হংকংয়ের গণতন্ত্রপন্থী আন্দোলনের পরিচিত মুখ ও বিলুপ্ত গণতান্ত্রিক দলের সাবেক নেতা উ চি-ওয়াইকে যুক্তরাজ্যে পরিবারের সঙ্গে থাকার অনুমতি দেওয়া হয়েছে। শুরুতে লন্ডনের বিমানবন্দরে প্রায় ১০ ঘণ্টা আটকে রাখার পর তাকে দেশে ফেরত পাঠানোর আশঙ্কা তৈরি হয়েছিল। পরে যুক্তরাজ্যের সীমান্ত কর্তৃপক্ষ তাকে ছয় মাস থাকার অনুমতি দেয়।
৬৩ বছর বয়সী উ চি-ওয়াই গত বুধবার লন্ডনের হিথ্রো বিমানবন্দরে পৌঁছানোর পর তাকে দীর্ঘ সময় জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। প্রথমে তাকে প্রবেশের অনুমতি দেওয়া হয়নি। পরে তাকে জানানো হয়েছিল, তিনি মাত্র এক সপ্তাহ যুক্তরাজ্যে থাকতে পারবেন এবং এরপর বিমানবন্দরে গিয়ে ফেরত পাঠানোর প্রক্রিয়ায় অংশ নিতে হবে।
তবে সোমবার পরিস্থিতি বদলে যায়। যুক্তরাজ্যের সীমান্ত কর্তৃপক্ষ তাকে নিয়মিতভাবে ছয় মাস থাকার অনুমতি দেয়।
পাঁচ বছরের বেশি কারাবাসের পর পরিবারের কাছে
উ চি-ওয়াই হংকংয়ের গণতন্ত্রপন্থী আন্দোলনের অন্যতম পরিচিত নেতা। তিনি ‘হংকং ৪৭’ নামে পরিচিত গণতন্ত্রপন্থী নেতাদের দলের সদস্য ছিলেন। জাতীয় নিরাপত্তা আইনের আওতায় হওয়া বহুল আলোচিত মামলায় তাকে রাষ্ট্রবিরোধী কর্মকাণ্ডসহ বিভিন্ন অভিযোগে কারাদণ্ড দেওয়া হয়।
চলতি বছরের জুনে পাঁচ বছরের বেশি সময় কারাগারে থাকার পর তিনি মুক্তি পান। তার স্ত্রী ও ছেলে ২০২২ ও ২০২৩ সালে যুক্তরাজ্যে চলে যান। কারাগারে থাকার সময় পরিবারের সঙ্গে তার যোগাযোগ মূলত মাসে একবার ফোন করা এবং চিঠির মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল।
মুক্তির পর পরিবারের সঙ্গে সরাসরি দেখা করার আশায় তিনি যুক্তরাজ্যে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন।
প্রবেশ নিয়ে আগে থেকেই যোগাযোগ করেছিলেন
উ চি-ওয়াই জানান, যুক্তরাজ্যে যাওয়ার আগে তিনি হংকংয়ে থাকা ব্রিটিশ কনস্যুলেটের কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করেছিলেন। যুক্তরাজ্যে প্রবেশের ক্ষেত্রে কোনো সমস্যা হবে কি না, সে বিষয়ে তিনি জানতে চেয়েছিলেন।
তার দাবি, কর্মকর্তারা তাকে জানিয়েছিলেন যে প্রবেশে বড় কোনো জটিলতা হওয়ার কথা নয়। তার আগের অপরাধের রেকর্ড এবং ভ্রমণের উদ্দেশ্য সম্পর্কে সীমান্ত কর্তৃপক্ষকে প্রয়োজনীয় ব্যাখ্যা দেওয়ার কথাও তাকে জানানো হয়েছিল।
তবে বিমানবন্দরে তাকে বলা হয়, শুধু পরিবারের সঙ্গে দেখা করাই তার ভ্রমণের একমাত্র উদ্দেশ্য—এমনটা বিশ্বাস করার মতো যথেষ্ট কারণ পাওয়া যায়নি।
