জ্বালানি তেলের দাম প্রতি লিটারে ২০ টাকা বাড়ায় নতুন করে চাপের মুখে পড়েছেন মোটরসাইকেলচালক, রাইড শেয়ারিংয়ের চালক এবং নিয়মিত মোটরসাইকেল ব্যবহারকারীরা। একই দূরত্বে চলাচল করতে এখন আগের তুলনায় বেশি অর্থ খরচ করতে হবে। ফলে যাদের দৈনন্দিন আয় মোটরসাইকেল চালানোর সঙ্গে সরাসরি যুক্ত, তাদের ওপর চাপ সবচেয়ে বেশি পড়ছে।
রোববার রাতে জারি করা সরকারি প্রজ্ঞাপনে ডিজেল, কেরোসিন, পেট্রোল ও অকটেনের দাম বাড়ানোর ঘোষণা দেওয়া হয়। নতুন দাম সোমবার (২১ সেপ্টেম্বর) থেকে কার্যকর হয়েছে।
নতুন সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, ডিজেলের দাম প্রতি লিটার ১১৫ টাকা থেকে বেড়ে ১৩৫ টাকা হয়েছে। কেরোসিনের দাম ১৩৫ টাকা থেকে বেড়ে হয়েছে ১৫৫ টাকা। পেট্রোলের দাম ১৪০ টাকা থেকে বেড়ে ১৬০ টাকা এবং অকটেনের দাম ১৪৫ টাকা থেকে বেড়ে ১৬৫ টাকা হয়েছে।
অর্থাৎ, চার ধরনের জ্বালানির দামই প্রতি লিটারে ২০ টাকা করে বেড়েছে।
রাইড শেয়ারিং চালকদের আয় নিয়ে নতুন দুশ্চিন্তা
রাইড শেয়ারিংয়ে মোটরসাইকেল চালিয়ে জীবিকা নির্বাহ করেন এমন অনেক চালকের জন্য জ্বালানির দাম বাড়ার বিষয়টি বড় উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাদের অনেকেই বলছেন, জ্বালানি, খাবার ও অন্যান্য খরচ বাদ দেওয়ার পর যে অর্থ হাতে থাকে, তা দিয়েই পরিবার চালানো কঠিন। এর মধ্যে জ্বালানির দাম বাড়ায় সেই চাপ আরও বেড়েছে।
চট্টগ্রাম নগরের রাইড শেয়ারিং চালকদের হিসাবে, একটি মোটরসাইকেল সাধারণত এক লিটার জ্বালানিতে প্রায় ৩৫ থেকে ৪০ কিলোমিটার চলতে পারে। এই দূরত্বে গড়ে পাঁচ থেকে ছয়টি ট্রিপ দেওয়া সম্ভব হয়। ফলে প্রতিদিনের আয়ের একটি উল্লেখযোগ্য অংশই চলে যায় জ্বালানি কিনতে।
এখন একই দূরত্ব এবং একই সংখ্যক ট্রিপ দিতে আগের চেয়ে বেশি অর্থ খরচ হবে। এতে চালকদের প্রকৃত আয় আরও কমে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
চট্টগ্রাম নগরের রাইড শেয়ারিং মোটরসাইকেল চালক জসিম উদ্দিন বলেন, ভোরে মোটরসাইকেল নিয়ে রাস্তায় বের হন তিনি। সারাদিন চালিয়ে যে আয় হয়, তা দিয়ে পাঁচ সদস্যের পরিবারের খাবার ও পোশাকের খরচ মেটাতেই কষ্ট হয়। এখন জ্বালানির দাম বাড়ায় সংসার কীভাবে চালাবেন, তা নিয়ে তিনি চিন্তিত।
ভাড়া বাড়ালে যাত্রী হারানোর ভয়
জ্বালানির দাম বাড়ার পর চালকদের সামনে আরেকটি সমস্যা তৈরি হয়েছে। অতিরিক্ত জ্বালানি খরচ সামাল দিতে তাদের ভাড়া বাড়ানোর প্রয়োজন হলেও ভাড়া বাড়ালে যাত্রী কমে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
রাইড শেয়ারিং চালক প্রমিত দাস বলেন, আগের ভাড়ায় যাত্রা করলে জ্বালানির খরচ মেটানো কঠিন হয়ে পড়ছে। তাই যাত্রীদের কাছ থেকে কিছুটা বেশি ভাড়া চাইতে হচ্ছে। কিন্তু বাড়তি ভাড়া শুনলেই অনেক যাত্রী আর যেতে চান না।
আরেক চালক সোমেন দাস বলেন, জ্বালানির দাম বাড়ার পর তিনি চট্টগ্রামের বহদ্দারহাট থেকে সিটি কলেজগামী এক যাত্রীর কাছে আগের ১২০ টাকার পরিবর্তে ১৩০ টাকা ভাড়া চেয়েছিলেন। কিন্তু ওই যাত্রী আর মোটরসাইকেলে যাননি।
তার ভাষায়, জ্বালানির দাম বেড়েছে, কিন্তু ভাড়া বাড়িয়ে চাইলে যাত্রী পাওয়া যাচ্ছে না। ফলে একদিকে বাড়ছে খরচ, অন্যদিকে কমছে যাত্রী পাওয়ার সুযোগ।
