ইয়েমেনের মোচা বন্দর একসময় কফির জন্য বিশ্বজুড়ে পরিচিত ছিল। এখন সেটি হয়ে উঠেছে মধ্যপ্রাচ্যের পরিবর্তিত ভূরাজনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতীক। হুথিদের নিয়ন্ত্রণে যাওয়ার মধ্য দিয়ে বাব এল-মান্দেব প্রণালির প্রবেশপথে তাদের প্রভাব আরও বাড়ল। ভারত মহাসাগর ও লোহিত সাগরের মধ্যে চলাচলকারী জাহাজগুলোর জন্য এই পথ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
মোচার পতনকে শুধু ইয়েমেনের দীর্ঘস্থায়ী গৃহযুদ্ধের আরেকটি সামরিক পরিবর্তন হিসেবে দেখলে বিষয়টির গভীরতা বোঝা যাবে না। একই সময়ে ইরাক থেকে চালানো একটি ড্রোন হামলার পর সৌদি আরবকে তার পূর্ব-পশ্চিম তেল পাইপলাইন বন্ধ করতে হয়েছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ইরানের বিরুদ্ধে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের যুদ্ধ, যা লেখকের বিশ্লেষণে ক্রমেই ব্যর্থ ও বিপজ্জনক হয়ে উঠছে। এসব ঘটনা একসঙ্গে একটি কঠিন বাস্তবতা সামনে এনেছে—মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন নিরাপত্তা ব্যবস্থা এখন আগের মতো নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারছে না।
নিরাপত্তার প্রতিশ্রুতি যখন প্রশ্নের মুখে
সৌদি আরবের পূর্ব-পশ্চিম তেল পাইপলাইন নির্মাণের অন্যতম উদ্দেশ্য ছিল হরমুজ প্রণালির ওপর নির্ভরতা কমানো। প্রায় ১ হাজার ২০০ কিলোমিটার দীর্ঘ এই পাইপলাইন দেশটির পূর্বাঞ্চলের তেলক্ষেত্র থেকে অপরিশোধিত তেল লোহিত সাগরের ইয়ানবু বন্দরে পৌঁছে দেয়। ফলে হরমুজ প্রণালি এড়িয়ে তেল রপ্তানির সুযোগ তৈরি হয়।
কিন্তু যে বিকল্প পথকে নিরাপদ মনে করা হয়েছিল, সেটিও এখন ঝুঁকির মুখে। সৌদি আরবের বক্তব্য অনুযায়ী, ইরান-সমর্থিত ইরাকি মিলিশিয়ারা পাইপলাইনের পাম্পিং স্টেশনগুলোতে হামলা চালিয়েছে। অন্যদিকে মোচা দখলের ফলে বাব এল-মান্দেব ঘিরে হুথিদের সামরিক অবস্থান আরও শক্তিশালী হয়েছে। অর্থাৎ আরব উপদ্বীপের তেল ও বাণিজ্যপথের দুই গুরুত্বপূর্ণ দিকেই চাপ তৈরি হয়েছে।
এটি ওয়াশিংটনের দীর্ঘদিনের নিরাপত্তা প্রতিশ্রুতির সঙ্গে বড় ধরনের বৈপরীত্য তৈরি করছে।
দশকের পর দশক ধরে মধ্যপ্রাচ্যের আরব দেশগুলো যুক্তরাষ্ট্রের অস্ত্র কিনেছে, মার্কিন সেনাদের ঘাঁটি ব্যবহারের সুযোগ দিয়েছে এবং ওয়াশিংটনের কৌশলগত অগ্রাধিকারের সঙ্গে নিজেদের নীতি অনেকাংশে সমন্বয় করেছে। বিনিময়ে যুক্তরাষ্ট্র নিজেকে তেল অবকাঠামো, সমুদ্রপথ এবং মিত্র সরকারগুলোর নিরাপত্তার প্রধান রক্ষাকর্তা হিসেবে তুলে ধরেছে।
