ইরানের ওপর অর্থনৈতিক চাপ আরও বাড়াতে নতুন নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। এবার সরাসরি হরমুজ প্রণালিকে ঘিরে ইরানের আয় ও সামুদ্রিক বাণিজ্য ব্যবস্থাকে লক্ষ্য করা হয়েছে। নতুন নিষেধাজ্ঞার আওতায় এসেছে ১০টি প্রতিষ্ঠান ও আটটি তেলবাহী জাহাজ। এর মধ্যে চীনে নিবন্ধিত কয়েকটি প্রতিষ্ঠানও রয়েছে।
হরমুজের আয়কে লক্ষ্য করে ওয়াশিংটনের নতুন পদক্ষেপ
যুক্তরাষ্ট্রের নতুন এই পদক্ষেপের কেন্দ্রে রয়েছে ইরানের বিপ্লবী গার্ডের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট একটি সামুদ্রিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থা। মার্কিন অভিযোগ, হরমুজ প্রণালি দিয়ে চলাচলকারী জাহাজ থেকে বিভিন্ন ধরনের অর্থ আদায়ের মাধ্যমে ইরান বিপ্লবী গার্ডের জন্য অর্থ সংগ্রহ করছে।
এই অর্থের প্রবাহ বন্ধ করতেই নতুন নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছে বলে জানিয়েছে ওয়াশিংটন। এর ফলে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর আন্তর্জাতিক লেনদেন, সম্পদ এবং সামুদ্রিক বাণিজ্য কার্যক্রম আরও কঠিন হয়ে পড়তে পারে।
নিষেধাজ্ঞার তালিকায় তেলবাহী জাহাজ

নতুন নিষেধাজ্ঞার আওতায় আসা আটটি জাহাজের বেশির ভাগই তেল পরিবহনের কাজে ব্যবহৃত বলে জানা গেছে। জাহাজগুলোর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোকেও নিষেধাজ্ঞার আওতায় আনা হয়েছে।
তেলবাহী জাহাজের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপের বিষয়টি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, ইরানের অর্থনীতিতে তেল রপ্তানি বড় ধরনের ভূমিকা রাখে। একই সঙ্গে হরমুজ প্রণালি ইরানের তেল ও অন্যান্য জ্বালানি পণ্য আন্তর্জাতিক বাজারে পৌঁছানোর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পথ।
ফলে এই জলপথকেন্দ্রিক বাণিজ্য ব্যবস্থায় চাপ সৃষ্টি করে ইরানের বৈদেশিক আয় কমানোর চেষ্টা করছে যুক্তরাষ্ট্র।
চীনা প্রতিষ্ঠানও নিষেধাজ্ঞার আওতায়
নতুন পদক্ষেপের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, নিষেধাজ্ঞার তালিকায় চীনে নিবন্ধিত কয়েকটি প্রতিষ্ঠান রয়েছে। এতে বোঝা যাচ্ছে, ইরানের সঙ্গে সামুদ্রিক ও জ্বালানি বাণিজ্যে যুক্ত তৃতীয় দেশের ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলোকেও যুক্তরাষ্ট্র ছাড় দিতে চাইছে না।
এ ধরনের নিষেধাজ্ঞা শুধু ইরানি প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য নয়, ইরানের সঙ্গে ব্যবসা করা বিদেশি কোম্পানিগুলোর জন্যও ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। মার্কিন নিষেধাজ্ঞার আওতায় পড়ার আশঙ্কায় অনেক প্রতিষ্ঠান ইরানের সঙ্গে বাণিজ্যিক সম্পর্ক সীমিত করতে পারে।
কেন এত গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালি
হরমুজ প্রণালি বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহনপথ। পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে আন্তর্জাতিক বাজারে বিপুল পরিমাণ তেল ও জ্বালানি পণ্য পরিবহনের ক্ষেত্রে এই জলপথের গুরুত্ব অত্যন্ত বেশি।