উ চি-ওয়াই অবশ্য যুক্তরাজ্যে রাজনৈতিক আশ্রয়ের আবেদন করার পরিকল্পনা ছিল—এমন দাবি অস্বীকার করেছেন।
দেশে ফেরত পাঠানোর আশঙ্কা
উ চি-ওয়াইকে যুক্তরাজ্যে থাকার অনুমতি দেওয়ার ঘটনায় স্বস্তি প্রকাশ করেছে হংকংবিষয়ক মানবাধিকার সংগঠন হংকং ওয়াচ। সংগঠনটির নীতিবিষয়ক পরিচালক মেগান খু বলেন, তাকে যুক্তরাজ্যে থাকার সুযোগ দেওয়া সঠিক সিদ্ধান্ত। তার মতে, সিদ্ধান্ত নিতে এত সময় লাগার প্রয়োজন ছিল না।
উ চি-ওয়াইকে আবার হংকংয়ে ফেরত পাঠানোর সম্ভাবনাও উদ্বেগ তৈরি করেছিল। কারাগারে দীর্ঘ সময় কাটানোর পর তাকে আবার সেই শহরে ফেরত পাঠানোর পরিস্থিতি তৈরি হওয়া নিয়ে মানবাধিকারকর্মীরা প্রশ্ন তুলেছিলেন।
বিশেষ পাসপোর্টে যুক্তরাজ্যে প্রবেশ
উ চি-ওয়াই যুক্তরাজ্যে প্রবেশের সময় ব্রিটিশ ন্যাশনাল ওভারসিজ পাসপোর্ট ব্যবহার করেন। ১৯৯৭ সালে হংকং চীনের কাছে হস্তান্তরের আগে সেখানকার স্থায়ী বাসিন্দাদের জন্য এই বিশেষ ভ্রমণ নথি চালু করা হয়েছিল।
এই পাসপোর্টধারীরা সাধারণত ভিসা ছাড়াই যুক্তরাজ্যে ছয় মাস পর্যন্ত থাকতে পারেন। ২০২১ সাল থেকে যুক্তরাজ্য সরকার তাদের জন্য বিশেষ ভিসা কর্মসূচিও চালু করেছে। এই ভিসার আওতায় যোগ্য ব্যক্তিরা যুক্তরাজ্যে বসবাস, কাজ ও পড়াশোনার সুযোগ পান এবং নির্দিষ্ট শর্ত পূরণ করলে ভবিষ্যতে নাগরিকত্ব পাওয়ার পথও তৈরি হয়।
যুক্তরাজ্য সরকারের তথ্য অনুযায়ী, এখন পর্যন্ত দুই লাখ ৩০ হাজারের বেশি হংকংয়ের বাসিন্দা এই বিশেষ ভিসা পেয়েছেন। তাদের মধ্যে প্রায় এক লাখ ৭০ হাজার ইতোমধ্যে যুক্তরাজ্যে চলে গেছেন।
হংকংয়ের রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে বড় পরিবর্তন
হংকংয়ে ব্যাপক গণতন্ত্রপন্থী বিক্ষোভের পর থেকেই অঞ্চলটির রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে বড় পরিবর্তন এসেছে। আন্দোলন দমনের পর চীনের কেন্দ্রীয় সরকারের নিয়ন্ত্রণ আরও দৃঢ় হয়েছে। এর মধ্যে অনেক গণতন্ত্রপন্থী নেতা বিদেশে চলে গেছেন, আবার অনেকে কারাগারে গেছেন।
উ চি-ওয়াইয়ের যুক্তরাজ্যে প্রবেশ নিয়ে তৈরি হওয়া জটিলতাও সেই পরিবর্তিত রাজনৈতিক বাস্তবতার প্রেক্ষাপটে নতুন করে আলোচনায় এসেছে।
যুক্তরাজ্যের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ব্যক্তিগত অভিবাসন মামলার বিষয়ে মন্তব্য না করলেও জানিয়েছে, যুক্তরাজ্য সেখানে বসবাসরত হংকংয়ের জনগোষ্ঠীর প্রতি সমর্থনে অটল রয়েছে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















