প্রয়াত ব্রিটিশ রাজবধূ প্রিন্সেস ডায়ানার ছেলে প্রিন্স হ্যারি ও তার স্ত্রী মেগান মার্কেলকে সরকারি নিরাপত্তা দেওয়ার পক্ষে মত দিয়েছেন ডায়ানার ভাই চার্লস স্পেন্সার। তার আশঙ্কা, সংবাদমাধ্যমে হ্যারি ও মেগানকে যেভাবে অনুসরণ ও উপস্থাপন করা হচ্ছে, তা ডায়ানার মৃত্যুর আগের সময়ের সঙ্গে অনেকটাই মিলে যাচ্ছে।
বিবিসিকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে স্পেন্সার বলেন, নিজের বোনকে এমন পরিস্থিতিতে হারানোর পর নিরাপত্তার বিষয়টি তিনি অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়ে দেখেন। তার মতে, হ্যারি ব্রিটিশ সিংহাসনের উত্তরাধিকারক্রমে পঞ্চম এবং সাবেক সেনাসদস্য—এই দুই কারণেও তার নিরাপত্তা নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
ডায়ানা ১৯৯৭ সালে মাত্র ৩৬ বছর বয়সে প্যারিসে এক গাড়ি দুর্ঘটনায় নিহত হন। দুর্ঘটনার সময় আলোকচিত্রীরা মোটরসাইকেলে করে গাড়িটিকে অনুসরণ করছিলেন। তার মৃত্যুর পর বিশ্বজুড়ে ব্যাপক শোকের সৃষ্টি হয়। একই সঙ্গে প্রশ্ন ওঠে, ডায়ানার ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে সংবাদমাধ্যমের দীর্ঘদিনের অতিরিক্ত আগ্রহ ও তাকে অনুসরণের সংস্কৃতি তার মৃত্যুর পেছনে কোনো ভূমিকা রেখেছিল কি না।
স্পেন্সার বলেন, হ্যারি ও মেগানকে নিয়ে ট্যাবলয়েড সংবাদমাধ্যমের আচরণ কখনো কখনো ‘খুব, খুবই অপ্রীতিকর’ হয়ে উঠতে পারে। ডায়ানার সঙ্গে যা ঘটেছিল, সেখান থেকে শিক্ষা নেওয়া সবার দায়িত্ব বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
ডায়ানার মৃত্যুর পর চার্লসকে ঘিরে বিস্ফোরক দাবি
ডায়ানার ৩০তম মৃত্যুবার্ষিকী সামনে রেখে স্পেন্সারের লেখা স্মৃতিকথা Swan Song: Diana, My Sister ইতোমধ্যে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে। বইটিতে ডায়ানার সাবেক স্বামী, বর্তমান রাজা চার্লসকে নিয়ে বেশ কিছু বিস্ফোরক দাবি করেছেন তিনি।
স্পেন্সারের দাবি, ডায়ানার মৃত্যুর কয়েক ঘণ্টা পর তৎকালীন প্রিন্স অব ওয়েলসকে তিনি এমনভাবে কথা বলতে শুনেছিলেন, যেন তিনি অস্বাভাবিকভাবে উচ্ছ্বসিত। এমনকি স্পেন্সারের ভাষ্য অনুযায়ী, চার্লস তাকে বলেছিলেন, বিশ্ব খুব দ্রুতই ডায়ানাকে ভুলে যাবে।
তবে বাকিংহাম প্যালেস এই দাবির জবাব দিয়েছে। প্রাসাদের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, ভাইবোন হারানোর গভীর শোক অনেক সময় মানুষের যুক্তিবোধ, বিচারক্ষমতা ও স্মৃতিকে এমনভাবে প্রভাবিত করতে পারে, যা বহু বছর পর অন্যরা বুঝতে পারে না।
বিবিসি স্পেন্সারকে প্রশ্ন করে, তিনি কীভাবে ওই কথোপকথনের সত্যতা প্রমাণ করবেন। জবাবে তিনি জানান, ডায়ানার শেষকৃত্যে দেওয়া তার বহুল আলোচিত শোকভাষণে তিনি একটি বিশেষ বাক্য যুক্ত করেছিলেন—যাতে বোঝানো হয়, ডায়ানা মানুষের স্মৃতি থেকে কখনো মুছে যাবেন না।
ডায়ানাকে ঘিরে স্মৃতিকথা, পুরোনো ক্ষতও সামনে