কিন্তু সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো সেই ব্যবস্থার কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন তুলছে। উপসাগরীয় অঞ্চল, ইরাক ও জর্ডানে মার্কিন ঘাঁটি এবং কূটনৈতিক স্থাপনাগুলোও ইরানি হামলার আওতায় এসেছে। মার্কিন প্রতিরক্ষা দপ্তরের পরিদর্শক জেনারেলের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আটটি দেশে মার্কিন সামরিক ঘাঁটিতে হামলায় শত শত স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত বা ধ্বংস হয়েছে এবং কয়েক ডজন বিমানও ক্ষতির মুখে পড়েছে।
শুধু সামরিক শক্তি দিয়ে নিরাপত্তা নিশ্চিত হয় না
এতে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক শক্তিকে দুর্বল বলে ধরে নেওয়ার সুযোগ নেই। বিশ্বের অন্যতম শক্তিশালী সামরিক সক্ষমতা এখনও ওয়াশিংটনের হাতে রয়েছে। কিন্তু ব্যাপক ধ্বংসাত্মক ক্ষমতা থাকা এবং একটি অঞ্চলকে কার্যকরভাবে নিরাপদ রাখা—দুটি এক বিষয় নয়।
একটি নিরাপত্তা ব্যবস্থার সাফল্য শুধু তার হাতে থাকা অস্ত্রের পরিমাণ দিয়ে বিচার করা যায় না; বরং প্রশ্ন হলো, সেই শক্তি কতটা কার্যকরভাবে ঘাঁটি, মিত্র এবং গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো রক্ষা করতে পারছে।
তুলনামূলকভাবে কম ব্যয়ের ড্রোন ও রকেট যদি উপসাগরীয় অঞ্চলে মার্কিন ঘাঁটি এবং মিত্রদের গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় আঘাত হানতে পারে, তাহলে যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘদিনের আঞ্চলিক নিরাপত্তা কাঠামোর সীমাবদ্ধতা স্পষ্ট হয়।
এর প্রভাব সামরিক ক্ষেত্রেই সীমাবদ্ধ থাকবে না। মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন সামরিক উপস্থিতি দীর্ঘদিন ধরে দেশটির বৃহত্তর অর্থনৈতিক ও আর্থিক প্রভাবেরও একটি গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি ছিল।
ডলারের ওপর আস্থা কি ধীরে ধীরে কমবে?
‘পেট্রোডলার’ শব্দটি প্রায়ই অতিরঞ্জিতভাবে ব্যবহার করা হয়। যুক্তরাষ্ট্র ও বিশ্বের সব তেল উৎপাদনকারী দেশের মধ্যে ডলারকে কেন্দ্র করে কোনো একক, স্থায়ী চুক্তি ছিল না। আবার আন্তর্জাতিক মুদ্রা হিসেবে ডলারের শক্তি কেবল তেল বাণিজ্যের ওপর নির্ভরশীলও নয়। মার্কিন অর্থনীতির আকার, গভীর আর্থিক বাজার এবং ডলারের বিকল্প হিসেবে সমান গ্রহণযোগ্য কোনো মুদ্রার অনুপস্থিতিও এর অবস্থান ধরে রাখার বড় কারণ।
তবে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সমঝোতাটি বাস্তব ছিল। আন্তর্জাতিক তেল বাণিজ্যের বড় অংশ ডলারে সম্পন্ন হয়েছে। উপসাগরীয় দেশগুলোও তাদের বিপুল বৈদেশিক আয় ডলারভিত্তিক সম্পদে, বিশেষ করে মার্কিন সরকারি বন্ডে বিনিয়োগ করেছে। এর পাশাপাশি ওয়াশিংটন তাদের সরকার ও গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যপথের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার ভূমিকা পালন করেছে।
এখন প্রশ্ন হচ্ছে, সেই নিরাপত্তা ব্যবস্থা যদি আগের মতো নির্ভরযোগ্য না থাকে, তাহলে অর্থনৈতিক ব্যবস্থায় তার প্রভাব কতটা পড়বে?
