মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের (আইসিসি) পুরো সংস্থার ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপের প্রস্তুতি নিয়েছে। বিষয়টির সঙ্গে পরিচিত দুটি সূত্র রয়টার্সকে জানিয়েছে, শিগগিরই এ নিষেধাজ্ঞা ঘোষণা করা হতে পারে। তবে ঠিক কবে ঘোষণা আসবে, তা এখনো স্পষ্ট নয়।
বিশ্বজুড়ে যুদ্ধাপরাধ, গণহত্যা ও মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার করা আন্তর্জাতিক এই আদালতের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের চলমান চাপের এটি হতে পারে আরও বড় পদক্ষেপ। এর আগে ট্রাম্প প্রশাসন আদালটির কয়েকজন বিচারক ও কৌঁসুলির ওপর নিষেধাজ্ঞা দিয়েছিল। এবার পুরো প্রতিষ্ঠানকে লক্ষ্যবস্তু করলে আদালটির স্বাভাবিক কার্যক্রম মারাত্মকভাবে ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
ইসরায়েল ও আফগানিস্তান তদন্ত নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের আপত্তি
ট্রাম্প প্রশাসন দীর্ঘদিন ধরেই আইসিসির কার্যক্রমের বিরোধিতা করে আসছে। বিশেষ করে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু ও সাবেক প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইয়োভ গ্যালান্টের বিরুদ্ধে আদালতের গ্রেপ্তারি পরোয়ানা নিয়ে ওয়াশিংটনের তীব্র আপত্তি রয়েছে।
গাজা যুদ্ধের সময় সংঘটিত কথিত যুদ্ধাপরাধ ও মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগের তদন্তের অংশ হিসেবে আইসিসি ২০২৪ সালের নভেম্বরে নেতানিয়াহুর বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করে। একই সময়ে হামাসের এক নেতার বিরুদ্ধেও গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করা হয়েছিল।
এ ছাড়া আফগানিস্তানে মার্কিন সেনাদের বিরুদ্ধে কথিত যুদ্ধাপরাধের পুরোনো তদন্ত নিয়েও যুক্তরাষ্ট্র আইসিসির ওপর ক্ষুব্ধ।
মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও গত জুলাইয়ে আইসিসিকে আন্তর্জাতিকভাবে বিচ্ছিন্ন করার উদ্যোগের ঘোষণা দেন। তিনি বিভিন্ন দেশকে আদালত থেকে বেরিয়ে আসার আহ্বান জানান।
পুরো আদালতের ওপর নিষেধাজ্ঞার প্রভাব কী হতে পারে
এবার যদি যুক্তরাষ্ট্র সরাসরি আইসিসির পুরো সংস্থা এবং আদালটির সঙ্গে সহযোগিতাকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে, তাহলে আদালটির দৈনন্দিন কার্যক্রম বড় ধরনের সমস্যায় পড়তে পারে।
মার্কিন অর্থ মন্ত্রণালয়ের অধীনে নিষেধাজ্ঞা কার্যকর হলে যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিক ও প্রতিষ্ঠানগুলো বিশেষ অনুমতি ছাড়া আইসিসিকে অর্থ, পণ্য বা সেবা দিতে পারবে না। মার্কিন আর্থিক ব্যবস্থার ওপর নির্ভরশীল অনেক ব্যাংক সাধারণত এমন নিষেধাজ্ঞার ক্ষেত্রে প্রয়োজনের তুলনায় আরও কঠোর অবস্থান নেয়।
এর ফলে আদালটির তথ্যপ্রযুক্তি সেবা কেনা, বিমা করা, তদন্তকারী নিয়োগ এবং নিয়মিত আর্থিক লেনদেন বাধাগ্রস্ত হতে পারে। এমনকি আইসিসিতে কর্মরত কয়েক ডজন মার্কিন নাগরিকের বেতন পরিশোধের ক্ষেত্রেও সমস্যা তৈরি হতে পারে।
আদালটির রেজিস্ট্রার ও প্রেসিডেন্ট এর আগেও সতর্ক করে বলেছেন, পুরো প্রতিষ্ঠানের ওপর নিষেধাজ্ঞা আদালটির কার্যক্রমকে গুরুতর ঝুঁকির মুখে ফেলতে পারে।
জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের বৈঠকের মধ্যেই ঘোষণা?
ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের এক প্রতিবেদনে মার্কিন কর্মকর্তাদের উদ্ধৃত করে বলা হয়েছে, চলতি সপ্তাহেই সিদ্ধান্তটি চূড়ান্ত হতে পারে। নিউইয়র্কে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের বৈঠক চলার সময় এমন ঘোষণা এলে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে এর তাৎপর্য আরও বাড়তে পারে।
তবে রয়টার্সের সূত্রগুলো জানিয়েছে, নিষেধাজ্ঞা প্রস্তুত করা হলেও ঘোষণার নির্দিষ্ট সময় এখনো চূড়ান্ত হয়নি।
ট্রাম্পের আইসিসিবিরোধী অবস্থান অবশ্য নতুন নয়। তাঁর প্রথম মেয়াদেও আদালটির কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। ২০২৪ সালে পুনর্নির্বাচিত হওয়ার পর ইসরায়েলি নেতাদের বিরুদ্ধে আইসিসির গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারির বিষয়টি সেই বিরোধকে আবার সামনে নিয়ে আসে।
আইসিসি কী এবং যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান কী
আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত ২০০২ সালে প্রতিষ্ঠিত হয়। কোনো দেশে যুদ্ধাপরাধ, গণহত্যা বা মানবতাবিরোধী অপরাধ সংঘটিত হলে এবং সংশ্লিষ্ট দেশ নিজে তা তদন্ত বা বিচার করতে না চাইলে বা সক্ষম না হলে নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে আইসিসি সেই অপরাধের বিচার করার এখতিয়ার দাবি করে।
তবে যুক্তরাষ্ট্র আইসিসির সদস্য নয়। আদালতটির কার্যক্রমে যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘদিনের আপত্তির অন্যতম কারণ হলো মার্কিন নাগরিক ও সেনাদের বিরুদ্ধে আইসিসির সম্ভাব্য এখতিয়ার এবং বিভিন্ন তদন্ত।
এবার পুরো আইসিসির ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হলে তা শুধু যুক্তরাষ্ট্র ও আদালতের মধ্যকার বিরোধকেই তীব্র করবে না, আন্তর্জাতিক বিচারব্যবস্থায়ও এর বড় প্রভাব পড়তে পারে। বিশেষ করে যুদ্ধাপরাধ ও মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার পরিচালনায় আন্তর্জাতিক সহযোগিতার ওপর নতুন করে চাপ তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















