যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় সাইক্লোস্পোরা সংক্রমণের ঘটনাকে ঘিরে শুরুতে মানুষের প্রধান উদ্বেগ ছিল খাদ্য নিরাপত্তা। মানুষ জানতে চাইছিল, কীভাবে এই পরজীবী ধ্বংস করা যায়, কোন কোন খাদ্যদ্রব্য দূষিত হয়েছে এবং নিজেদের কীভাবে নিরাপদ রাখা সম্ভব। কিন্তু অল্প সময়ের মধ্যেই সেই আলোচনা সামাজিক মাধ্যমে অন্যদিকে মোড় নেয়। স্বাস্থ্যঝুঁকির বিষয়টি ছাপিয়ে আলোচনার কেন্দ্রে চলে আসে রাজনীতি এবং নানা ধরনের ষড়যন্ত্র তত্ত্ব।
অনলাইনে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে এমন দাবি যে, যুক্তরাষ্ট্রের সরকার তদন্তের ফলাফলকে প্রভাবিত করার চেষ্টা করেছে। এই বিতর্কের কেন্দ্রে রয়েছে খাদ্য উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান টেইলর ফার্মস। কারণ, প্রতিষ্ঠানটির মূল কোম্পানি চলতি বছরের মার্চ মাসে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে সমর্থনকারী একটি রাজনৈতিক তহবিলে ১০ লাখ ডলার অনুদান দিয়েছিল। পাশাপাশি প্রতিষ্ঠানটির দীর্ঘদিনের রিপাবলিকান পার্টি-সমর্থনের ইতিহাসও নতুন করে আলোচনায় আসে।
বিশ্লেষকদের তথ্য অনুযায়ী, গত এক সপ্তাহে টেইলর ফার্মসকে ঘিরে সামাজিক মাধ্যমে হওয়া আলোচনার ৬২ শতাংশেরও বেশি ছিল এই রাজনৈতিক অভিযোগ ও ষড়যন্ত্র তত্ত্বকে কেন্দ্র করে। অর্থাৎ খাদ্য নিরাপত্তার চেয়ে রাজনৈতিক ব্যাখ্যাই বেশি গুরুত্ব পেতে শুরু করে।
তবে যুক্তরাষ্ট্রের প্রশাসন এসব অভিযোগ সরাসরি অস্বীকার করেছে। দেশটির স্বাস্থ্য ও মানবসেবা বিভাগ জানিয়েছে, তাদের সিদ্ধান্তে কোনো রাজনৈতিক প্রভাব কাজ করে না। মানুষের স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কেবল বৈজ্ঞানিক তথ্যই বিবেচনায় নেওয়া হয়। কিন্তু সরকারের বিভিন্ন সময়ের পরস্পরবিরোধী বক্তব্য সাধারণ মানুষের সন্দেহ আরও বাড়িয়ে দিয়েছে বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন।
ভুল তথ্য ও গুজব নিয়ে গবেষণা করা বিশেষজ্ঞদের মতে, বর্তমানে মানুষের মধ্যে সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতি আস্থার ঘাটতি রয়েছে। সেই পরিস্থিতিতে সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া যেকোনো ষড়যন্ত্র তত্ত্ব খুব দ্রুত বিশ্বাসযোগ্যতা পেয়ে যায়। কানাডার আলবার্টা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাস্থ্যবিষয়ক ভুল তথ্য গবেষক অধ্যাপক টিমোথি কোলফিল্ড বলেন, সরকারি প্রতিষ্ঠানের ওপর মানুষের ব্যাপক অবিশ্বাসের কারণে সামাজিক মাধ্যমে অবিশ্বাস্য দ্রুতগতিতে ষড়যন্ত্রমূলক গল্প ছড়িয়ে পড়ছে।
এ বছর গ্রীষ্মে যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন অঙ্গরাজ্যে ১১ হাজারেরও বেশি নিশ্চিত বা সন্দেহভাজন সাইক্লোস্পোরা সংক্রমণের ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে। তবে প্রকৃত আক্রান্তের সংখ্যা আরও বেশি হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। কারণ এই পরজীবীর সংক্রমণের লক্ষণ অনেক সময় কয়েক দিন বা কয়েক সপ্তাহ পর প্রকাশ পায়। দূষিত খাবার ও পানির মাধ্যমে এটি মানুষের শরীরে প্রবেশ করে, ফলে সংক্রমণের প্রকৃত উৎস শনাক্ত করাও কঠিন হয়ে পড়ে।
