প্রশান্ত মহাসাগরে গড়ে ওঠা এল নিনো এখন রেকর্ডে থাকা সবচেয়ে শক্তিশালী। সমুদ্রের তাপমাত্রা পর্যবেক্ষণকারী বিজ্ঞানীদের বরাতে ব্রিটিশ সম্প্রচারমাধ্যম বিবিসি এ খবর দিয়েছে। মধ্য-পূর্ব প্রশান্ত মহাসাগরের একটি গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চলে ১৯ সেপ্টেম্বর সমুদ্রপৃষ্ঠের দৈনিক তাপমাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে ৩ দশমিক ০৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেশি ছিল। এর আগের রেকর্ড ছিল ২০১৫ সালের খুব শক্তিশালী এল নিনোর সময়ের ৩ দশমিক ০২ ডিগ্রি। অথচ এবারের এল নিনো চূড়ায় পৌঁছাবে বছরের শেষ দিকে। যুক্তরাজ্যের আবহাওয়া দপ্তরের দীর্ঘমেয়াদি পূর্বাভাস বিভাগের প্রধান অ্যাডাম স্কাইফ বলেন, কয়েক মাস ধরেই তাঁরা বলছিলেন এটি নজিরবিহীন হবে। চূড়ায় ওঠার কয়েক সপ্তাহ আগেই রেকর্ড ভাঙা এর বিশালতা দেখায়। রেকর্ড ভাঙা এল নিনো তাই এখন বিশ্বজুড়ে আবহাওয়াবিদদের প্রধান নজরের বিষয়।
এল নিনো একটি প্রাকৃতিক জলবায়ু প্রক্রিয়া, যা দুই থেকে সাত বছর পরপর আসে এবং সাধারণত এক বছরের মতো থাকে। সাধারণত প্রশান্ত মহাসাগরে পূর্ব থেকে পশ্চিমে যে বাণিজ্য বায়ু বয়, তা দুর্বল হয় বা উল্টো দিকে বইতে শুরু করে। তখন উষ্ণ পানি পূর্ব দিকে ছড়িয়ে পড়ে। সমুদ্র থেকে তাপ বায়ুমণ্ডলে মিশে বিশ্বের তাপমাত্রা বাড়িয়ে দেয় এবং আবহাওয়ার ধরন বদলে দেয়। তাপমাত্রা মাপার একাধিক পদ্ধতি আছে। দৈনিক সমুদ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রার ভিত্তিতে রেকর্ড ভেঙেছে। জলবায়ু পরিবর্তনের পটভূমি উষ্ণতা বাদ দিয়ে হিসাব করা আরেকটি সূচকে এখনো রেকর্ড হয়নি। তবে বিজ্ঞানীরা বলছেন, আগামী সপ্তাহগুলোতে সেটিও ভাঙতে পারে।
প্রভাব ইতিমধ্যে দেখা যাচ্ছে। এল নিনোর বছরে সাধারণত ভারতে বর্ষার বৃষ্টি কম হয়। ভারতের আবহাওয়া দপ্তরের হিসাবে ২২ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত দক্ষিণ-পশ্চিম মৌসুমি বায়ু স্বাভাবিকের চেয়ে ১৫ শতাংশ কম বৃষ্টি দিয়েছে। আটলান্টিকে এ বছর এখনো একটিও হারিকেন তৈরি হয়নি। উপগ্রহে পর্যবেক্ষণ শুরুর পর এত দেরিতে প্রথম হারিকেন না আসার রেকর্ড এটি। অন্যদিকে প্রশান্ত মহাসাগরে উষ্ণ পানি থেকে শক্তি নিয়ে ঘূর্ণিঝড় আরও ভয়ংকর হচ্ছে। ইকুয়েডর ও পেরুর উপকূলে বন্যার ঝুঁকি বেড়েছে। ব্রাজিল, অস্ট্রেলিয়া ও ইন্দোনেশিয়ায় খরা ও দাবানলের আশঙ্কা বাড়ছে। এসব প্রভাব ফসল, খাদ্য নিরাপত্তা ও অর্থনীতিতে ধাক্কা দিতে পারে।
বাংলাদেশের জন্য রেকর্ড ভাঙা এল নিনো মানে কয়েকটি নির্দিষ্ট ঝুঁকি। ভারতের মতো বাংলাদেশেও বর্ষার বৃষ্টি কম হলে আমন ধান ও সেচের ওপর চাপ পড়ে। শীতের আগে ও পরে তাপপ্রবাহ তীব্র হতে পারে। এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক ইতিমধ্যে সতর্ক করেছে, এল নিনোর বিলম্বিত প্রভাবে বাংলাদেশে খাদ্যের দাম বাড়তে পারে। বিশ্ববাজারে চাল ও গমের দাম বাড়লে আমদানি খরচও বাড়বে। রেকর্ড ভাঙা এল নিনো বঙ্গোপসাগরে ঘূর্ণিঝড়ের ধরনে কোনো প্রভাব ফেলে কি না, সেদিকেও নজর রাখা দরকার। উপকূলের মানুষের জন্য তাই আগাম সতর্কতাব্যবস্থা সচল রাখা জরুরি। কৃষি বিভাগ, খাদ্য মন্ত্রণালয় ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষের এখনই সমন্বিত প্রস্তুতি নেওয়া দরকার।
বিজ্ঞানীরা সতর্ক করছেন, নজিরবিহীন শক্তি মানেই নজিরবিহীন প্রভাব নয়। প্রতিটি এল নিনো আলাদা। কিন্তু এবারের এল নিনো প্রথম রেকর্ড ভেঙেছে চূড়ায় ওঠার আগেই, আর চূড়া এখনো কয়েক সপ্তাহ দূরে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















