটাই ছাড়িয়ে গেছে। এতে উৎপাদনকেন্দ্র থেকে গ্রাহকের কাছে বিদ্যুৎ পৌঁছে দেওয়া কঠিন হয়ে পড়ছে।

বিশ্বের জ্বালানি খাত নিয়ে গবেষণা করা প্রতিষ্ঠান এম্বারের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের প্রথম তিন মাসে ভারতে নবায়নযোগ্য বিদ্যুৎ উৎপাদন কমিয়ে দেওয়ার বা ব্যবহার না করার মোট ঘটনার প্রায় দুই-তৃতীয়াংশের কারণ ছিল সঞ্চালন ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা। এর পরিমাণ ছিল প্রায় ৩০০ গিগাওয়াট-ঘণ্টা।

অর্থাৎ বিদ্যুৎ উৎপাদনের সক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও গ্রিডে পর্যাপ্ত জায়গা না থাকায় উল্লেখযোগ্য পরিমাণ পরিচ্ছন্ন বিদ্যুৎ ব্যবহার করা সম্ভব হয়নি।

দেশটির আন্তঃরাজ্য বিদ্যুৎ সঞ্চালন প্রকল্পগুলোর প্রায় চারটির মধ্যে একটি এক বছরের বেশি সময় ধরে বিলম্বিত হচ্ছে। এতে বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্র নির্মাণ এবং সঞ্চালন অবকাঠামো তৈরির মধ্যে ব্যবধান আরও বাড়ছে।

সুমন্ত সিনহার মতে, একটি বিদ্যুৎ উৎপাদন প্রকল্প নির্মাণে সাধারণত ১৮ থেকে ২৪ মাস সময় লাগে। কিন্তু সঞ্চালন প্রকল্প বাস্তবায়নে আরও বেশি সময় প্রয়োজন হয়। জমি অধিগ্রহণ, বিদ্যুৎ লাইন স্থাপনের অধিকার, সরকারি অনুমোদন এবং বিভিন্ন সংস্থার মধ্যে সমন্বয়ের কারণে এসব প্রকল্পে দীর্ঘসূত্রতা তৈরি হয়।

ইনস্টিটিউট ফর এনার্জি ইকোনমিকস অ্যান্ড ফাইন্যান্সিয়াল অ্যানালাইসিসের ভিভূতি গার্গও সমস্যাটিকে দুর্বল পরিকল্পনার সঙ্গে যুক্ত করেছেন।

তার মতে, ভারত যখন বছরে ১০ থেকে ১৫ গিগাওয়াট করে নতুন বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা যুক্ত করছিল, তখন বিদ্যমান গ্রিড সেই চাপ সামলাতে পারছিল। কিন্তু গত বছর নতুন সক্ষমতা যুক্ত হয়েছে রেকর্ড ৫১ গিগাওয়াট। ফলে পুরোনো সঞ্চালন ব্যবস্থার ওপর চাপ অনেক বেড়েছে।

গুজরাট ও রাজস্থানে কেন্দ্রীভূত উৎপাদনেও সমস্যা

ভারতের নবায়নযোগ্য জ্বালানি প্রকল্পের বড় একটি অংশ দেশটির উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলীয় গুজরাট ও রাজ্যস্থানে গড়ে উঠেছে। এসব এলাকায় সৌর ও বায়ুবিদ্যুতের সম্ভাবনা বেশি হওয়ায় বিপুল পরিমাণ নতুন প্রকল্প তৈরি হয়েছে।

কিন্তু উৎপাদনকেন্দ্রগুলো থেকে দেশের অন্যান্য অঞ্চলে বিদ্যুৎ পাঠানোর মতো পর্যাপ্ত সঞ্চালন অবকাঠামো তৈরি না হওয়ায় সমস্যা আরও তীব্র হয়েছে।

এম্বারের বিশ্লেষকদের মতে, দ্রুত বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ার সঙ্গে ধীরগতির সঞ্চালন অবকাঠামোর এই ব্যবধান ২০৩০ সালের মধ্যে ভারতের ৫০০ গিগাওয়াট অ-জীবাশ্মভিত্তিক বিদ্যুৎ সক্ষমতার লক্ষ্যের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পরিচালনাগত ঝুঁকি হয়ে উঠেছে।5 reasons why India is set to lead the global renewable energy revolution