গত ১৬ জুলাই স্বাস্থ্য কর্মকর্তারা প্রথম প্রকাশ্যে টেইলর ফার্মসের সঙ্গে এই সংক্রমণের সম্ভাব্য সম্পর্কের কথা জানান। দুই দিন পর যুক্তরাষ্ট্রের খাদ্য ও ওষুধ প্রশাসন জানায়, টেইলর ফার্মস দে মেক্সিকোতে প্রক্রিয়াজাত করা কুচি করা আইসবার্গ লেটুসে পরীক্ষায় সাইক্লোস্পোরা শনাক্ত হয়েছে। কিন্তু পরদিনই সংস্থাটি জানায়, পরীক্ষার ওই ফলাফল আসলে ভুল ছিল এবং সেটি ‘ফলস পজিটিভ’ হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে।
এরপর টেইলর ফার্মস জানায়, খাদ্য ও ওষুধ প্রশাসন তাদের কাছে দুঃখ প্রকাশ করেছে। তবে সংস্থাটি জানায়, আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো ক্ষমা চাওয়া হয়নি। একই সঙ্গে তারা দাবি করে, টেইলর ফার্মসের সঙ্গে সংক্রমণের সম্পর্ক নির্দেশ করে এমন শক্তিশালী প্রমাণ এখনও রয়েছে। এদিকে প্রতিষ্ঠানটি ২৭টি অঙ্গরাজ্যে সরবরাহ করা লেটুস স্বেচ্ছায় বাজার থেকে প্রত্যাহার করে নেয়।
এই ঘটনাপ্রবাহের মাঝেই সামাজিক মাধ্যমের ব্যবহারকারীরা জানতে পারেন, টেইলর ফার্মসের মূল কোম্পানি ট্রাম্প-সমর্থক রাজনৈতিক তহবিলে বড় অঙ্কের অনুদান দিয়েছে। পাশাপাশি প্রতিষ্ঠানটি সম্প্রতি হোয়াইট হাউসের সাবেক এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাকেও নিয়োগ দিয়েছে। আরও জানা যায়, সংক্রমণের সঙ্গে প্রতিষ্ঠানের নাম প্রকাশ্যে আসার দিনই টেইলর ফার্মসের কর্মকর্তারা হোয়াইট হাউস ও খাদ্য ও ওষুধ প্রশাসনের কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করেছিলেন এবং সেখানে নিজেদের দায়মুক্ত প্রমাণের চেষ্টা করেন।
এসব তথ্য সামনে আসার পর সামাজিক মাধ্যমে প্রমাণ ছাড়াই দাবি করা হয়, রাজনৈতিক অনুদানের বিনিময়ে প্রশাসন পরীক্ষার ফল পরিবর্তন করেছে। এমন অনেক পোস্ট কয়েক লাখ মানুষ দেখেছে। বিশ্লেষক প্রতিষ্ঠান পিকমেট্রিকস জানিয়েছে, এই গুজব ছড়ানো প্রথম দিকের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ পোস্টই স্বয়ংক্রিয় ভুয়া অ্যাকাউন্ট বা বট থেকে এসেছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
হোয়াইট হাউসের মুখপাত্র কুশ দেশাই এসব অভিযোগকে সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন বলে উল্লেখ করেছেন। তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের জনগণের স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তার সঙ্গে কোনো ধরনের আপস করার প্রশ্নই ওঠে না।
অন্যদিকে টেইলর ফার্মস সরাসরি সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া গুজবের জবাব না দিলেও জানিয়েছে, নতুন তথ্য পাওয়া গেলে তারা স্বচ্ছতার সঙ্গে তা প্রকাশ করবে। প্রতিষ্ঠানটির দাবি, ১৯ জুলাই পর্যন্ত তাদের পরীক্ষিত কোনো নমুনাতেই সাইক্লোস্পোরা নিশ্চিতভাবে শনাক্ত হয়নি।
এদিকে বিজ্ঞানীরা বলছেন, সাইক্লোস্পোরা শনাক্ত করার পরীক্ষায় ভুল ফল আসা অস্বাভাবিক নয়। তাদের মতে, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে যুক্তরাষ্ট্রে জনস্বাস্থ্য পর্যবেক্ষণ কর্মসূচিতে বাজেট কমে যাওয়া, অর্থসংকট এবং অঙ্গরাজ্য ও স্থানীয় পর্যায়ে জনবল ঘাটতির কারণে এই ধরনের পরীক্ষা ও তদন্ত আরও জটিল হয়ে উঠেছে। ফলে একটি বড় জনস্বাস্থ্য সংকটের মধ্যেও ভুল তথ্য, রাজনৈতিক বিতর্ক এবং মানুষের অবিশ্বাস একসঙ্গে পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















