চীনের নতুন ধরনের একটি রহস্যময় সাবমেরিন স্যাটেলাইট ছবিতে শনাক্ত হওয়ার পর এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে নতুন করে নিরাপত্তা উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। বিশেষজ্ঞদের ধারণা, এটি বেইজিংয়ের পরবর্তী প্রজন্মের পারমাণবিক শক্তিচালিত আক্রমণাত্মক সাবমেরিন, যা আগের মডেলের তুলনায় আরও নিঃশব্দ, দীর্ঘপাল্লার এবং শনাক্ত করা কঠিন হতে পারে।
মে মাসের শেষ দিকে সাংহাইয়ের জিয়াংনান শিপইয়ার্ডে তোলা স্যাটেলাইট ছবিতে সাবমেরিনটি দেখা যায়। এর দৈর্ঘ্য প্রায় ১২০ মিটার এবং প্রস্থ প্রায় ১০ মিটার। বিশেষজ্ঞদের মতে, আকার এবং নকশার দিক থেকে এটি চীনের বিদ্যমান টাইপ-০৯৩ পারমাণবিক আক্রমণাত্মক সাবমেরিনের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে ভিন্ন।
নতুন নকশার সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য হলো এর অত্যন্ত ছোট ‘সেইল’ বা উপরের কাঠামো। এই নকশা পানির প্রতিরোধ ও শব্দ কমাতে সাহায্য করতে পারে, ফলে সাবমেরিনটি পানির নিচে আরও দ্রুত চলতে এবং সহজে নজর এড়াতে সক্ষম হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

নতুন সাবমেরিন নিয়ে বিশেষজ্ঞদের মূল্যায়ন
যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক নৌবাহিনীর সাবমেরিন কমান্ডার এবং নিরাপত্তা বিশ্লেষক থমাস শুগার্ট বলেন, কেবলমাত্র এর আকার বিবেচনায় নিলেও এটি পারমাণবিক শক্তিচালিত হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি। তার মতে, প্রায় ১২০ মিটার দীর্ঘ একটি সাবমেরিন প্রচলিত ডিজেল-ইলেকট্রিক আক্রমণাত্মক সাবমেরিন হওয়ার সম্ভাবনা খুবই কম।
জাপানি প্রতিরক্ষা বিশ্লেষক মাসাশি মুরানোও একই মত প্রকাশ করেছেন। তার ব্যাখ্যায়, ডিজেল-ইলেকট্রিক সাবমেরিনকে নিয়মিতভাবে পানির কাছাকাছি উঠে বাতাস নিতে হয়, যার কারণে বড় ‘সেইল’-এর প্রয়োজন হয়। কিন্তু এত বড় একটি সাবমেরিনে এত ছোট ‘সেইল’ ব্যবহারের যৌক্তিকতা কেবল পারমাণবিক শক্তিচালিত নকশার ক্ষেত্রেই দেখা যায়।
একই সময়ে দুটি নতুন প্রকল্প
চলতি বছরের শুরুতে জানা যায়, লিয়াওনিং প্রদেশের বোহাই শিপইয়ার্ডে চীন তাদের পরবর্তী প্রজন্মের টাইপ-০৯৫ পারমাণবিক আক্রমণাত্মক সাবমেরিনও নির্মাণ করছে। নতুন এই সাবমেরিনের আবির্ভাবের ফলে ধারণা জোরালো হয়েছে যে, চীন একই সময়ে দুটি ভিন্ন শ্রেণির উন্নত পারমাণবিক সাবমেরিন প্রকল্প এগিয়ে নিচ্ছে।
বিশ্লেষকদের মতে, এগুলো হয় ভিন্ন ধরনের সামরিক মিশনের জন্য তৈরি করা হচ্ছে, নয়তো ভবিষ্যৎ প্রযুক্তি পরীক্ষার জন্য পরীক্ষামূলক প্ল্যাটফর্ম হিসেবে ব্যবহারের উদ্দেশ্যে নির্মিত হচ্ছে। কিছু বিশেষজ্ঞের ধারণা, ভবিষ্যতে এসব সাবমেরিন চালকবিহীন সামুদ্রিক ব্যবস্থার নিয়ন্ত্রণ বা মোতায়েনেও ভূমিকা রাখতে পারে।
চীনের উৎপাদন সক্ষমতার বিস্তার
বিশ্লেষকদের মতে, যদি নতুন সাবমেরিনটি সত্যিই পারমাণবিক শক্তিচালিত হয়, তাহলে বোঝা যাবে যে চীন এখন বোহাই, উহান এবং সাংহাই—এই তিনটি স্থানে পারমাণবিক সাবমেরিন নির্মাণের সক্ষমতা অর্জন করেছে।
এটি চীনের নৌবাহিনীর জন্য বড় কৌশলগত সুবিধা তৈরি করতে পারে। কারণ এত দিন বোহাই ছিল দেশটির পারমাণবিক সাবমেরিন নির্মাণের প্রধান কেন্দ্র। নতুন শিপইয়ার্ড যুক্ত হলে উৎপাদনের গতি উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়তে পারে।
আন্তর্জাতিক কৌশলগত গবেষণা সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, ২০২১ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে চীনের নৌবাহিনী ১০টি পারমাণবিক শক্তিচালিত সাবমেরিন পানিতে নামিয়েছে। একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের তুলনায় চীনের নতুন সাবমেরিনগুলোর সম্মিলিত পূর্ণ লোড স্থানচ্যুতি ছিল আরও বেশি।
জাপান ও পশ্চিম প্রশান্ত মহাসাগরের জন্য নতুন চ্যালেঞ্জ
বিশেষজ্ঞদের মতে, চীনের পারমাণবিক সাবমেরিন বহর দ্রুত সম্প্রসারিত হলে পশ্চিম প্রশান্ত মহাসাগর ও ফিলিপাইন সাগরে দীর্ঘ সময় ধরে টানা অভিযান পরিচালনার সক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়বে। ডিজেলচালিত সাবমেরিনের মতো ঘন ঘন জ্বালানি বা বায়ুর প্রয়োজন না হওয়ায় এসব সাবমেরিন অনেক বেশি কার্যকরভাবে দূরবর্তী এলাকায় মোতায়েন থাকতে পারবে।
এতে জাপান এবং তার মিত্রদের সাবমেরিনবিরোধী নজরদারি ও প্রতিরক্ষা কার্যক্রম আরও কঠিন হয়ে উঠতে পারে। বিশেষজ্ঞদের মতে, চীন যদি একই সঙ্গে পারমাণবিক সাবমেরিনের সংখ্যা বাড়ানোর পাশাপাশি সেগুলোকে আরও নিঃশব্দ করতে সক্ষম হয়, তবে তা জাপান এবং যুক্তরাষ্ট্র-জাপান নিরাপত্তা জোটের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত পরিবর্তন হিসেবে দেখা হবে।
এদিকে চীনের এই অগ্রগতি জাপানের মধ্যেও ভবিষ্যতে পারমাণবিক শক্তিচালিত সাবমেরিন উন্নয়নের বিতর্ককে আরও জোরালো করতে পারে। যদিও বর্তমানে জাপানের বহরে ২৩টি ডিজেল-ইলেকট্রিক আক্রমণাত্মক সাবমেরিন রয়েছে, তবু প্রতিরক্ষা সক্ষমতা বাড়াতে নতুন প্রজন্মের শক্তিচালিত প্ল্যাটফর্ম নিয়ে আলোচনা ক্রমেই বাড়ছে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