স্পেন্সার জানিয়েছেন, ডায়ানার মৃত্যুর ৩০ বছর পূর্তিকে সামনে রেখে তিনি বইটি লিখেছেন মূলত তার বোনের জীবনকে স্মরণ ও উদযাপন করার জন্য। শৈশবের স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে তিনি বলেন, তাদের ভাই-বোনের জীবন কখনো একঘেয়ে ছিল না।
ডায়ানার সঙ্গে নিজের মিলের কথাও তুলে ধরেছেন স্পেন্সার। তিনি জানান, তাদের দুজনেরই এডিএইচডি ছিল বলে তিনি মনে করেন। তবে ডায়ানার ক্ষেত্রে কখনো আনুষ্ঠানিকভাবে এই রোগ নির্ণয় করা হয়নি।
এদিকে স্পেন্সারের বই প্রকাশ এবং হ্যারি-মেগানের ব্রিটেনে ফিরে আসা—দুই ঘটনাই ব্রিটিশ রাজপরিবারের জন্য নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। হ্যারি ও মেগান প্রায় ছয় বছর যুক্তরাষ্ট্রে থাকার পর আবার ব্রিটেনে বসবাস শুরু করেছেন বলে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।
বর্তমানে রাজা চার্লস ক্যানসারের চিকিৎসার মধ্যেও দায়িত্ব পালন করছেন। এমন সময়ে ডায়ানাকে ঘিরে পুরোনো অভিযোগ, হ্যারি-মেগানের নিরাপত্তা এবং স্পেন্সারের নতুন বই রাজপরিবারের ওপর নতুন চাপ তৈরি করতে পারে।
হ্যারির নিরাপত্তা নিয়ে দীর্ঘ আইনি লড়াই
রাজকীয় দায়িত্ব ছেড়ে যুক্তরাষ্ট্রে চলে যাওয়ার পর হ্যারি ও তার পরিবারের স্বয়ংক্রিয় পুলিশি নিরাপত্তা প্রত্যাহার করা হয়। এরপর ব্রিটেনে এলে নিরাপত্তার খরচ ও ব্যবস্থা নিয়ে হ্যারির সঙ্গে সরকারের দীর্ঘ আইনি বিরোধ তৈরি হয়।
হ্যারি একাধিকবার বলেছেন, ব্রিটেনে ফেরার সময় তার স্ত্রী ও সন্তানদের নিরাপত্তা নিয়ে তিনি উদ্বিগ্ন। নিরাপত্তা সংক্রান্ত সেই আইনি লড়াই এখনো পুরোপুরি শেষ হয়নি এবং বিষয়টি পর্যালোচনার পর্যায়ে রয়েছে।
স্পেন্সার সম্প্রতি হ্যারি ও মেগানকে আতিথ্য দিয়েছেন। একই সময়ে তিনি তার বইয়ের বিভিন্ন অংশ ধারাবাহিকভাবে প্রকাশ করেছেন। এর কয়েক মাস আগে হ্যারি একটি ট্যাবলয়েড পত্রিকার বিরুদ্ধে গোপনীয়তা-সংক্রান্ত মামলায় বড় ধরনের আইনি ও আর্থিক ধাক্কাও খেয়েছেন।
স্পেন্সারের দাবি, রাজা চার্লসকে নিয়ে তার বইয়ে যে কথাগুলো রয়েছে, সেগুলো হ্যারি কিংবা তার বড় ভাই ও সিংহাসনের উত্তরাধিকারী প্রিন্স উইলিয়ামের কাছে অজানা নয়। তবে রাজপরিবারের ভেতরের আরও অনেক তথ্য জানা থাকলেও তিনি সেগুলো বইয়ে প্রকাশ না করার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।
ডায়ানার মৃত্যুর পর তার পরিবারের পক্ষ থেকে রাজপরিবারের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠেছিল—জীবনের শেষ সময়ে তাকে যথেষ্ট সমর্থন ও যত্ন দেওয়া হয়নি। বহু বছর পর হ্যারি ও মেগানও রাজপরিবারের বিরুদ্ধে একই ধরনের অভিযোগ তুলেছিলেন। ফলে ডায়ানার নিরাপত্তা, তার মৃত্যুর স্মৃতি এবং হ্যারি-মেগানের বর্তমান পরিস্থিতি—তিনটি বিষয়ই আবার একই আলোচনায় ফিরে এসেছে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 

