তাৎক্ষণিকভাবে উপসাগরীয় দেশগুলো ডলার ছেড়ে দেবে—এমন সম্ভাবনা নেই। তাদের বিপুল ডলার সম্পদ রয়েছে। আন্তর্জাতিক লেনদেনে ডলারের তারল্য, সহজে রূপান্তরযোগ্যতা এবং বিস্তৃত আর্থিক অবকাঠামোরও কোনো সহজ বিকল্প নেই।
কিন্তু বৈশ্বিক মুদ্রা ব্যবস্থায় পরিবর্তন সাধারণত একদিনে ঘটে না। সরকারগুলো ধীরে ধীরে নিজেদের মুদ্রায় বাণিজ্য বাড়াতে পারে, কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো বেশি স্বর্ণ কিনতে পারে, নতুন অর্থপ্রদানের ব্যবস্থা তৈরি হতে পারে এবং বৈদেশিক মুদ্রার মজুত বিভিন্ন সম্পদে ছড়িয়ে দেওয়া হতে পারে। প্রতিটি পদক্ষেপ আলাদাভাবে ছোট মনে হলেও দীর্ঘমেয়াদে এগুলো পুরোনো ব্যবস্থার ওপর নির্ভরতা কমিয়ে দিতে পারে।
ব্রিকসের গুরুত্ব এখানেই
ব্রিকসকে ঘিরে সবচেয়ে বেশি আলোচনা হয় একটি অভিন্ন মুদ্রা তৈরির সম্ভাবনা নিয়ে। কিন্তু প্রকৃত পরিবর্তনটি হয়তো সেখানে নয়। সদস্য দেশগুলোর রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক স্বার্থে বড় ধরনের পার্থক্য রয়েছে। তাদের মধ্যে ভূরাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতাও আছে।
অভিন্ন মুদ্রা ছাড়াই ডলারের ওপর নির্ভরতা কমানো সম্ভব। নিজেদের মুদ্রায় বাণিজ্য, বিকল্প ঋণব্যবস্থা এবং পশ্চিমা নিয়ন্ত্রণের বাইরে অর্থপ্রদানের নতুন পথ গড়ে উঠলে আন্তর্জাতিক আর্থিক ব্যবস্থা আরও বহুমুখী হতে পারে।
এর অর্থ ডলারের আধিপত্য দ্রুত শেষ হয়ে যাবে না। বরং ডলার সবচেয়ে বড় মুদ্রা হিসেবেই থাকতে পারে, কিন্তু আগের মতো অপরিহার্য নাও থাকতে পারে।
এশিয়াতেও পড়ছে চাপ
মধ্যপ্রাচ্যের সামরিক সংকটের প্রভাব এশিয়ার নিরাপত্তা হিসাবেও পড়তে পারে। যুক্তরাষ্ট্রের কাছে সীমাহীন আকাশ প্রতিরক্ষা ক্ষেপণাস্ত্র বা প্রতিরোধ ব্যবস্থা নেই। একই সময়ে বিশ্বের সব ঝুঁকিপূর্ণ অঞ্চলে উন্নত সামরিক সরঞ্জাম মোতায়েন করাও সম্ভব নয়।
যদি উত্তর-পূর্ব এশিয়া থেকে প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ও ক্ষেপণাস্ত্রের মজুত মধ্যপ্রাচ্যে সরিয়ে নিতে হয়, তাহলে দক্ষিণ কোরিয়ার নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হতে পারে। একইভাবে জাপানকে ভাবতে হবে, একাধিক সংকট একসঙ্গে তৈরি হলে ওয়াশিংটন কীভাবে তার সামরিক সম্পদ ভাগ করবে।
তাইওয়ানের ক্ষেত্রেও প্রশ্নটি আরও জটিল। মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের বড় ধরনের সামরিক ব্যস্ততা চলার সময় পূর্ব এশিয়ায় নতুন সংঘাত তৈরি হলে সেখানে কতটা মার্কিন সামরিক সরঞ্জাম ও রাজনৈতিক মনোযোগ অবশিষ্ট থাকবে—এটি মিত্রদের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত প্রশ্ন।
এর অর্থ অবশ্যই এ নয় যে যুক্তরাষ্ট্র এশিয়া থেকে সরে যাচ্ছে। দেশটির সামরিক ঘাঁটি, মিত্রতা ও নৌ সক্ষমতা এখনও শক্তিশালী। কিন্তু মিত্র দেশগুলোকে এখন বুঝতে হচ্ছে, মার্কিন নিরাপত্তা প্রতিশ্রুতির বাস্তব সীমা রয়েছে। অস্ত্র উৎপাদনের সক্ষমতা, গোলাবারুদের মজুত এবং বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে একই সময়ে সংকট মোকাবিলার রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত—সবকিছুই সেই সীমা নির্ধারণ করে।