ব্যাটারি সংরক্ষণে কমতে পারে বিদ্যুতের অপচয়

এই সমস্যার একটি সম্ভাব্য সমাধান হতে পারে বড় পরিসরের বিদ্যুৎ সংরক্ষণ ব্যবস্থা। বিশেষ করে নবায়নযোগ্য বিদ্যুৎ উৎপাদনের কেন্দ্রগুলোর কাছে ব্যাটারি সংরক্ষণ ব্যবস্থা তৈরি করা গেলে দিনের বেলায় অতিরিক্ত সৌরবিদ্যুৎ জমিয়ে রাখা সম্ভব হবে। পরে সন্ধ্যায় সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন কমে গেলে সেই বিদ্যুৎ গ্রিডে সরবরাহ করা যাবে।

ভিভূতি গার্গের মতে, এমন ব্যবস্থা থাকলে দিনের অতিরিক্ত বিদ্যুৎ নষ্ট না করে সন্ধ্যার চাহিদার সময় ব্যবহার করা যেত।

কিন্তু ভারতের বিদ্যুৎ সংরক্ষণ সক্ষমতা এখনো প্রয়োজনের তুলনায় কম। ব্যাটারির দাম বৃদ্ধি, মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের সঙ্গে সম্পর্কিত কাঁচামালের সরবরাহ সংকট এবং ভারতীয় মুদ্রার মূল্য কমে যাওয়ায় দেশটির কোম্পানিগুলোর জন্য প্রকল্পের অর্থায়ন ব্যয়বহুল হয়ে উঠেছে।

এর ফলে পরিকল্পনা করা অনেক বিদ্যুৎ সংরক্ষণ প্রকল্প বাস্তবায়ন থেকে বাদ পড়েছে।

অর্থায়নও বড় বাধা

ভারতের পরিচ্ছন্ন জ্বালানি খাতের জন্য শুধু অবকাঠামো নয়, অর্থায়নও বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

২০৩০ সালের মধ্যে ৫০০ গিগাওয়াট নবায়নযোগ্য বিদ্যুৎ সক্ষমতার লক্ষ্য অর্জনে ভারতের আনুমানিক ৪০০ থেকে ৫০০ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ প্রয়োজন হবে। কিন্তু দেশটির সরকারি অর্থনৈতিক সমীক্ষা অনুযায়ী, জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় ব্যবহৃত অর্থের প্রায় ৮৩ শতাংশই বর্তমানে অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে আসে।

প্যারিস জলবায়ু চুক্তির আওতায় উন্নত দেশগুলো ২০২৫ সাল পর্যন্ত উন্নয়নশীল দেশগুলোকে প্রতিবছর ১০০ বিলিয়ন ডলার জলবায়ু অর্থায়নের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। কিন্তু সেই অর্থায়নে প্রবেশাধিকার পাওয়া এখনো কঠিন।

সুমন্ত সিনহার মতে, ভারত তার পুরো জ্বালানি রূপান্তরের অর্থায়ন উন্নত দেশগুলোর কাছ থেকে চায় না। তবে কম সুদের ঋণ, ঋণের নিশ্চয়তা এবং বৈদেশিক মুদ্রার বিনিময় হারজনিত ঝুঁকি থেকে সুরক্ষার মতো সহায়তা পাওয়া গেলে বেসরকারি বিনিয়োগ আরও বাড়তে পারে।

তিনি বলেন, চীনের বাইরে উদীয়মান ও উন্নয়নশীল দেশগুলো বিশ্বের মোট পরিচ্ছন্ন জ্বালানি বিনিয়োগের মাত্র প্রায় ১৫ শতাংশ পায়, যদিও বিশ্বের মোট জনসংখ্যার প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ এসব দেশে বাস করে।

বিদ্যুতের চাহিদা বাড়ায় সংকট আরও তীব্র হতে পারে

ভারতের বিদ্যুৎ চাহিদা দ্রুত বাড়ছে। দেশটি বিশ্বের তৃতীয় বৃহত্তম গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণকারী দেশগুলোর একটি। একই সময়ে দেশটির বিদ্যুৎ চাহিদা বছরে গড়ে ৭ শতাংশের বেশি হারে বাড়ছে।

ডেটা সেন্টার, সেমিকন্ডাক্টর বা চিপ উৎপাদনসহ বিদ্যুৎনির্ভর শিল্পের সম্প্রসারণের ফলে ভবিষ্যতে এই চাহিদা আরও বাড়তে পারে।

আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থা বা আইইএ-র পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০৩৫ সালের মধ্যে ভারতের বিদ্যুৎ চাহিদা ৮০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়তে পারে। উদীয়মান অর্থনীতিগুলোর মধ্যে এটিই হবে সবচেয়ে বড় বৃদ্ধিগুলোর একটি।

ভারতের নবায়নযোগ্য জ্বালানি সম্প্রসারণ অবশ্য ইতোমধ্যে বৈশ্বিক কার্বন নিঃসরণ বৃদ্ধির গতি কমাতে ভূমিকা রাখছে। উন্নত অর্থনীতিগুলোতে জ্বালানি খাতের কার্বন ডাই-অক্সাইড নিঃসরণ ১৯৯০-এর দশকের পর সবচেয়ে দ্রুত হারে বাড়লেও ভারতের নবায়নযোগ্য জ্বালানির দ্রুত সম্প্রসারণ বৈশ্বিক জ্বালানি রূপান্তরে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।

তবে উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ানোই এখন ভারতের সামনে একমাত্র চ্যালেঞ্জ নয়। উৎপাদিত বিদ্যুৎ মানুষের ঘর, শিল্পকারখানা ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে পৌঁছে দেওয়া এবং প্রয়োজনের সময় ব্যবহারের জন্য সংরক্ষণ করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।

ভারত যদি সঞ্চালন ব্যবস্থা, বিদ্যুৎ সংরক্ষণ এবং দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়নের ঘাটতি দূর করতে পারে, তাহলে নতুন করে উৎপাদিত পরিচ্ছন্ন বিদ্যুতের বড় অংশ কাজে লাগানো সম্ভব হবে। আর এসব বাধা দূর করতে ব্যর্থ হলে নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বিপুল বিনিয়োগের পরও উৎপাদিত বিদ্যুতের একটি অংশ অব্যবহৃত থেকে যাওয়ার ঝুঁকি থাকবে।

বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ বিদ্যুৎ বাজার হিসেবে ভারতের এই রূপান্তরের সাফল্য শুধু দেশটির জ্বালানি নিরাপত্তার জন্য নয়, বৈশ্বিক কার্বন নিঃসরণ কমানোর প্রচেষ্টার জন্যও গুরুত্বপূর্ণ।

জনপ্রিয় সংবাদ

যুদ্ধের ভাষার আড়ালে কূটনীতির শেষ দরজা

নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে ভারত এগিয়ে, কিন্তু বিদ্যুৎ গ্রিডে বাড়ছে চাপ

০৮:৪৩:৪০ অপরাহ্ন, বুধবার, ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬

ভারতে নবায়নযোগ্য জ্বালানির উৎপাদন দ্রুত বাড়লেও সেই বিদ্যুৎ সবার কাছে পৌঁছে দিতে পারছে না দেশটির বিদ্যুৎ গ্রিড। ফলে একদিকে সৌর, বায়ু, জলবিদ্যুৎ ও পারমাণবিক বিদ্যুতের সক্ষমতা দ্রুত বাড়ছে, অন্যদিকে গ্রিডের সীমাবদ্ধতার কারণে উৎপাদিত পরিচ্ছন্ন বিদ্যুতের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ ব্যবহার করা যাচ্ছে না।

চলতি বছরের জুলাইয়ের এক গরম দুপুরে ভারতের নবায়নযোগ্য জ্বালানি থেকে উৎপাদিত বিদ্যুৎ অল্প সময়ের জন্য দেশটির সর্বোচ্চ বিদ্যুৎ চাহিদার অর্ধেকেরও বেশি পূরণ করে। গত এক বছরে এটি ছিল দ্বিতীয়বারের মতো এমন ঘটনা। এর আগে গত বছরের প্রায় একই সময়ে প্রথমবার নবায়নযোগ্য উৎস থেকে উৎপাদিত বিদ্যুৎ সর্বোচ্চ চাহিদার অর্ধেকের বেশি পূরণ করেছিল।

সৌর, বায়ু, জলবিদ্যুৎ ও পারমাণবিক বিদ্যুৎ মিলিয়ে ওই সময়ে ভারতীয় বিদ্যুৎ ব্যবস্থায় কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদনকেও ছাড়িয়ে যায়। এতে দেশটির জ্বালানি ব্যবস্থায় অ-জীবাশ্মভিত্তিক বিদ্যুতের দ্রুত উত্থান স্পষ্ট হয়েছে।

