যুক্তরাষ্ট্র ও সৌদি আরব ইরাকে ইরান-সমর্থিত সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর ওপর যৌথ বিমান হামলা চালানোর পর মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত নতুন করে তীব্র হয়ে উঠেছে। একই সময়ে ইরান জানিয়েছে, তারা হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ লক্ষ্য করে হামলা চালিয়েছে এবং জর্ডানে অবস্থিত মার্কিন সামরিক ঘাঁটির দিকেও ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করেছে। কূটনৈতিক উদ্যোগ ব্যর্থ হওয়ায় যুদ্ধ দ্রুত থামার সম্ভাবনা আরও ক্ষীণ হয়েছে এবং আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম আবারও বেড়ে গেছে।
যুদ্ধের নতুন অধ্যায়
বুধবার যুক্তরাষ্ট্র গত সপ্তাহে বোমা হামলা স্থগিত করার পর প্রথমবারের মতো মধ্যপ্রাচ্যে সামরিক অভিযান চালায়। সৌদি আরবের সঙ্গে সমন্বিত এ অভিযানে ইরাকে ইরান-সমর্থিত সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর বিভিন্ন ঘাঁটি লক্ষ্যবস্তু করা হয়।
ওয়াশিংটন ও রিয়াদ জানিয়েছে, সৌদি আরবের তেল স্থাপনায় ড্রোন হামলার জবাবে এই যৌথ হামলা চালানো হয়েছে। ইরাকের পপুলার মোবিলাইজেশন ফোর্সেস (পিএমএফ) দাবি করেছে, হামলায় তাদের অন্তত ২০ সদস্য নিহত এবং ৩২ জন আহত হয়েছেন।
সৌদি আরবের সরাসরি অংশগ্রহণ
চলমান সংঘাতে এই প্রথম সৌদি আরব প্রকাশ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যৌথ সামরিক অভিযানে অংশ নেওয়ার কথা স্বীকার করল। বিশ্লেষকদের মতে, এতে সংঘাতের ভৌগোলিক পরিসর আরও বিস্তৃত হওয়ার ইঙ্গিত মিলছে, কারণ সুন্নি সংখ্যাগরিষ্ঠ সৌদি আরব এখন সরাসরি ইরান-সমর্থিত শিয়া গোষ্ঠীগুলোর বিরুদ্ধে সামরিক পদক্ষেপে অংশ নিচ্ছে।
ইরাকের সরকার, যারা একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক বজায় রেখে চলেছে, পরিস্থিতি মোকাবিলায় জরুরি বৈঠক ডেকেছে।
ইরানের পাল্টা পদক্ষেপ
ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি) জানিয়েছে, তারা জর্ডানে মার্কিন সামরিক স্থাপনাগুলোর দিকে একাধিক ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করেছে। পাশাপাশি হরমুজ প্রণালি দিয়ে চলাচলকারী তিনটি ট্যাংকারেও হামলার দাবি করেছে।
অন্যদিকে জর্ডানের সেনাবাহিনী জানিয়েছে, তাদের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা পাঁচটি ইরানি ক্ষেপণাস্ত্র ভূপাতিত করেছে।
এর আগে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনীও জানায়, তারা অঞ্চলে অবস্থানরত মার্কিন সেনাদের ওপর সম্ভাব্য একটি আকস্মিক ইরানি হামলা প্রতিহত করেছে।
হরমুজ নিয়ে সমঝোতা ভেস্তে গেল
সংঘাতের অন্যতম কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠেছে বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহন পথ হরমুজ প্রণালি। জুন মাসে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে যুদ্ধ বন্ধের একটি কাঠামোগত সমঝোতা হলেও প্রণালির নিয়ন্ত্রণ নিয়ে মতবিরোধের কারণে তা ভেঙে যায়।
এই সপ্তাহে ওমান উপসাগরীয় দেশগুলোর সমর্থনে হরমুজ যৌথভাবে পরিচালনার একটি প্রস্তাব দেয়। তবে রয়টার্সকে এক জ্যেষ্ঠ ইরানি কর্মকর্তা জানান, তেহরান ওই প্রস্তাবকে “অযৌক্তিক” বলে প্রত্যাখ্যান করেছে।
ইরানের অবস্থান হলো, প্রণালিতে প্রবেশমুখে তাদের একক নিয়ন্ত্রণ এবং বহির্গমনপথে আংশিক নিয়ন্ত্রণ থাকতে হবে। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র বাণিজ্যিক জাহাজগুলোকে ইরানের উপকূল এড়িয়ে ওমানের কাছাকাছি পথ ব্যবহার করার পরামর্শ দিয়ে আসছে।
তেলের বাজারে নতুন চাপ
নতুন করে সংঘাত ছড়িয়ে পড়া এবং কূটনৈতিক অচলাবস্থার কারণে আন্তর্জাতিক তেলের বাজারে তাৎক্ষণিক প্রভাব পড়েছে। ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ব্যারেলপ্রতি ৩ ডলারের বেশি বেড়ে আবার ৮৭ ডলারের ওপরে উঠে যায়। গত সপ্তাহে দাম ১০০ ডলারের ওপরে উঠলেও পরে তা কমে আসে। তবে নতুন সামরিক উত্তেজনা আবারও জ্বালানি বাজারে অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে।
মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত এখন শুধু সামরিক নয়, বৈশ্বিক জ্বালানি নিরাপত্তা ও আঞ্চলিক কূটনীতির জন্যও বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠছে। যুক্তরাষ্ট্র, সৌদি আরব ও ইরানের সাম্প্রতিক পদক্ষেপ পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















