বছরের পর বছর ধরে চলা সংঘাত, ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতি এবং অচল শান্তি আলোচনার পর আবারও বড় ধরনের সংঘর্ষের মুখে দাঁড়িয়েছে ইয়েমেন। ইরান-সমর্থিত হুথি গোষ্ঠী ও সৌদি আরবের মধ্যে সাম্প্রতিক উত্তেজনা দ্রুত বাড়তে থাকায় দেশটিতে পূর্ণমাত্রার যুদ্ধ ফিরে আসার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, শুধু ইয়েমেন নয়, এই উত্তেজনা মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা, জ্বালানি সরবরাহ এবং বৈশ্বিক অর্থনীতিতেও নতুন অনিশ্চয়তা সৃষ্টি করতে পারে।
দীর্ঘ অচলাবস্থার পর নতুন উত্তেজনা
২০২২ সালের যুদ্ধবিরতির পর ইয়েমেনে বড় ধরনের লড়াই অনেকটাই থেমে গেলেও রাজনৈতিক সমাধান এগোয়নি। হুথিরা উত্তর ইয়েমেনের বিস্তীর্ণ এলাকা নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রেখে আরও রাজনৈতিক ক্ষমতা এবং দেশের তেল আয়ের ওপর প্রভাব প্রতিষ্ঠা করতে চায়। অন্যদিকে, সৌদি আরব দীর্ঘ ও ব্যয়বহুল যুদ্ধের অভিজ্ঞতার কারণে আরেকটি সংঘাতে জড়াতে অনাগ্রহী ছিল। কিন্তু সাম্প্রতিক আঞ্চলিক পরিস্থিতি সেই ভারসাম্য ভেঙে দিয়েছে।
ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সংঘাতের প্রভাব

বিশ্লেষকদের মতে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের সংঘাত নতুন করে পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। এই উত্তেজনার মধ্যেই হুথিরা সৌদি আরবের দিকে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালানো শুরু করে। একই সঙ্গে লোহিত সাগরে চলাচলকারী জাহাজও তাদের হামলার লক্ষ্যবস্তু হয়েছে। এর জবাবে বহু বছর পর আবারও হুথি নিয়ন্ত্রিত এলাকায় বিমান হামলা চালায় সৌদি-সমর্থিত বাহিনী। এতে যুদ্ধ আবারও ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা বেড়েছে।
সৌদির জন্য কঠিন বাস্তবতা
বর্তমান পরিস্থিতিতে সৌদি আরবকে অত্যন্ত সতর্কভাবে পদক্ষেপ নিতে হচ্ছে। হরমুজ প্রণালিতে জটিলতা তৈরি হওয়ায় দেশটি এখন লোহিত সাগরপথে তেল রপ্তানির ওপর অনেক বেশি নির্ভরশীল। সেই পথেই যদি হুথিরা হামলা অব্যাহত রাখে, তবে সৌদির অর্থনীতি এবং আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজার বড় ধরনের চাপের মুখে পড়তে পারে। বিশেষজ্ঞদের মতে, অতিরিক্ত কঠোর প্রতিক্রিয়া নতুন যুদ্ধ ডেকে আনতে পারে, আবার নীরব থাকলেও হুথিদের আরও সাহস জোগাতে পারে।
তেল আয় ও রাজনৈতিক স্বীকৃতির লড়াই
২০২৩ সালে জাতিসংঘের মধ্যস্থতায় একটি শান্তি কাঠামো নিয়ে আলোচনা এগিয়েছিল। সেই পরিকল্পনার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ছিল হুথি-নিয়ন্ত্রিত অঞ্চলের সরকারি কর্মচারীদের বেতন পরিশোধ, যার অর্থের বড় অংশ আসার কথা ছিল ইয়েমেনের তেল আয় থেকে। কিন্তু গাজা যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর পুরো শান্তি প্রক্রিয়া থেমে যায়। এরপর থেকেই হুথিরা আবারও নিজেদের দাবি আদায়ে আরও কঠোর অবস্থান নিতে শুরু করে।
আকাশপথ ও সমুদ্রপথ নিয়েও বিরোধ

সম্প্রতি হুথিরা সানায় ইরানি বিমানের অবতরণের ওপর থাকা বিধিনিষেধ তুলে নেওয়ার দাবি জানায়। এ নিয়ে উভয় পক্ষের মধ্যে উত্তেজনা আরও বাড়ে। পরে লোহিত সাগরে সৌদি জাহাজ চলাচলের বিরুদ্ধেও অবরোধ ঘোষণা করে হুথিরা। এরপর থেকে উভয় পক্ষই একে অপরের বিরুদ্ধে হামলার দাবি করছে।
সবচেয়ে বেশি ভুগছেন সাধারণ মানুষ
রাজনৈতিক ও সামরিক এই টানাপোড়েনের সবচেয়ে বড় মূল্য দিচ্ছেন সাধারণ ইয়েমেনিরা। দীর্ঘদিনের যুদ্ধ, দারিদ্র্য, খাদ্যসংকট ও অর্থনৈতিক দুরবস্থায় অনেক মানুষের জীবন চরম অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়েছে। অনেকে মনে করছেন, দীর্ঘ অচলাবস্থার চেয়ে একটি স্পষ্ট সমাধান—তা আলোচনার মাধ্যমেই হোক বা সংঘাতের মাধ্যমে—তাদের ভবিষ্যৎ নির্ধারণে অন্তত একটি পথ খুলে দিতে পারে।
সামনে কী হতে পারে
পরিস্থিতি এখন কোন দিকে যাবে, তা অনেকটাই নির্ভর করছে আঞ্চলিক শক্তিগুলোর সিদ্ধান্তের ওপর। কূটনৈতিক প্রচেষ্টা সফল না হলে ইয়েমেনে আবারও বড় আকারের যুদ্ধ শুরু হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এমনটি হলে শুধু ইয়েমেন নয়, পুরো মধ্যপ্রাচ্যের স্থিতিশীলতা, আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজার এবং বৈশ্বিক বাণিজ্যও নতুন করে বড় ধরনের ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে।
ইয়েমেনে আবারও যুদ্ধের শঙ্কা; হুথি-সৌদি উত্তেজনায় মধ্যপ্রাচ্যে নতুন সংকটের আশঙ্কা।





