পরিচ্ছন্ন জ্বালানি কোম্পানি রিনিউ পাওয়ারের প্রধান নির্বাহী সুমন্ত সিনহা বিবিসিকে বলেন, এই ঘটনা দেখিয়েছে যে নবায়নযোগ্য জ্বালানি আর বিদ্যুৎ ব্যবস্থার প্রান্তিক কোনো উৎস নয়; এটি এখন ব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠেছে।

তবে বাস্তবতা হলো, ভারতের মোট বিদ্যুৎ উৎপাদনের গড়ে প্রায় ৭০ শতাংশ এখনো কয়লাভিত্তিক কেন্দ্র থেকে আসে। কারণ সৌর ও বায়ুবিদ্যুৎ কেন্দ্রের তুলনায় কয়লাভিত্তিক কেন্দ্র বেশি সময় ধরে বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে পারে।

এক দশকে নবায়নযোগ্য সক্ষমতায় বড় পরিবর্তন

প্রায় এক দশক আগে ভারতে নবায়নযোগ্য জ্বালানি থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের স্থাপিত সক্ষমতা ছিল মাত্র ৪ গিগাওয়াটের কাছাকাছি। এখন তা বেড়ে প্রায় ৩০০ গিগাওয়াটে দাঁড়িয়েছে।

ভারতের মোট ৫৫২ গিগাওয়াট স্থাপিত বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতার প্রায় ৫৪ শতাংশ এখন অ-জীবাশ্মভিত্তিক উৎস থেকে আসে। এর মাধ্যমে ২০৩০ সালের লক্ষ্যমাত্রার পাঁচ বছর আগেই ভারত স্থাপিত বিদ্যুৎ সক্ষমতার অর্ধেক অ-জীবাশ্ম উৎস থেকে আনার লক্ষ্য অর্জন করেছে।

কিন্তু বিদ্যুৎ উৎপাদনের সক্ষমতা দ্রুত বাড়লেও সেই বিদ্যুৎ পরিবহন ও সংরক্ষণের অবকাঠামো একই গতিতে তৈরি হয়নি। ফলে নতুন সক্ষমতা যুক্ত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে গ্রিডের ওপর চাপও বাড়ছে।

উৎপাদনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে বাড়েনি সঞ্চালন ব্যবস্থা

নবায়নযোগ্য বিদ্যুৎ উৎপাদনের বিস্তার বিদ্যুৎ সঞ্চালন অবকাঠামোর সম্প্রসারণকে অনেকটাই ছাড়িয়ে গেছে। এতে উৎপাদনকেন্দ্র থেকে গ্রাহকের কাছে বিদ্যুৎ পৌঁছে দেওয়া কঠিন হয়ে পড়ছে।

বিশ্বের জ্বালানি খাত নিয়ে গবেষণা করা প্রতিষ্ঠান এম্বারের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের প্রথম তিন মাসে ভারতে নবায়নযোগ্য বিদ্যুৎ উৎপাদন কমিয়ে দেওয়ার বা ব্যবহার না করার মোট ঘটনার প্রায় দুই-তৃতীয়াংশের কারণ ছিল সঞ্চালন ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা। এর পরিমাণ ছিল প্রায় ৩০০ গিগাওয়াট-ঘণ্টা।

অর্থাৎ বিদ্যুৎ উৎপাদনের সক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও গ্রিডে পর্যাপ্ত জায়গা না থাকায় উল্লেখযোগ্য পরিমাণ পরিচ্ছন্ন বিদ্যুৎ ব্যবহার করা সম্ভব হয়নি।

দেশটির আন্তঃরাজ্য বিদ্যুৎ সঞ্চালন প্রকল্পগুলোর প্রায় চারটির মধ্যে একটি এক বছরের বেশি সময় ধরে বিলম্বিত হচ্ছে। এতে বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্র নির্মাণ এবং সঞ্চালন অবকাঠামো তৈরির মধ্যে ব্যবধান আরও বাড়ছে।

সুমন্ত সিনহার মতে, একটি বিদ্যুৎ উৎপাদন প্রকল্প নির্মাণে সাধারণত ১৮ থেকে ২৪ মাস সময় লাগে। কিন্তু সঞ্চালন প্রকল্প বাস্তবায়নে আরও বেশি সময় প্রয়োজন হয়। জমি অধিগ্রহণ, বিদ্যুৎ লাইন স্থাপনের অধিকার, সরকারি অনুমোদন এবং বিভিন্ন সংস্থার মধ্যে সমন্বয়ের কারণে এসব প্রকল্পে দীর্ঘসূত্রতা তৈরি হয়।