ইন্দোনেশিয়ার জন্য শিক্ষা
ইন্দোনেশিয়ার উচিত নয় যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাব কমার সম্ভাবনাকে উদযাপন করা, আবার বাস্তব পরিবর্তন অস্বীকার করাও ঠিক হবে না। যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাব কমে গেলেই যে বিশ্বব্যবস্থা ন্যায্য বা নিরাপদ হয়ে উঠবে, তার নিশ্চয়তা নেই।
বহুমেরুকেন্দ্রিক বিশ্ব মাঝারি শক্তির দেশগুলোকে আরও স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগ দিতে পারে। একই সঙ্গে এটি প্রতিদ্বন্দ্বী নিষেধাজ্ঞা, অস্থিতিশীল জ্বালানি মূল্য এবং এমন সংঘাতও তৈরি করতে পারে যেখানে কোনো একক শক্তির পক্ষে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হবে।
জ্বালানি আমদানিনির্ভর এবং সমুদ্রপথের ওপর নির্ভরশীল দ্বীপপুঞ্জের দেশ হিসেবে ইন্দোনেশিয়ার জন্য হরমুজ ও বাব এল-মান্দেব অঞ্চলের দীর্ঘস্থায়ী অস্থিরতা বিশেষ ঝুঁকিপূর্ণ।
জাকার্তার জন্য তাই কৌশলগত স্বাধীনতা আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। অর্থনৈতিকভাবে যৌক্তিক ক্ষেত্রে স্থানীয় মুদ্রায় বাণিজ্য বাড়ানো, পর্যাপ্ত জ্বালানি মজুত রাখা এবং সামুদ্রিক সহযোগিতায় আসিয়ানকে আরও কার্যকর করা হতে পারে এর অংশ।
ব্রিকসেও ইন্দোনেশিয়ার অংশগ্রহণের সুযোগ রয়েছে। তবে সেটিকে যেন আরেকটি কঠোর ভূরাজনৈতিক জোটের আনুগত্যে পরিণত হতে না দেওয়া হয়, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ।
সবচেয়ে বড় কথা, ওয়াশিংটনের ওপর নির্ভরতা কমাতে গিয়ে বেইজিং, মস্কো বা অন্য কোনো রাজধানীর ওপর নতুন নির্ভরতা তৈরি করা ইন্দোনেশিয়ার স্বার্থের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হবে না। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি চীন, উপসাগরীয় দেশগুলো, ভারত, জাপান ও ইউরোপের সঙ্গেও সম্পর্ক বজায় রাখা প্রয়োজন।
লক্ষ্য হওয়া উচিত কোনো একটি শক্তির ছায়ায় দাঁড়ানো নয়; বরং একাধিক শক্তির মধ্যে নিজের কৌশলগত পরিসর ধরে রাখা।
মোচার পতন কিংবা সৌদি তেল পাইপলাইনে হামলা ডলারের অবিলম্বে পতনের ঘোষণা নয়। এগুলো মার্কিন শক্তির সমাপ্তিরও প্রমাণ নয়। ইতিহাস সাধারণত এত সরল পথে এগোয় না।
তবে ঘটনাগুলো একটি পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাব ধরে রাখার সামরিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ভিত্তিগুলো আগের মতো সমন্বিতভাবে কাজ করছে না। সামরিক সুরক্ষার বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে, মিত্ররা বিকল্প পথ খুঁজছে এবং বিকল্প আর্থিক ব্যবস্থাও ধীরে ধীরে বিস্তৃত হচ্ছে।
আমেরিকার নিরাপত্তার ঢালে যে ফাটল দেখা দিয়েছে, তার প্রভাব হয়তো এখনই পুরোপুরি দৃশ্যমান নয়। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সেই ফাটলের চাপ বৈশ্বিক মুদ্রা ও অর্থনৈতিক ব্যবস্থার ওপরও পড়তে পারে।
মাইকেল জি. ভ্যান 


















