মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ওয়াশিংটনের কাছে নির্মাণের পরিকল্পনা করা বিশাল ‘বিজয় তোরণ’কে শুধু স্মারক স্থাপনা হিসেবে নয়, একটি সামরিক স্থাপনা হিসেবেও ব্যবহার করতে চান। তাঁর পরিকল্পনা অনুযায়ী, প্রায় ২৫০ ফুট বা ৭৬ মিটার উঁচু এই তোরণে ড্রোন রাখা ও দ্রুত ব্যবহারের ব্যবস্থা থাকবে। পাশাপাশি ভবনের ছাদ ও চত্বর এলাকায় স্নাইপার মোতায়েনের সুযোগ এবং বিপুল পরিমাণ স্নাইপার গোলাবারুদ সংরক্ষণের ব্যবস্থাও রাখা হবে।
রোববার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক পোস্টে ট্রাম্প বলেন, সামরিক বাহিনীর ‘জোরালো অনুরোধে’ তিনি তোরণটিকে একটি ‘উচ্চমানের সামরিক কমপ্লেক্স/বিজয় তোরণ’-এ পরিণত করার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। তবে এই স্থাপনায় সামরিক সক্ষমতা যুক্ত করার প্রয়োজন কেন, সে বিষয়ে তিনি কোনো নির্দিষ্ট হুমকি বা নিরাপত্তাঝুঁকির কথা উল্লেখ করেননি।
ট্রাম্পের পরিকল্পিত তোরণটি প্যারিসের বিখ্যাত আর্ক দ্য ত্রিয়ম্ফের আদলে নির্মাণের কথা রয়েছে। এটি ওয়াশিংটনের পোটোম্যাক নদীর ওপারে ভার্জিনিয়ার আর্লিংটন এলাকায়, আর্লিংটন ন্যাশনাল সেমেট্রির কাছাকাছি নির্মাণের পরিকল্পনা করা হয়েছে।
জাতীয় নিরাপত্তার যুক্তিতে নতুন নির্মাণ
তোরণকে সামরিক স্থাপনায় রূপ দেওয়ার পরিকল্পনাটি ট্রাম্পের আরেকটি বড় নির্মাণ প্রকল্পের সঙ্গে মিল রয়েছে। হোয়াইট হাউসের সাবেক ইস্ট উইংয়ের জায়গায় প্রায় ৪০ কোটি ডলার ব্যয়ে যে বিশাল বলরুম নির্মাণ করা হচ্ছে, সেটিকেও ট্রাম্প প্রশাসন জাতীয় নিরাপত্তার প্রয়োজনীয়তার সঙ্গে যুক্ত করে ব্যাখ্যা করেছে।
বলরুম প্রকল্পে ড্রোন সুবিধা, বোমা আশ্রয়কেন্দ্র এবং ওয়াশিংটনকে সুরক্ষিত রাখতে অন্যান্য সামরিক অবকাঠামো রাখার পরিকল্পনার কথা বলা হয়েছে।
ওয়াশিংটনের চেহারা বদলে দেওয়ার ট্রাম্পের বৃহত্তর পরিকল্পনার অংশ হিসেবেই তোরণ ও বলরুম প্রকল্পকে দেখা হচ্ছে। এর পাশাপাশি লিংকন মেমোরিয়ালের রিফ্লেক্টিং পুল সংস্কার, ইস্ট পোটোম্যাক পার্কে গলফ কোর্স পুনর্গঠন এবং জন এফ. কেনেডি সেন্টার ফর দ্য পারফর্মিং আর্টসে তাঁর নাম যুক্ত করার উদ্যোগও রয়েছে।
তবে ঐতিহাসিক স্থাপনা ও রাজধানীর নকশা নিয়ে কাজ করা সংরক্ষণবাদী এবং অন্য সমালোচকেরা এসব উদ্যোগের বিরোধিতা করছেন। তাঁদের আশঙ্কা, এর ফলে ওয়াশিংটনের গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক স্থাপনাগুলোর পরিচিত দৃশ্যপট ও ঐতিহ্য বদলে যেতে পারে।
সামরিক যুক্তি নিয়ে প্রশ্ন
তোরণটিতে সামরিক সক্ষমতা যুক্ত করার সিদ্ধান্ত নিয়ে বিশেষজ্ঞদের মধ্যেও প্রশ্ন উঠেছে।
অবসরপ্রাপ্ত মার্কিন মেরিন কর্নেল মার্ক ক্যানসিয়ান বলেন, হোয়াইট হাউসের নিরাপত্তা জোরদার করার ক্ষেত্রে জাতীয় নিরাপত্তার যুক্তি তুলনামূলকভাবে শক্তিশালী। বিশেষ করে ভূগর্ভস্থ বাঙ্কার সুবিধা বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তা বোঝা যায়। কিন্তু একটি স্মারক তোরণকে সামরিক স্থাপনায় পরিণত করার প্রয়োজনীয়তা এতটা স্পষ্ট নয়।
ওয়াশিংটনভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজের এই জ্যেষ্ঠ নিরাপত্তা উপদেষ্টার মতে, তোরণটির সামরিকীকরণের সিদ্ধান্তটি প্রকল্পটির বিরুদ্ধে তৈরি হওয়া বিরোধিতা মোকাবিলার একটি উপায় হতে পারে।
