ব্রিটেনের পারমাণবিক প্রতিরক্ষা সক্ষমতা আরও শক্তিশালী করতে নতুন করে ৮৪০ কোটি পাউন্ড বিনিয়োগের ঘোষণা দিয়েছে দেশটির সরকার। এই অর্থ ব্যয় করা হবে নতুন প্রজন্মের ড্রেডনট শ্রেণির পারমাণবিক সাবমেরিন নির্মাণ প্রকল্পে। সরকারের দাবি, এই বিনিয়োগ শুধু দেশের নিরাপত্তাই জোরদার করবে না, বরং আগামী বছরগুলোতে হাজারো মানুষের কর্মসংস্থান এবং শিক্ষানবিশের সুযোগও তৈরি করবে।
বৃহস্পতিবার উত্তর-পশ্চিম ইংল্যান্ডের বারো-ইন-ফার্নেস সফরের আগে প্রধানমন্ত্রী অ্যান্ডি বার্নহ্যাম বলেন, দেশের নিরাপত্তা কেবল কী তৈরি করা হচ্ছে তার ওপর নির্ভর করে না, বরং কারা তা তৈরি করছে এবং এর সুফল কারা পাচ্ছে, সেটিও সমান গুরুত্বপূর্ণ। তাঁর ভাষায়, ব্রিটিশ অর্থ ব্রিটিশ শ্রমিক, ব্রিটিশ প্রতিষ্ঠান এবং ব্রিটিশ দক্ষতার উন্নয়নেই ব্যয় করা হবে।
নতুন সাবমেরিন নির্মাণে বড় অগ্রগতি
সরকার জানিয়েছে, নতুন ৮৪০ কোটি পাউন্ডের অর্থায়নের মাধ্যমে ড্রেডনট প্রকল্পের চতুর্থ ধাপ শুরু হচ্ছে। বর্তমানে বারো-ইন-ফার্নেসে চারটি ড্রেডনট শ্রেণির সাবমেরিন নির্মাণাধীন রয়েছে।
এই সাবমেরিনগুলো ধীরে ধীরে বর্তমান ভ্যানগার্ড শ্রেণির চারটি পারমাণবিক সাবমেরিনের স্থান নেবে। ১৯৯২ সাল থেকে পরিচালিত ভ্যানগার্ড সাবমেরিনগুলো ট্রাইডেন্ট ক্ষেপণাস্ত্র বহন করে যুক্তরাজ্যের পারমাণবিক প্রতিরোধব্যবস্থার মূল ভিত্তি হিসেবে কাজ করছে। এগুলো আগামী দশকের মধ্যে অবসরে যাবে এবং একই সময়ে নতুন ড্রেডনট সাবমেরিনগুলো দায়িত্ব গ্রহণ করবে।
দুই দশকের দীর্ঘ প্রকল্প
ড্রেডনট কর্মসূচির পরিকল্পনা শুরু হয় প্রায় ২০ বছর আগে। ২০০৬ সালে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী টনি ব্লেয়ারের সরকার প্রথম এই প্রকল্পের ঘোষণা দেয়। পরে ২০১৬ সালে ব্রিটিশ পার্লামেন্ট আনুষ্ঠানিকভাবে নতুন সাবমেরিন নির্মাণের অনুমোদন দেয়।
সরকারের প্রতিরক্ষা বিনিয়োগ পরিকল্পনা অনুযায়ী, আগামী চার বছরে পারমাণবিক প্রতিরক্ষা খাতে মোট ৬৩৬০ কোটি পাউন্ড ব্যয় করা হবে। এর মধ্যে ৪৭০০ কোটি পাউন্ড ব্যয় হবে বিদ্যমান পারমাণবিক সাবমেরিন পরিচালনা, ড্রেডনট প্রকল্প এগিয়ে নেওয়া, ভবিষ্যতের নতুন সাবমেরিনের পরিকল্পনা এবং নৌঘাঁটি ও উৎপাদন অবকাঠামো আধুনিকায়নে।
নিরাপত্তার পাশাপাশি অর্থনীতিতেও গুরুত্ব
সরকারের দাবি, বর্তমানে যুক্তরাজ্যের পারমাণবিক প্রতিরক্ষা শিল্পে প্রায় ৪৭ হাজার মানুষের কর্মসংস্থান রয়েছে। ২০৩০ সালের মধ্যে এই সংখ্যা বেড়ে ৬৫ হাজারে পৌঁছাতে পারে। একই সঙ্গে ২০৩৫ সালের মধ্যে প্রায় ২২ হাজার শিক্ষানবিশ তৈরির লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।

প্রধানমন্ত্রী বার্নহ্যাম বলেন, বারোতে নির্মিত সাবমেরিনগুলো বহু দশক ধরে ব্রিটেনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করবে। একই সঙ্গে এসব প্রকল্প শুধু একটি শহরের নয়, দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের হাজারো মানুষের জীবনে ইতিবাচক পরিবর্তন আনবে।
কর্মসংস্থানে নতুন শর্তের ইঙ্গিত
তরুণদের কর্মসংস্থান বাড়াতে সরকার সরকারি ক্রয়প্রক্রিয়াতেও পরিবর্তনের পরিকল্পনা করছে। প্রধানমন্ত্রী জানিয়েছেন, সরকারি চুক্তি পাওয়ার ক্ষেত্রে এমন প্রতিষ্ঠানগুলোকে অগ্রাধিকার দেওয়া হতে পারে, যারা অন্তত ৪৫ দিনের কর্ম-অভিজ্ঞতার সুযোগ দেয়।
তবে এই পরিকল্পনা কীভাবে বাস্তবায়ন করা হবে, কত প্রতিষ্ঠান এতে অংশ নেবে কিংবা এর বিস্তারিত কাঠামো কী হবে—সে বিষয়ে সরকার এখনও স্পষ্ট তথ্য দেয়নি।
প্রতিরক্ষা ব্যয় নিয়ে রাজনৈতিক বিতর্ক
বিরোধী কনজারভেটিভ পার্টি সাবমেরিন প্রকল্পের অগ্রগতিকে স্বাগত জানালেও সরকারের প্রতিরক্ষা ব্যয়ের প্রতিশ্রুতি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। তাদের দাবি, সরকার এখনও পূর্ণাঙ্গ অর্থায়নের নিশ্চয়তা দিতে পারেনি।

লিবারেল ডেমোক্র্যাটরা প্রতিরক্ষা সক্ষমতা বাড়াতে বিশেষ প্রতিরক্ষা বন্ড চালুর প্রস্তাব দিয়েছে। অন্যদিকে রিফর্ম ইউকে সরকারের ঘোষণাকে পুরোনো পরিকল্পনার পুনরাবৃত্তি বলে সমালোচনা করেছে এবং পারমাণবিক কর্মসূচিতে আরও বড় ধরনের সংস্কারের দাবি জানিয়েছে।
এদিকে গ্রিন পার্টি প্রশ্ন তুলেছে, এমন অস্ত্রের পেছনে বিপুল অর্থ ব্যয় করা কতটা যৌক্তিক, যেগুলো কখনও ব্যবহার করার কথা নয়। তাদের মতে, কর্মসংস্থান তৈরির জন্য আরও ফলপ্রসূ ও শান্তিপূর্ণ খাতে বিনিয়োগ করা উচিত।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