এ কারণে হরমুজকে ঘিরে সামান্য উত্তেজনাও আন্তর্জাতিক বাজারে বড় ধরনের উদ্বেগ তৈরি করতে পারে। জাহাজ চলাচলে বাধা, নিরাপত্তা ঝুঁকি বা বীমা ব্যয় বেড়ে গেলে তার প্রভাব শেষ পর্যন্ত জ্বালানির দাম ও বৈশ্বিক বাণিজ্যে পড়তে পারে।
ইরানের ওপর নতুন নিষেধাজ্ঞা তাই শুধু দুই দেশের দ্বিপক্ষীয় বিরোধের বিষয় নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা, আন্তর্জাতিক জ্বালানি সরবরাহ এবং বিশ্ব অর্থনীতির স্থিতিশীলতাও।
ইরানের অর্থনীতিতে বাড়ছে চাপ
তেল রপ্তানি, সামুদ্রিক পরিবহন ও আর্থিক লেনদেনকে কেন্দ্র করে ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা নতুন নয়। তবে নতুন পদক্ষেপের মাধ্যমে ওয়াশিংটন ইরানের আয় তৈরির গুরুত্বপূর্ণ পথগুলোকে আরও সংকুচিত করার চেষ্টা করছে।
বিশেষ করে তেলবাহী জাহাজ ও সামুদ্রিক বাণিজ্যের সঙ্গে যুক্ত প্রতিষ্ঠানগুলোকে লক্ষ্য করার ফলে ইরানের জন্য আন্তর্জাতিক বাজারে তেল বিক্রি এবং সেই অর্থ দেশে ফিরিয়ে আনা আরও কঠিন হয়ে উঠতে পারে।
এর পাশাপাশি নিষেধাজ্ঞার প্রভাব মোকাবিলায় ইরানকে বিকল্প বাণিজ্যপথ, অর্থ লেনদেনের ব্যবস্থা এবং নতুন ক্রেতার ওপর আরও বেশি নির্ভর করতে হতে পারে।

জ্বালানি বাজারে কী প্রভাব পড়তে পারে
নতুন নিষেধাজ্ঞার পর সবচেয়ে বেশি নজর থাকবে আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারের দিকে। কারণ, হরমুজ প্রণালিকে কেন্দ্র করে কোনো ধরনের সামরিক উত্তেজনা বা জাহাজ চলাচলে বড় ধরনের বিঘ্ন দেখা দিলে তেলের সরবরাহ নিয়ে বাজারে অনিশ্চয়তা তৈরি হতে পারে।
তবে শুধু নিষেধাজ্ঞা আরোপের কারণে তেলের দাম কতটা বাড়বে, তা নির্ভর করবে ইরানের তেল রপ্তানি কতটা বাধাগ্রস্ত হচ্ছে এবং হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক থাকছে কি না—তার ওপর।
যুক্তরাষ্ট্র-ইরান উত্তেজনায় নতুন মাত্রা
নতুন নিষেধাজ্ঞা দুই দেশের দীর্ঘদিনের বিরোধকে আরও জটিল করে তুলেছে। যুক্তরাষ্ট্র একদিকে ইরানের অর্থনৈতিক সক্ষমতা কমাতে চাইছে, অন্যদিকে ইরানও আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের মাধ্যমে নিজের অর্থনৈতিক কার্যক্রম চালু রাখার চেষ্টা করছে।
হরমুজ প্রণালিকে কেন্দ্র করে এই টানাপোড়েন বাড়লে পরিস্থিতি কেবল অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না; এর প্রভাব আঞ্চলিক নিরাপত্তা ও আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারেও ছড়িয়ে পড়তে পারে।
সবচেয়ে বড় প্রশ্ন এখন, নতুন নিষেধাজ্ঞার পর ইরান কীভাবে তার তেল ও সামুদ্রিক বাণিজ্য চালিয়ে যায় এবং হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল কতটা স্বাভাবিক থাকে। মধ্যপ্রাচ্যের পরবর্তী পরিস্থিতির ওপরই এর উত্তর অনেকাংশে নির্ভর করবে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