ইনস্টিটিউট ফর এনার্জি ইকোনমিকস অ্যান্ড ফাইন্যান্সিয়াল অ্যানালাইসিসের ভিভূতি গার্গও সমস্যাটিকে দুর্বল পরিকল্পনার সঙ্গে যুক্ত করেছেন।

তার মতে, ভারত যখন বছরে ১০ থেকে ১৫ গিগাওয়াট করে নতুন বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা যুক্ত করছিল, তখন বিদ্যমান গ্রিড সেই চাপ সামলাতে পারছিল। কিন্তু গত বছর নতুন সক্ষমতা যুক্ত হয়েছে রেকর্ড ৫১ গিগাওয়াট। ফলে পুরোনো সঞ্চালন ব্যবস্থার ওপর চাপ অনেক বেড়েছে।

গুজরাট ও রাজস্থানে কেন্দ্রীভূত উৎপাদনেও সমস্যা

ভারতের নবায়নযোগ্য জ্বালানি প্রকল্পের বড় একটি অংশ দেশটির উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলীয় গুজরাট ও রাজ্যস্থানে গড়ে উঠেছে। এসব এলাকায় সৌর ও বায়ুবিদ্যুতের সম্ভাবনা বেশি হওয়ায় বিপুল পরিমাণ নতুন প্রকল্প তৈরি হয়েছে।

কিন্তু উৎপাদনকেন্দ্রগুলো থেকে দেশের অন্যান্য অঞ্চলে বিদ্যুৎ পাঠানোর মতো পর্যাপ্ত সঞ্চালন অবকাঠামো তৈরি না হওয়ায় সমস্যা আরও তীব্র হয়েছে।

এম্বারের বিশ্লেষকদের মতে, দ্রুত বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ার সঙ্গে ধীরগতির সঞ্চালন অবকাঠামোর এই ব্যবধান ২০৩০ সালের মধ্যে ভারতের ৫০০ গিগাওয়াট অ-জীবাশ্মভিত্তিক বিদ্যুৎ সক্ষমতার লক্ষ্যের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পরিচালনাগত ঝুঁকি হয়ে উঠেছে।5 reasons why India is set to lead the global renewable energy revolution

ব্যাটারি সংরক্ষণে কমতে পারে বিদ্যুতের অপচয়

এই সমস্যার একটি সম্ভাব্য সমাধান হতে পারে বড় পরিসরের বিদ্যুৎ সংরক্ষণ ব্যবস্থা। বিশেষ করে নবায়নযোগ্য বিদ্যুৎ উৎপাদনের কেন্দ্রগুলোর কাছে ব্যাটারি সংরক্ষণ ব্যবস্থা তৈরি করা গেলে দিনের বেলায় অতিরিক্ত সৌরবিদ্যুৎ জমিয়ে রাখা সম্ভব হবে। পরে সন্ধ্যায় সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন কমে গেলে সেই বিদ্যুৎ গ্রিডে সরবরাহ করা যাবে।

ভিভূতি গার্গের মতে, এমন ব্যবস্থা থাকলে দিনের অতিরিক্ত বিদ্যুৎ নষ্ট না করে সন্ধ্যার চাহিদার সময় ব্যবহার করা যেত।

কিন্তু ভারতের বিদ্যুৎ সংরক্ষণ সক্ষমতা এখনো প্রয়োজনের তুলনায় কম। ব্যাটারির দাম বৃদ্ধি, মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের সঙ্গে সম্পর্কিত কাঁচামালের সরবরাহ সংকট এবং ভারতীয় মুদ্রার মূল্য কমে যাওয়ায় দেশটির কোম্পানিগুলোর জন্য প্রকল্পের অর্থায়ন ব্যয়বহুল হয়ে উঠেছে।

এর ফলে পরিকল্পনা করা অনেক বিদ্যুৎ সংরক্ষণ প্রকল্প বাস্তবায়ন থেকে বাদ পড়েছে।

অর্থায়নও বড় বাধা

ভারতের পরিচ্ছন্ন জ্বালানি খাতের জন্য শুধু অবকাঠামো নয়, অর্থায়নও বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

২০৩০ সালের মধ্যে ৫০০ গিগাওয়াট নবায়নযোগ্য বিদ্যুৎ সক্ষমতার লক্ষ্য অর্জনে ভারতের আনুমানিক ৪০০ থেকে ৫০০ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ প্রয়োজন হবে। কিন্তু দেশটির সরকারি অর্থনৈতিক সমীক্ষা অনুযায়ী, জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় ব্যবহৃত অর্থের প্রায় ৮৩ শতাংশই বর্তমানে অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে আসে।

