রাশিয়ার জাতীয় সংসদে আবারও বড় ধরনের সংখ্যাগরিষ্ঠতা ধরে রেখেছে প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের নেতৃত্বাধীন রাজনৈতিক ব্যবস্থার প্রধান দল ইউনাইটেড রাশিয়া। প্রায় সম্পূর্ণ ফলাফলে দলটি ৫৭ শতাংশের বেশি ভোট পেয়েছে। একই নির্বাচনে দেশটির একমাত্র নিবন্ধিত যুদ্ধবিরোধী দল ইয়াবলোকো জাতীয় সংসদে কোনো আসন না পেলেও একটি আঞ্চলিক সংসদে সামান্য জায়গা করে নিয়েছে।
রোববার শেষ হওয়া তিন দিনের এই নির্বাচনকে পুতিন ইউক্রেনের বিরুদ্ধে চলমান যুদ্ধের প্রতি রুশ জনগণের সমর্থনের পরীক্ষা হিসেবে তুলে ধরেছিলেন। ২০২২ সালের ফেব্রুয়ারিতে ইউক্রেনে পূর্ণমাত্রার যুদ্ধ শুরুর পর এটিই ছিল রাশিয়ার প্রথম জাতীয় সংসদ নির্বাচন। জাতীয় সংসদের পাশাপাশি কয়েকটি অঞ্চলের সংসদ ও গভর্নর নির্বাচনও একই সময়ে অনুষ্ঠিত হয়েছে।
রাশিয়ার রাজনৈতিক ব্যবস্থা অত্যন্ত নিয়ন্ত্রিত বলে দীর্ঘদিন ধরে সমালোচনা রয়েছে। বিরোধীদের অভিযোগ, সেখানে প্রকৃত রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতার সুযোগ সীমিত। যুদ্ধবিরোধী ইয়াবলোকোর বেশ কয়েকজন প্রার্থীও নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার সুযোগ পাননি। ফলে জাতীয় পর্যায়ে বড় ধরনের চমক দেখার সম্ভাবনা আগে থেকেই কম ছিল।
তারপরও রুশ কর্তৃপক্ষের কাছে নির্বাচনটি গুরুত্বপূর্ণ ছিল। ভোটের পুরো প্রক্রিয়াটি নির্বিঘ্ন ও স্বাভাবিক হিসেবে তুলে ধরে দেশের ভেতরে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা এবং বিদেশে রাশিয়ার ঐক্যের বার্তা দেওয়াই ছিল তাদের অন্যতম লক্ষ্য।
ডুমায় ইউনাইটেড রাশিয়ার বড় জয়
রাশিয়ার কেন্দ্রীয় নির্বাচন কমিশনের চেয়ারম্যান এলা পামফিলোভা জানান, ৯৫ শতাংশের বেশি ভোট গণনা শেষে ইউনাইটেড রাশিয়া ৫৭ দশমিক ৮৩ শতাংশ ভোট পেয়েছে। ২০২১ সালের সর্বশেষ সংসদ নির্বাচনে দলটি পেয়েছিল ৪৯ দশমিক ৮ শতাংশ ভোট।
প্রাথমিক হিসাব অনুযায়ী, ৪৫০ আসনের স্টেট ডুমায় ইউনাইটেড রাশিয়া প্রায় ৩৫৫টি আসন পেতে যাচ্ছে। অর্থাৎ সংসদের প্রায় ৮০ শতাংশ আসনই তাদের নিয়ন্ত্রণে থাকবে।
এর ফলে দলটি সাংবিধানিক সংখ্যাগরিষ্ঠতা ধরে রাখবে। এই সংখ্যাগরিষ্ঠতার কারণে অন্য দলগুলোর সমর্থন ছাড়াই ইউনাইটেড রাশিয়া আইন পাস এবং সংবিধান সংশোধনের উদ্যোগ নিতে পারবে।
জাতীয় সংসদে ইউনাইটেড রাশিয়ার পর কমিউনিস্ট পার্টি ১৩ দশমিক ৮১ শতাংশ, অতি-জাতীয়তাবাদী এলডিপিআর ৮ দশমিক ৯৮ শতাংশ এবং নিউ পিপল পার্টি ৭ দশমিক ৯৬ শতাংশ ভোট পেয়েছে।
জাস্ট রাশিয়া পার্টি ৫ শতাংশের প্রয়োজনীয় সীমার সামান্য নিচে রয়েছে। তবে নির্বাচন কমিশনের ভাষ্য অনুযায়ী, দলটির সংসদে প্রবেশের এখনও ভালো সম্ভাবনা রয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, সংসদে জায়গা পাওয়া এই দলগুলোর অধিকাংশই ইউক্রেন যুদ্ধসহ গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় ইস্যুতে ইউনাইটেড রাশিয়ার সঙ্গে একই ধরনের অবস্থান নিয়ে ভোট দিয়েছে। ফলে জাতীয় সংসদে পুতিনের রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণে বড় কোনো পরিবর্তন আসার সম্ভাবনা নেই।