তোরণটি যে এলাকায় নির্মাণের পরিকল্পনা করা হয়েছে, সেখান থেকে জয়েন্ট বেস মেয়ার-হেন্ডারসন হল মাত্র প্রায় এক মাইল দূরে। এটি একটি সক্রিয় মার্কিন সেনা স্থাপনা। পেন্টাগনও রয়েছে প্রায় দুই মাইল দূরে।
ক্যানসিয়ানের প্রশ্ন, এত কাছেই যখন বিভিন্ন সামরিক সক্ষমতাসম্পন্ন একটি প্রতিষ্ঠিত সামরিক ঘাঁটি রয়েছে, তখন নতুন করে তোরণের ভেতরে একই ধরনের ব্যবস্থা কেন প্রয়োজন—তা স্পষ্ট নয়।
তিনি আরও বলেন, সেখানে গোলাবারুদ সংরক্ষণ করলে তা সরবরাহ ও পরিচালনার ক্ষেত্রে বাড়তি জটিলতা তৈরি করতে পারে। একইভাবে ওই স্থানে স্নাইপার মোতায়েনের বাস্তব প্রয়োজনীয়তাও প্রশ্নবিদ্ধ।
আইনি লড়াইও চলছে
তোরণ নির্মাণ নিয়ে এরই মধ্যে আইনি বিরোধ তৈরি হয়েছে। চলতি মাসের শুরুতে মার্কিন জেলা বিচারক তানিয়া চুটকিন ট্রাম্প প্রশাসনকে নির্দেশ দেন, ওই এলাকায় যেকোনো ধরনের কাজ শুরুর অন্তত ৪৮ ঘণ্টা আগে নোটিশ দিতে হবে।
এর একদিন আগে মার্কিন স্বরাষ্ট্র বিভাগ জানিয়েছিল, আইনি চ্যালেঞ্জ এবং সরকারি পরিকল্পনা কর্তৃপক্ষের চূড়ান্ত অনুমোদন না থাকার পরও তোরণ নির্মাণের কাজ এগিয়ে নেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।
তোরণটির অবস্থান নিয়েও নিরাপত্তা উদ্বেগ রয়েছে। এটি রোনাল্ড রিগ্যান ওয়াশিংটন ন্যাশনাল বিমানবন্দরের কাছাকাছি হওয়ায় বিমান চলাচল বিশেষজ্ঞরা সম্ভাব্য ঝুঁকি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন।
অন্যদিকে কয়েকজন সাবেক সেনাসদস্য তোরণ নির্মাণ বন্ধের দাবিতে মামলা করেছেন। তাঁদের অভিযোগ, এই স্থাপনা নির্মাণ হলে লিংকন মেমোরিয়াল থেকে আর্লিংটন ন্যাশনাল সেমেট্রি পর্যন্ত দীর্ঘদিন ধরে পরিকল্পিত ঐতিহাসিক দৃশ্যপথ নষ্ট হবে।
তবে মার্কিন ফেডারেল এভিয়েশন অ্যাডমিনিস্ট্রেশন গত সপ্তাহে জানিয়েছে, তোরণটির কারণে বিমান চলাচলে ঝুঁকি তৈরি হবে না—যদি স্থাপনাটির শীর্ষে একটি ‘চিরন্তন শিখা’ রাখা হয়।
বিমানবন্দরের কাছে ড্রোন নিয়েও আপত্তি
ভার্জিনিয়ার যে আসনে আর্লিংটন ন্যাশনাল সেমেট্রি অবস্থিত, সেই এলাকার ডেমোক্র্যাট কংগ্রেস সদস্য ডন বেয়ারও ট্রাম্পের নতুন পরিকল্পনার সমালোচনা করেছেন।
রোববার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক পোস্টে তিনি বলেন, বিমানবন্দরের এত কাছে বিপুলসংখ্যক ড্রোন পরিচালনা করা বিপজ্জনক এবং বাস্তবসম্মত নয়।
বেয়ারের ধারণা, তোরণকে সামরিক স্থাপনা হিসেবে দেখানোর এই উদ্যোগের পেছনে আইনি কারণও থাকতে পারে। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, ট্রাম্প প্রশাসন হয়তো আশঙ্কা করছে যে আদালতে প্রকল্পটি নিয়ে তাদের অবস্থান দুর্বল হতে পারে। তাই জাতীয় নিরাপত্তার সঙ্গে তোরণটির সম্পর্ক দেখিয়ে নির্মাণের পক্ষে নতুন যুক্তি তৈরি করা হচ্ছে।
তোরণটি নির্মাণের পক্ষে ট্রাম্প প্রশাসন কী ধরনের নির্দিষ্ট নিরাপত্তা প্রয়োজনীয়তা দেখাবে, তা এখনো পরিষ্কার নয়। তবে একটি ঐতিহাসিক স্মারককে একই সঙ্গে ড্রোন, স্নাইপার ও গোলাবারুদ সংরক্ষণের সামরিক কমপ্লেক্সে পরিণত করার পরিকল্পনা ওয়াশিংটনে নতুন করে রাজনৈতিক, আইনি ও নিরাপত্তা বিতর্ক তৈরি করেছে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















