চীনের দ্রুত উত্থানকে ঘিরে পশ্চিমা বিশ্বে বহু আলোচনা হলেও, দেশটির রাজনৈতিক দর্শন ও শাসনব্যবস্থার নিজস্ব ব্যাখ্যাকে গুরুত্ব দিয়ে পড়ার প্রবণতা এখনও সীমিত। এক ফরাসি লেখক ও উদ্যোক্তার মতে, এই কারণেই পশ্চিম এখনো চীনের উত্থানের প্রকৃত ভিত্তি অনুধাবন করতে পারেনি। তিনি শি জিনপিংয়ের গ্রন্থ Xi Jinping: The Governance of China-এর পঞ্চম খণ্ড পর্যালোচনা করে যুক্তি তুলে ধরেছেন যে, চীনকে বুঝতে হলে প্রথমে জানতে হবে দেশটি নিজেকে কীভাবে ব্যাখ্যা করে।
চীনা রাষ্ট্রব্যবস্থার ভেতরের ভাষা
লেখকের ভাষ্য অনুযায়ী, বইটি কোনো আত্মজীবনী বা রাজনৈতিক তত্ত্বের পাঠ্য নয়। এতে ২০২২ সালের মে থেকে ২০২৪ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত বিভিন্ন উপলক্ষে শি জিনপিংয়ের দেওয়া ভাষণ সংকলিত হয়েছে। এসব ভাষণ বিদেশি পাঠকদের উদ্দেশে নয়, বরং চীনের নীতিনির্ধারক ও কর্মকর্তাদের জন্য। ফলে এতে রাষ্ট্র পরিচালনার অভ্যন্তরীণ ধারণা, রাজনৈতিক দর্শন এবং উন্নয়নের দৃষ্টিভঙ্গি সরাসরি প্রতিফলিত হয়েছে।
চীনা আধুনিকায়নের নিজস্ব পথ
বইটির অন্যতম প্রধান বিষয় ‘চীনা আধুনিকায়ন’। এতে শি জিনপিং ব্যাখ্যা করেছেন, চীনের আধুনিকায়নের লক্ষ্য কেবল অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি নয়; বরং জাতীয় পুনর্জাগরণ। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, ইতিহাসে আত্মবিচ্ছিন্নতার নীতি, সামন্ততান্ত্রিক কাঠামো এবং ব্যর্থ সংস্কার প্রচেষ্টার অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়েই চীন নিজস্ব বাস্তবতার ভিত্তিতে উন্নয়নের পথ বেছে নিয়েছে। পশ্চিমা মডেল অনুকরণ নয়, বরং দেশের ইতিহাস, সমাজ ও বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ একটি স্বতন্ত্র পথই চীনের অগ্রগতির ভিত্তি হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে।
উন্নয়নের পাঁচটি বৈশিষ্ট্য
পর্যালোচনায় বলা হয়েছে, শি জিনপিং চীনা আধুনিকায়নের পাঁচটি বৈশিষ্ট্যের কথা উল্লেখ করেছেন। এর মধ্যে রয়েছে বিপুল জনগোষ্ঠীর জন্য উন্নয়ন, সবার জন্য সমৃদ্ধি নিশ্চিত করার লক্ষ্য, বস্তুগত উন্নতির পাশাপাশি সাংস্কৃতিক ও নৈতিক বিকাশ, পরিবেশের সঙ্গে ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক এবং শান্তিপূর্ণ উন্নয়নের নীতি। তাঁর মতে, আধুনিকায়ন মানেই পশ্চিমায়ন নয়; বরং প্রতিটি দেশের নিজস্ব বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ উন্নয়নপথ থাকতে পারে।
দলের আত্মসংস্কারকে গুরুত্ব

বইটির শেষ অংশে চীনের কমিউনিস্ট পার্টির নেতৃত্ব ও আত্মসংস্কার নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে। সেখানে শি জিনপিং দলীয় আত্মতুষ্টি, অদক্ষতা, জনগণ থেকে বিচ্ছিন্নতা এবং দুর্নীতিকে বড় ঝুঁকি হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। তিনি মনে করেন, দীর্ঘমেয়াদি শাসনের সক্ষমতা ধরে রাখতে হলে দলকে নিয়মিত আত্মসমালোচনা ও আত্মসংস্কারের মধ্য দিয়ে যেতে হবে। একই সঙ্গে দুর্নীতিবিরোধী পদক্ষেপ গ্রহণের পাশাপাশি সৎ উদ্যোগ ও অনিচ্ছাকৃত ভুলের মধ্যে পার্থক্য করার প্রয়োজনীয়তার কথাও তুলে ধরা হয়েছে।
পশ্চিমের জন্য লেখকের প্রশ্ন
পর্যালোচনার শেষাংশে লেখক মন্তব্য করেন, এই বই পশ্চিমা বিশ্বের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ কিছু প্রশ্ন উত্থাপন করে। তাঁর মতে, পশ্চিমে নির্বাচন গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলেও, রাষ্ট্র পরিচালনার গুণগত মান নিশ্চিত করার জন্য আত্মসংস্কারের সুসংগঠিত ধারণা কতটা রয়েছে—সেটি নতুন করে ভাবার বিষয়। লেখকের মূল্যায়নে, বইটি এমন একটি রাজনৈতিক ব্যবস্থার প্রতিচ্ছবি, যা নিজের শক্তি ও দুর্বলতা নিয়ে ধারাবাহিকভাবে আত্মসমালোচনার চেষ্টা করে।
চীনের উত্থান নিয়ে প্রচলিত পশ্চিমা ব্যাখ্যার বাইরে গিয়ে দেশটির নিজস্ব রাজনৈতিক দর্শন, উন্নয়ন ভাবনা এবং রাষ্ট্র পরিচালনার যুক্তি বোঝার প্রয়োজনীয়তার ওপরই এই পর্যালোচনাটি জোর দিয়েছে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















