জাপানের কুমামোতো প্রিফেকচারে মঙ্গলবার আঘাত হানা ৭.১ মাত্রার শক্তিশালী ভূমিকম্প শুধু প্রাণহানি ও অবকাঠামোর ক্ষতিই ঘটায়নি, বরং পুরো অঞ্চলের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডেও বড় ধরনের অচলাবস্থা সৃষ্টি করেছে। বাণিজ্যিক স্থাপনা, শিল্পকারখানা, পরিবহন এবং সরবরাহ ব্যবস্থায় ব্যাপক বিঘ্নের কারণে শিল্প উৎপাদন ও ব্যবসায়িক কার্যক্রম উল্লেখযোগ্যভাবে ব্যাহত হয়েছে।
স্থানীয় সময় মঙ্গলবার বিকেল ৪টা ২৭ মিনিটে ভূমিকম্পটি আঘাত হানে। কুমামোতোর উকি শহর এবং হিকাওয়া এলাকায় জাপানের ভূমিকম্পের তীব্রতা পরিমাপের স্কেলে সর্বোচ্চ শিন্দো-৭ মাত্রা রেকর্ড করা হয়।
বাণিজ্যিক স্থাপনা ও কারখানায় প্রাণহানি
কুমামোতোর কাশিমা শহরের একটি এইয়ন পরিচালিত শপিং মলে বিস্ফোরণের ঘটনায় অন্তত তিনজন নিহত হয়েছেন। বুধবারও সেখানে উদ্ধার অভিযান চলছিল বলে জানিয়েছেন এইয়নের প্রেসিডেন্ট আকিও ইয়োশিদা।
ইয়াতসুশিরো শহরে নিপ্পন পেপার ইন্ডাস্ট্রিজের একটি কারখানায় ভূমিকম্পের সময় চিমনি ধসে পড়ে। এতে ১১ জন শ্রমিক আটকা পড়েন। কুমামোতো প্রিফেকচার সরকারের তথ্য অনুযায়ী, এ পর্যন্ত সাতজনকে উদ্ধার করা হয়েছে, যাদের মধ্যে পাঁচজনের মৃত্যু হয়েছে। আরও চারজন নিখোঁজ রয়েছেন।
বড় শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোর উৎপাদন বন্ধ
ভূমিকম্পের পর কুমামোতোর ওজু এলাকায় হোন্ডা তাদের কারখানার উৎপাদন স্থগিত করেছে। বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়ায় উকি শহরে অটোমোবাইল যন্ত্রাংশ প্রস্তুতকারী অ্যাস্টেমোও তাদের কারখানার কার্যক্রম বন্ধ রেখেছে। প্রতিষ্ঠান দুটি কবে আবার স্বাভাবিক উৎপাদনে ফিরতে পারবে, সে বিষয়ে এখনো কোনো সময়সূচি জানায়নি।
প্রতিবেশী ফুকুওকা প্রিফেকচারের তিনটি কারখানা সাময়িকভাবে বন্ধ করার পর বুধবার সকালে উৎপাদন শুরু করেছিল টয়োটা। তবে সরবরাহ শৃঙ্খলে ভূমিকম্পের প্রভাব মূল্যায়নের জন্য পরে আবারও উৎপাদন লাইন স্থগিত করার সিদ্ধান্ত নেয় প্রতিষ্ঠানটি।
সেমিকন্ডাক্টর শিল্পেও প্রভাব
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে কুমামোতো জাপানের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সেমিকন্ডাক্টর উৎপাদনকেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। এখানেই বিশ্বের বৃহত্তম চুক্তিভিত্তিক চিপ নির্মাতা টিএসএমসির একটি উৎপাদন কারখানা রয়েছে।
স্থানীয় সংবাদমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, ভূমিকম্পের পর কিকুইও এলাকার কারখানা থেকে কর্মীদের সাময়িকভাবে সরিয়ে নেওয়া হয়েছিল। পরে উৎপাদন সরঞ্জামের ক্ষয়ক্ষতি মূল্যায়নের পাশাপাশি ধীরে ধীরে কার্যক্রম পুনরায় চালু করা হচ্ছে।
অন্যদিকে সনি গ্রুপ এবং রেনেসাস ইলেকট্রনিকস কুমামোতোর সেমিকন্ডাক্টর কারখানার উৎপাদন বন্ধ রেখেছে। কবে কার্যক্রম পুনরায় শুরু হবে, সে বিষয়ে কোনো ঘোষণা দেয়নি প্রতিষ্ঠান দুটি।
খাদ্য ও পানীয় শিল্পেও স্থবিরতা
আলুর চিপস প্রস্তুতকারী কোইকে-ইয়া কুমামোতোর মাশিকি এলাকার কারখানায় উৎপাদন স্থগিত করেছে। একইভাবে কাশিমায় সানটরির বিয়ার কারখানাও সাময়িকভাবে বন্ধ রয়েছে।
পরিবহন ও যোগাযোগে ব্যাপক বিঘ্ন
ভূমিকম্পের কারণে সড়ক ও সেতুর ক্ষয়ক্ষতির ফলে বুধবার পর্যন্ত ১৭টি সড়ক অংশজুড়ে তিনটি প্রধান রুট বন্ধ ছিল বলে জানিয়েছে ভূমি, অবকাঠামো, পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়।
ডাক ও পার্সেল পরিবহনও বড় ধরনের বাধার মুখে পড়েছে। কুমামোতো প্রিফেকচারের সব ডাকঘরের কাউন্টার সেবা বুধবার বন্ধ রাখা হয় এবং অঞ্চলটিতে ইউ-প্যাক পার্সেল গ্রহণ সাময়িকভাবে স্থগিত করা হয়েছে।
ইয়ামাতো ট্রান্সপোর্ট কুমামোতো এবং প্রতিবেশী মিয়াজাকি প্রিফেকচারের কিছু এলাকায় পার্সেল সংগ্রহ ও সরবরাহ বন্ধ করেছে। একইভাবে সাগাওয়া এক্সপ্রেসও ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় তাদের সেবা সাময়িকভাবে স্থগিত রেখেছে।
এ ছাড়া এনটিটি ডোকোমো, কেডিডিআই, রাকুটেন মোবাইল এবং সফটব্যাংকের যোগাযোগ সেবাও ভূমিকম্পে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় বিঘ্নিত হয়েছে, ফলে ব্যবসা ও সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন কার্যক্রম আরও ব্যাহত হচ্ছে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















