ভারতের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ড. মনমোহন সিংকে কয়লা ব্লক বরাদ্দ-সংক্রান্ত বহুল আলোচিত মামলায় মৃত্যুর পর আনুষ্ঠানিকভাবে সম্পূর্ণ অব্যাহতি দিয়েছে দেশটির সুপ্রিম কোর্ট। বুধবার দেওয়া রায়ে আদালত ২০১৫ সালে বিশেষ সিবিআই আদালতের সেই আদেশ বাতিল করে, যেখানে তদন্তকারী সংস্থার দুটি ক্লোজার রিপোর্ট থাকা সত্ত্বেও তাঁকে অভিযুক্ত হিসেবে তলব করা হয়েছিল।
প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্ত, বিচারপতি জয়মাল্য বাগচী ও বিচারপতি ভি. মোহনার সমন্বয়ে গঠিত বেঞ্চ জানায়, ড. মনমোহন সিংয়ের বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলা চালানোর মতো কোনো গ্রহণযোগ্য বা যুক্তিসংগত কারণ ছিল না। ফলে সিবিআইয়ের দুটি ক্লোজার রিপোর্ট গ্রহণ করে মামলাটি বন্ধ করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
বহু বছরের আইনি লড়াইয়ের অবসান
ডিসেম্বর ২০২৪ সালে ড. মনমোহন সিং মারা যান। তবে তাঁর বিরুদ্ধে জারি হওয়া সমনের বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে করা আপিলটি এক দশকেরও বেশি সময় ধরে সুপ্রিম কোর্টে বিচারাধীন ছিল। তাঁর মৃত্যুর কারণে আপিলটি প্রযুক্তিগতভাবে নিষ্পত্তিযোগ্য না হলেও, আদালত মনে করে যে বিচারিক সিদ্ধান্তের বৈধতা যাচাই করা জরুরি।
আদালত বলেছে, তদন্তকারী সংস্থা যখন দুবারই জানিয়েছে যে মামলায় অভিযোগ গঠনের মতো কোনো উপাদান নেই, তখন সেই ক্লোজার রিপোর্ট প্রত্যাখ্যান করে অভিযুক্ত হিসেবে তলব করার সিদ্ধান্ত আইনগতভাবে টেকসই ছিল না।

বিশেষ আদালতের আদেশ বাতিল
সুপ্রিম কোর্ট ২০১৫ সালের ১১ মার্চ বিশেষ সিবিআই আদালতের আদেশ বাতিল করে জানিয়েছে, তদন্ত প্রতিবেদন মূল্যায়নের ক্ষেত্রে সুপ্রতিষ্ঠিত বিচারিক নীতিমালা অনুসরণ করা হয়নি। আদালতের মতে, বিশেষ বিচারকের কাছে সিবিআইয়ের ক্লোজার রিপোর্ট প্রত্যাখ্যান করার মতো যথেষ্ট কারণ ছিল না।
রায়ে আরও বলা হয়, ড. মনমোহন সিং আর জীবিত না থাকলেও তাঁকে অভিযুক্ত করার সিদ্ধান্তের বৈধতা বিচারিকভাবে পর্যালোচনা করা প্রয়োজন ছিল। সে কারণেই আদালত সিবিআইয়ের উভয় ক্লোজার রিপোর্ট খতিয়ে দেখে এই সিদ্ধান্তে পৌঁছেছে।
আইনজীবীদের যুক্তি
ড. মনমোহন সিংয়ের আইনগত প্রতিনিধিদের পক্ষে জ্যেষ্ঠ আইনজীবী কপিল সিব্বল ও অভিষেক মনু সিংভি আদালতে যুক্তি দেন যে, তদন্তে কোনো অপরাধের প্রমাণ না পাওয়া সত্ত্বেও ট্রায়াল কোর্ট তাঁর বিরুদ্ধে বিরূপ মন্তব্য করেছে এবং পরোক্ষভাবে ফৌজদারি দায় চাপিয়েছে। তাঁরা আদালতের কাছে সেই পর্যবেক্ষণগুলোও মুছে ফেলার আবেদন জানান।
অন্যদিকে সিবিআইয়ের পক্ষে জ্যেষ্ঠ আইনজীবী আর. এস. চিমা বলেন, মামলায় অন্য অভিযুক্তদের বিষয় এবং দুর্নীতি প্রতিরোধ আইনের কিছু সাংবিধানিক প্রশ্ন আলাদাভাবে টিকে থাকতে পারে। তবে ড. মনমোহন সিংয়ের বিরুদ্ধে অভিযোগের বিষয়ে উভয় পক্ষের অবস্থানে মূলত কোনো মতভেদ ছিল না।
শুনানির সময় বেঞ্চ মন্তব্য করে, বিশেষ বিচারক আদেশ দিতে গিয়ে বিচারিক সীমা অতিক্রম করেছিলেন। আদালত আরও জানায়, বিচারিক ক্ষমতা প্রয়োগের ক্ষেত্রেও বাস্তবসম্মত সীমা থাকা উচিত।

যেভাবে শুরু হয়েছিল বিতর্ক
মামলাটির সূত্রপাত ২০০৫ সালে ওডিশার তালাবিরা-২ কয়লা ব্লক হিন্দালকো ইন্ডাস্ট্রিজকে বরাদ্দ দেওয়া নিয়ে। সে সময় প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পাশাপাশি কয়লা মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বও পালন করছিলেন ড. মনমোহন সিং।
সিবিআই তদন্ত শেষে দুবার ক্লোজার রিপোর্ট দিয়ে জানায়, তাঁর বিরুদ্ধে মামলা চালানোর মতো কোনো প্রমাণ নেই। কিন্তু ২০১৫ সালে বিশেষ সিবিআই আদালত সেই রিপোর্ট প্রত্যাখ্যান করে প্রাথমিকভাবে অভিযোগের ভিত্তি রয়েছে বলে মত দেয় এবং ড. মনমোহন সিং, সাবেক কয়লা সচিব পি. সি. পারাখসহ কয়েকজনকে অভিযুক্ত হিসেবে তলব করে।
এরপরই ড. মনমোহন সিং সুপ্রিম কোর্টে আপিল করেন। ২০১৫ সালের ১ এপ্রিল সর্বোচ্চ আদালত সমন এবং সংশ্লিষ্ট সব কার্যক্রমে স্থগিতাদেশ দেয়। দীর্ঘ ১১ বছরের বেশি সময় পর সেই আপিলের চূড়ান্ত নিষ্পত্তিতে তাঁর বিরুদ্ধে সব অভিযোগের অবসান ঘটল।
কয়লা ব্লক মামলায় ড. মনমোহন সিংকে সম্পূর্ণ অব্যাহতি দিয়ে সুপ্রিম কোর্ট বিশেষ সিবিআই আদালতের ২০১৫ সালের সমন আদেশ বাতিল করেছে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















