চীনের সঙ্গে বৈঠকের আগে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সাম্প্রতিক অবস্থানে আগের তুলনায় কিছুটা নমনীয়তা দেখা যাচ্ছে। বিশ্লেষকদের মতে, এর অন্যতম বড় কারণ চীনের বিরল খনিজের ওপর প্রায় একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণ। প্রযুক্তি, গাড়ি ও প্রতিরক্ষা শিল্পে গুরুত্বপূর্ণ এসব খনিজের সরবরাহে চীনের প্রভাব যুক্তরাষ্ট্রের জন্য বড় ধরনের কৌশলগত ঝুঁকি তৈরি করেছে।
এই সপ্তাহে ওয়াশিংটনে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সঙ্গে বৈঠকে বসবেন ট্রাম্প। বৈঠকের আগে সাধারণত যেভাবে চীনের বিরুদ্ধে বড় শুল্ক, প্রযুক্তি রপ্তানি নিষেধাজ্ঞা কিংবা কঠোর অর্থনৈতিক পদক্ষেপের হুমকি দেওয়া হয়, এবার তেমন আক্রমণাত্মক অবস্থান নিতে দেখা যায়নি ট্রাম্প প্রশাসনকে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এর পেছনে বড় কারণ বিরল খনিজ। বিশ্বজুড়ে এসব খনিজের খনন, পরিশোধন ও চুম্বক তৈরির বড় অংশই চীনের নিয়ন্ত্রণে। পরামর্শক প্রতিষ্ঠান অ্যালিক্সপার্টনার্সের তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বে বিরল খনিজ উত্তোলনের প্রায় ৭০ শতাংশ, পরিশোধন সক্ষমতার ৮৫ শতাংশ এবং বিরল খনিজের ধাতু ও চুম্বক উৎপাদনের প্রায় ৯০ শতাংশ চীনের নিয়ন্ত্রণে।
ইট্রিয়াম ও ডিসপ্রোসিয়ামের মতো বিরল খনিজ আধুনিক শিল্পে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বৈদ্যুতিক ও অন্যান্য গাড়ি, চিপ, উচ্চপ্রযুক্তির সরঞ্জাম এবং প্রতিরক্ষা শিল্পে এসব খনিজের প্রয়োজন হয়। ফলে সরবরাহ ব্যবস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় চীনের নিয়ন্ত্রণ রয়েছে।
গত বছর ট্রাম্পের শুল্কনীতির পাল্টা জবাব হিসেবে চীন বিরল খনিজ রপ্তানিতে নিয়ন্ত্রণ আরোপ করলে বিশ্ববাজারে বড় ধরনের অস্থিরতা তৈরি হয়েছিল। সেই অভিজ্ঞতা যুক্তরাষ্ট্রকে দেখিয়ে দিয়েছে, চীনের ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করলে পাল্টা আঘাত হিসেবে বেইজিং গুরুত্বপূর্ণ কাঁচামালের সরবরাহ সীমিত করতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক বাণিজ্য কর্মকর্তা এবং বর্তমানে সেন্টার ফর আ নিউ আমেরিকান সিকিউরিটির বিশেষজ্ঞ এমিলি কিলক্রিসের মতে, বিরল খনিজ রপ্তানিতে চীনের নিয়ন্ত্রণের অভিজ্ঞতার পর ওয়াশিংটন এখন আগের মতো অতিরিক্ত চাপ প্রয়োগের অবস্থানে নেই। কারণ, কঠোর কোনো পদক্ষেপ নেওয়ার পর শেষ পর্যন্ত তা পিছু হটতে হতে পারে—এমন ঝুঁকি এখন যুক্তরাষ্ট্র ভালোভাবেই বুঝতে পারছে।
ট্রাম্প প্রশাসন অবশ্য সাম্প্রতিক সময়ে চীনের বিরুদ্ধে বেশ কিছু পদক্ষেপ নিয়েছে। জুনে পেন্টাগন আলিবাবা, বিওয়াইডিসহ কয়েকটি চীনা প্রতিষ্ঠানকে চীনের সামরিক বাহিনীকে সহায়তার অভিযোগে অভিযুক্ত করে। জুলাইয়ে মার্কিন অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট হুঁশিয়ারি দেন, কোনো চীনা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা প্রতিষ্ঠান যদি মার্কিন প্রযুক্তি বা মডেল নকল করে, তাহলে তাদের বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হতে পারে।
একই সময়ে মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগে ৪৩টি চীনা প্রতিষ্ঠানের পণ্য আমদানিতে নিষেধাজ্ঞা এবং নতুন ধরনের বিদেশি রোবট ও বিদ্যুৎ রূপান্তর যন্ত্র আমদানিতে বিধিনিষেধ আরোপ করে যুক্তরাষ্ট্র।