যুদ্ধবিরোধীদের জাতীয় সংসদে প্রবেশ ব্যর্থ
রাশিয়ার নিবন্ধিত দলগুলোর মধ্যে ইয়াবলোকোই একমাত্র দল, যারা প্রকাশ্যে ইউক্রেন যুদ্ধের বিরোধিতা করে এবং যুদ্ধবিরতির পক্ষে অবস্থান নেয়। কিন্তু জাতীয় সংসদে কোনো আসন জিততে পারেনি দলটি।
তবে পুরোপুরি ব্যর্থ হয়নি ইয়াবলোকো। মস্কোর প্রায় ৪৮০ কিলোমিটার উত্তর-পশ্চিমে অবস্থিত নভগোরদ অঞ্চলের সংসদে দলটি একটি ছোট রাজনৈতিক অবস্থান তৈরি করতে পেরেছে।
প্রায় ৯৭ শতাংশ ভোট গণনার পর দেখা যায়, ইয়াবলোকো ৫ শতাংশের প্রয়োজনীয় সীমা প্রায় এক শতাংশ ব্যবধানে অতিক্রম করেছে। দলটির দাবি, নভগোরদের ১২ হাজারের বেশি মানুষ তাদের পক্ষে ভোট দিয়েছেন।
দলটি এক বিবৃতিতে বলেছে, শান্তি, স্বাধীনতা এবং ভয়মুক্ত জীবনের মতো মূল্যবোধ মানুষের মনে সাড়া ফেলেছে।
জাতীয় পর্যায়ে কোনো আসন না পেলেও একটি আঞ্চলিক সংসদে ইয়াবলোকোর এই প্রবেশকে রাশিয়ার বর্তমান রাজনৈতিক পরিবেশে প্রতীকীভাবে গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে।
পুতিনের জন্য নির্বাচনের রাজনৈতিক বার্তা
পুতিন এই নির্বাচনকে শুধু সংসদ গঠনের প্রক্রিয়া হিসেবে দেখেননি। ইউক্রেন যুদ্ধের মধ্যে তিনি এটিকে রাশিয়ার জনগণ তার নীতির পাশে আছে—এমন একটি বার্তা দেওয়ার সুযোগ হিসেবেও তুলে ধরেছেন।
ভোটের শেষ দিন রাশিয়ার রাজধানী মস্কোতে ইউক্রেনের বড় ধরনের ড্রোন হামলার পরও নির্বাচন কার্যক্রম চালু ছিল। কেন্দ্রীয় নির্বাচন কমিশনের হিসাবে, দেশের প্রায় ১১ কোটি ১০ লাখ ভোটারের মধ্যে ৫৯ দশমিক ৩ শতাংশ ভোট দিয়েছেন। কমিশন এটিকে এ ধরনের নির্বাচনে রেকর্ড ভোটার উপস্থিতি হিসেবে বর্ণনা করেছে।
পামফিলোভা নির্বাচনকে ‘পরিষ্কার’ বলে দাবি করেছেন। তবে নির্বাসনে থাকা রুশ বিরোধী কর্মীরা ব্যাপক কারচুপির অভিযোগ তুলেছেন।
কাদিরভেরও বড় জয়
জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পাশাপাশি রাশিয়ার বিভিন্ন অঞ্চলেও নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে আলোচিত ফলগুলোর একটি এসেছে চেচনিয়া থেকে।
পুতিনের ঘনিষ্ঠ মিত্র হিসেবে পরিচিত রমজান কাদিরভ চেচনিয়ার নেতা হিসেবে পঞ্চম মেয়াদে পুনর্নির্বাচিত হয়েছেন। সরকারি হিসাবে তিনি প্রায় ১০০ শতাংশ ভোট পেয়েছেন।
সব মিলিয়ে এবারের নির্বাচনের ফল রাশিয়ার বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতাকেই আরও স্পষ্ট করেছে। জাতীয় সংসদে ইউনাইটেড রাশিয়ার শক্ত অবস্থান অটুট রয়েছে এবং যুদ্ধপন্থী বা সরকারঘনিষ্ঠ দলগুলোর আধিপত্যও বজায় আছে। অন্যদিকে যুদ্ধবিরোধী রাজনীতির জন্য পরিচিত ইয়াবলোকোর নভগোরদে সামান্য সাফল্য দেখিয়েছে, যা রাশিয়ার কঠোর নিয়ন্ত্রিত রাজনৈতিক পরিবেশে বিরোধী মতের সীমিত উপস্থিতির একটি প্রতীকী উদাহরণ হয়ে থাকল।
Sarakhon Report 


















