বিশ্বের বৃহত্তম মানবিক সহায়তা সংস্থা ইউএসএইড বিলুপ্ত করে দিয়েছে ট্রাম্প প্রশাসন। ১৯৬০-এর দশকে প্রেসিডেন্ট কেনেডি ও মার্কিন কংগ্রেসের উদ্যোগে সফট পাওয়ার কূটনীতি ও মানবিক সহায়তার হাতিয়ার হিসেবে গড়ে ওঠা এই সংস্থার অবসান এখন বিশ্বজুড়ে মানবিক সংকট আরও গভীর করছে।
দ্য ল্যানসেটের এক গবেষণা অনুযায়ী, ২০০০-এর দশকে ইউএসএইডের কার্যক্রম বিশ্বজুড়ে প্রায় নয় কোটি দশ লাখ মানুষের মৃত্যু ঠেকিয়েছিল, যার মধ্যে পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশু ছিল তিন কোটি। গেটস ফাউন্ডেশনের পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০২৫ সাল এই শতাব্দীর প্রথম বছর হতে যাচ্ছে যেখানে বিশ্বজুড়ে শিশুমৃত্যুর হার বাড়বে, কমার বদলে।
অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসের অনুসন্ধানে দেখা গেছে, তহবিল কাটছাঁটের পর বিভিন্ন দেশে ব্যাপক ক্ষুধা, ওষুধ সংকট এবং বাল্যবিবাহ, অপহরণ ও মানব পাচার বেড়েছে। নেপালে পুষ্টি ও প্রসবপূর্ব সেবা কর্মসূচি বন্ধ হওয়ার পর গর্ভবতী নারী ও নবজাতকের মৃত্যু হয়েছে, আর মিয়ানমার, নাইজেরিয়া ও সোমালিয়ায় খাদ্য সহায়তা কমার পর শিশুমৃত্যু বেড়েছে।
তহবিল কাটছাঁটে সম্মুখসারির কর্মীদের চাকরিও হারাতে হয়েছে, যারা মৃত্যুর তথ্য সংগ্রহ করতেন, ফলে প্রকৃত ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ আড়ালে থেকে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর অবশ্য দাবি করেছে, তারা সহায়তা কর্মসূচিকে “দক্ষতা, কার্যকারিতা ও অংশীদারত্বের” ভিত্তিতে নতুন করে সাজিয়েছে এবং বাকি বিশ্বকেও আরও বেশি অবদান রাখতে হবে।
নতুন মডেলে ট্রাম্প প্রশাসন এনজিও-নির্ভর সহায়তার বদলে সরাসরি সরকারের সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক চুক্তির পথে হাঁটছে, যেখানে সহায়তার বিনিময়ে স্বাস্থ্য তথ্যের মতো ছাড় চাওয়া হচ্ছে, যা কিছু দেশ গোপনীয়তার শঙ্কায় প্রত্যাখ্যান করছে।
মানবাধিকার সংগঠনগুলো সতর্ক করছে, এই ইউএসএইড বিলুপ্তির প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়ছে তাদের ওপর যারা নিজেরা কখনো এই নীতিনির্ধারণী আলোচনায় অংশ নেননি, দরিদ্র দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের নারী ও শিশুরা। বিকল্প দাতা হিসেবে ইউরোপীয় ইউনিয়ন, উপসাগরীয় দেশ ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো এগিয়ে এলেও তাদের সম্মিলিত সহায়তার পরিমাণ ইউএসএইডের শূন্যস্থান পূরণে যথেষ্ট নয় বলে মনে করছেন সাহায্য সংস্থার কর্মকর্তারা।
বাংলাদেশও দীর্ঘদিন ইউএসএইডের স্বাস্থ্য, পুষ্টি ও রোহিঙ্গা শরণার্থী সহায়তা কর্মসূচির অন্যতম বড় গ্রহীতা ছিল, ফলে এই ইউএসএইড বিলুপ্তির প্রভাব সরাসরি কক্সবাজারের শরণার্থী শিবির ও গ্রামীণ স্বাস্থ্যসেবার ওপর পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। বিকল্প অর্থায়ন সময়মতো না এলে বাংলাদেশের মতো দেশগুলোকেও নিজস্ব বাজেট থেকে এই ঘাটতি পূরণের চাপ নিতে হতে পারে। দীর্ঘমেয়াদে এই ইউএসএইড বিলুপ্তির প্রভাব বিশ্বজুড়ে জনস্বাস্থ্য কর্মসূচির টেকসই অর্থায়ন কাঠামো নিয়েই নতুন প্রশ্ন তুলে ধরছে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