তবে এসব পদক্ষেপ আগের মতো বৈঠকের ঠিক আগে বড় ধরনের চাপ তৈরির উদ্দেশ্যে নেওয়া হয়নি বলেই মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। তাদের ধারণা, চীনের পাল্টা কঠোর ব্যবস্থা ঠেকাতে এবং বৈঠকের পরিবেশ নষ্ট না করতে ওয়াশিংটন এবার উত্তেজনা নিয়ন্ত্রিত রাখার চেষ্টা করছে।
সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের প্রশাসনের হোয়াইট হাউসের কর্মকর্তা পিটার হ্যারেল বলেন, যুক্তরাষ্ট্র এখন চীনের চাপ প্রয়োগের সম্ভাবনাকে আগের চেয়ে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে। তার মতে, বিরল খনিজ নিয়ে আগের সংকটের পর ট্রাম্প প্রশাসন গুরুত্বপূর্ণ খনিজের নিরাপদ সরবরাহ নিশ্চিত করতে চাইছে।
শুল্ক ও প্রযুক্তি যুদ্ধের পুরোনো চিত্র
ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদ থেকেই যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যে বাণিজ্য ও প্রযুক্তি নিয়ে দীর্ঘ সংঘাত চলছে। দুই দেশের শীর্ষ নেতাদের বৈঠকের আগে উত্তেজনা বাড়ানো এবং বৈঠকের পর তা কমিয়ে আনার ঘটনাও নতুন নয়।
২০১৯ সালে জাপানের ওসাকায় শি জিনপিংয়ের সঙ্গে বৈঠকের আগে চীনা পণ্যে ৩০ হাজার কোটি ডলারের শুল্ক আরোপের হুমকি দিয়েছিলেন ট্রাম্প। পরে বৈঠকের সময় সেই হুমকি কিছুটা পিছু নেওয়া হয়। চীনও যুক্তরাষ্ট্র থেকে কৃষিপণ্য কেনার বিষয়ে সম্মতি দেয়।
এরপর গত বছরের অক্টোবরে দক্ষিণ কোরিয়ার বুসানে ট্রাম্প-শি বৈঠকেও একই ধরনের সমঝোতা দেখা যায়। ট্রাম্প চীনা পণ্যের ওপর শুল্ক ১০ শতাংশ কমান এবং হাজারো চীনা প্রতিষ্ঠানের ওপর কিছু রপ্তানি নিয়ন্ত্রণ স্থগিত রাখেন। বিনিময়ে শি জিনপিং বিরল খনিজের ওপর নিয়ন্ত্রণ স্থগিত করা এবং যুক্তরাষ্ট্র থেকে সয়াবিন কেনা পুনরায় চালু করার বিষয়ে সম্মত হন। দুই পক্ষই সেই বৈঠককে সফল বলে তুলে ধরে।
তবে চলতি বছরের মে মাসে বেইজিংয়ে শির সঙ্গে বৈঠকের আগে আবারও চীনের বিরুদ্ধে বড় শুল্কের হুমকি দিয়েছিলেন ট্রাম্প। ইরানকে চীন নতুন আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা দিতে পারে—এমন প্রতিবেদনের পর তিনি চীনের ওপর নতুন করে ৫০ শতাংশ শুল্ক আরোপের কথা বলেছিলেন।
এবার অবশ্য পরিস্থিতি কিছুটা ভিন্ন। রিপাবলিকান আইনপ্রণেতাদের একটি অংশ মনে করছে, চীনের সঙ্গে আলোচনায় যুক্তরাষ্ট্র শক্তিশালী অবস্থান থেকেই যাচ্ছে। প্রতিনিধি পরিষদের চীনবিষয়ক বিশেষ কমিটির চেয়ারম্যান জন মুলেনারও ট্রাম্পের সাম্প্রতিক পদক্ষেপকে সেই অর্থে দেখেছেন।
কিন্তু ভূরাজনৈতিক বিশ্লেষক ও ক্রাউডস্ট্রাইকের সহপ্রতিষ্ঠাতা দিমিত্রি আলপেরোভিচ মনে করছেন, যুক্তরাষ্ট্রের জন্য বিকল্প বিরল খনিজের উৎস তৈরি না হওয়া পর্যন্ত ওয়াশিংটন খুব বেশি কঠোর পথে যাবে না।
তার মতে, গত বছরের বুসান বৈঠকের পর যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যে যে অস্বস্তিকর সমঝোতা তৈরি হয়েছে, তা আপাতত বজায় থাকার সম্ভাবনাই বেশি।
সব মিলিয়ে, শি জিনপিংয়ের সঙ্গে ট্রাম্পের আসন্ন বৈঠকের আগে বিরল খনিজের গুরুত্ব নতুন করে সামনে এসেছে। যুক্তরাষ্ট্র প্রযুক্তি ও বাণিজ্যে চীনের ওপর চাপ বাড়াতে চাইলেও গুরুত্বপূর্ণ কাঁচামালের সরবরাহে বেইজিংয়ের প্রভাব ওয়াশিংটনের জন্য বড় সীমাবদ্ধতা তৈরি করেছে। ফলে বৈঠকের আগে ট্রাম্পের তুলনামূলক নরম অবস্থানকে শুধু কূটনৈতিক কৌশল নয়, বরং বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থায় চীনের শক্তির প্রতিফলন হিসেবেও দেখছেন বিশেষজ্ঞরা।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