প্যারিস জলবায়ু চুক্তির আওতায় উন্নত দেশগুলো ২০২৫ সাল পর্যন্ত উন্নয়নশীল দেশগুলোকে প্রতিবছর ১০০ বিলিয়ন ডলার জলবায়ু অর্থায়নের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। কিন্তু সেই অর্থায়নে প্রবেশাধিকার পাওয়া এখনো কঠিন।

সুমন্ত সিনহার মতে, ভারত তার পুরো জ্বালানি রূপান্তরের অর্থায়ন উন্নত দেশগুলোর কাছ থেকে চায় না। তবে কম সুদের ঋণ, ঋণের নিশ্চয়তা এবং বৈদেশিক মুদ্রার বিনিময় হারজনিত ঝুঁকি থেকে সুরক্ষার মতো সহায়তা পাওয়া গেলে বেসরকারি বিনিয়োগ আরও বাড়তে পারে।

তিনি বলেন, চীনের বাইরে উদীয়মান ও উন্নয়নশীল দেশগুলো বিশ্বের মোট পরিচ্ছন্ন জ্বালানি বিনিয়োগের মাত্র প্রায় ১৫ শতাংশ পায়, যদিও বিশ্বের মোট জনসংখ্যার প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ এসব দেশে বাস করে।

বিদ্যুতের চাহিদা বাড়ায় সংকট আরও তীব্র হতে পারে

ভারতের বিদ্যুৎ চাহিদা দ্রুত বাড়ছে। দেশটি বিশ্বের তৃতীয় বৃহত্তম গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণকারী দেশগুলোর একটি। একই সময়ে দেশটির বিদ্যুৎ চাহিদা বছরে গড়ে ৭ শতাংশের বেশি হারে বাড়ছে।

ডেটা সেন্টার, সেমিকন্ডাক্টর বা চিপ উৎপাদনসহ বিদ্যুৎনির্ভর শিল্পের সম্প্রসারণের ফলে ভবিষ্যতে এই চাহিদা আরও বাড়তে পারে।

আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থা বা আইইএ-র পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০৩৫ সালের মধ্যে ভারতের বিদ্যুৎ চাহিদা ৮০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়তে পারে। উদীয়মান অর্থনীতিগুলোর মধ্যে এটিই হবে সবচেয়ে বড় বৃদ্ধিগুলোর একটি।

ভারতের নবায়নযোগ্য জ্বালানি সম্প্রসারণ অবশ্য ইতোমধ্যে বৈশ্বিক কার্বন নিঃসরণ বৃদ্ধির গতি কমাতে ভূমিকা রাখছে। উন্নত অর্থনীতিগুলোতে জ্বালানি খাতের কার্বন ডাই-অক্সাইড নিঃসরণ ১৯৯০-এর দশকের পর সবচেয়ে দ্রুত হারে বাড়লেও ভারতের নবায়নযোগ্য জ্বালানির দ্রুত সম্প্রসারণ বৈশ্বিক জ্বালানি রূপান্তরে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।

তবে উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ানোই এখন ভারতের সামনে একমাত্র চ্যালেঞ্জ নয়। উৎপাদিত বিদ্যুৎ মানুষের ঘর, শিল্পকারখানা ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে পৌঁছে দেওয়া এবং প্রয়োজনের সময় ব্যবহারের জন্য সংরক্ষণ করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।

ভারত যদি সঞ্চালন ব্যবস্থা, বিদ্যুৎ সংরক্ষণ এবং দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়নের ঘাটতি দূর করতে পারে, তাহলে নতুন করে উৎপাদিত পরিচ্ছন্ন বিদ্যুতের বড় অংশ কাজে লাগানো সম্ভব হবে। আর এসব বাধা দূর করতে ব্যর্থ হলে নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বিপুল বিনিয়োগের পরও উৎপাদিত বিদ্যুতের একটি অংশ অব্যবহৃত থেকে যাওয়ার ঝুঁকি থাকবে।

বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ বিদ্যুৎ বাজার হিসেবে ভারতের এই রূপান্তরের সাফল্য শুধু দেশটির জ্বালানি নিরাপত্তার জন্য নয়, বৈশ্বিক কার্বন নিঃসরণ কমানোর প্রচেষ্টার জন্যও গুরুত্বপূর্ণ।