চালকদের আশঙ্কা, জ্বালানির বাড়তি খরচ যদি ভাড়ার সঙ্গে সমন্বয় করা না যায়, তাহলে তাদের প্রকৃত আয় আরও কমে যাবে। আবার ভাড়া বাড়ালে যাত্রীদের একটি অংশ রাইড শেয়ারিং এড়িয়ে যেতে পারেন। ফলে দুই দিক থেকেই চালকদের আয়ের ওপর চাপ তৈরি হচ্ছে।
ব্যক্তিগত মোটরসাইকেল ব্যবহারকারীদেরও বাড়তি খরচ
জ্বালানির দাম বাড়ার প্রভাব শুধু রাইড শেয়ারিং চালকদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। ব্যক্তিগত কাজে নিয়মিত মোটরসাইকেল ব্যবহার করেন এমন মানুষদেরও এখন প্রতি মাসে অতিরিক্ত অর্থ গুনতে হবে।
অফিস বা ব্যবসার কাজে যাতায়াত, সন্তানদের স্কুল-কলেজে আনা-নেওয়া কিংবা প্রতিদিনের বিভিন্ন প্রয়োজনীয় কাজে মোটরসাইকেলের ওপর নির্ভরশীল মানুষের মাসিক পরিবহন ব্যয়ও বাড়বে।
মোটরসাইকেল ব্যবহারকারী জাহাঙ্গীর আলম বলেন, সন্তানদের প্রতিদিন স্কুলে আনা-নেওয়া এবং প্রয়োজনীয় বিভিন্ন কাজে তাকে মোটরসাইকেল ব্যবহার করতে হয়। যেভাবে জ্বালানির দাম বাড়ছে, তাতে মাসিক বাজেটের ওপর বড় ধরনের চাপ পড়বে।
আরেক ব্যবহারকারী সামসুল হক বলেন, জ্বালানির দাম এভাবে বাড়তে থাকলে মাসের খরচ সামলানো কঠিন হবে। এর সঙ্গে গ্যাসসহ অন্যান্য নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের খরচও রয়েছে। সব মিলিয়ে পরিবারের মাসিক বাজেট আরও চাপে পড়বে।
বৈদ্যুতিক মোটরসাইকেলের দিকে ঝুঁকছেন কেউ কেউ
জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধির কারণে কিছু মোটরসাইকেল ব্যবহারকারী বিকল্প হিসেবে বৈদ্যুতিক মোটরসাইকেলের কথা ভাবছেন। তাদের কেউ কেউ মনে করছেন, দীর্ঘমেয়াদে জ্বালানিনির্ভর মোটরসাইকেলের পরিবর্তে বৈদ্যুতিক মোটরসাইকেল ব্যবহার করলে ব্যয় কমানো সম্ভব হতে পারে।
মোটরসাইকেল ব্যবহারকারী শাহেদ জামান বলেন, জ্বালানির দাম যেভাবে বাড়ছে, তাতে মোটরসাইকেল চালানো কঠিন হয়ে উঠছে। তাই তিনি বৈদ্যুতিক মোটরসাইকেলে যাওয়ার কথা ভাবছেন। তার কাছে এটিই এখন বিকল্প হিসেবে মনে হচ্ছে।
বাড়ছে সংসার চালানোর চাপ
জ্বালানির দাম বাড়ার ফলে মোটরসাইকেলনির্ভর মানুষের ওপর শুধু তাৎক্ষণিক খরচের চাপই বাড়ছে না, এর প্রভাব পড়তে পারে তাদের সামগ্রিক মাসিক বাজেটেও।
বিশেষ করে যারা প্রতিদিন দীর্ঘ দূরত্বে মোটরসাইকেল চালিয়ে অফিস, ব্যবসা বা অন্যান্য কাজে যাতায়াত করেন, তাদের জ্বালানি ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়বে। আর রাইড শেয়ারিং চালকদের ক্ষেত্রে বাড়তি খরচ সরাসরি তাদের আয়-ব্যয়ের ভারসাম্যে প্রভাব ফেলবে।
ফলে জ্বালানির দাম বৃদ্ধির পর মোটরসাইকেলচালকদের সামনে এখন বড় প্রশ্ন—বাড়তি খরচ যাত্রীদের ওপর ভাড়ার মাধ্যমে চাপানো হবে, নাকি সেই খরচ নিজেদের আয়ের মধ্য থেকেই বহন করতে হবে।
ভাড়া বাড়ালে যাত্রী হারানোর ঝুঁকি, আর ভাড়া না বাড়ালে আয় কমে যাওয়ার আশঙ্কা—দুইয়ের মাঝেই আটকে পড়েছেন রাইড শেয়ারিং চালকরা। একই সঙ্গে ব্যক্তিগত মোটরসাইকেল ব্যবহারকারীদেরও এখন নিজেদের মাসিক বাজেট নতুন করে হিসাব করতে হচ্ছে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















