এশিয়ার বহু দেশে দীর্ঘদিন ধরে সাধারণ মানুষের ভরসা ছিল সস্তা পথের খাবার। দক্ষিণ কোরিয়ার নুডলস, ভারতের সামোসা, থাইল্যান্ডের সোম তাম কিংবা ইন্দোনেশিয়ার গাদো-গাদো—এসব খাবার কম দামে পেট ভরানোর অন্যতম সহজ উপায় হিসেবে পরিচিত। কিন্তু ইরানকে কেন্দ্র করে চলমান যুদ্ধের অর্থনৈতিক প্রভাব এখন সেই চিত্র বদলে দিয়েছে। যুদ্ধের কারণে জ্বালানির দাম বেড়েছে, কাঁচামালের মূল্য অস্বাভাবিকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে, পর্যটক কমে গেছে এবং মূল্যস্ফীতির চাপ বেড়েছে। ফলে পথের খাবারের বিক্রেতারা যেমন ব্যবসা টিকিয়ে রাখতে হিমশিম খাচ্ছেন, তেমনি সাধারণ ক্রেতারাও আগের মতো সহজে এসব খাবার কিনতে পারছেন না।
বিশেষজ্ঞদের মতে, মধ্যপ্রাচ্য থেকে জ্বালানি আমদানির ওপর এশিয়ার অধিকাংশ দেশের বড় ধরনের নির্ভরতা রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে হওয়া প্রাথমিক যুদ্ধবিরতি ভেঙে পড়ার পর নতুন করে সংঘাত শুরু হলে এর প্রভাব দ্রুত বিশ্ববাজারে ছড়িয়ে পড়ে। ফেব্রুয়ারি থেকে শুরু হওয়া এই পরিস্থিতির ফলে জ্বালানির পাশাপাশি খাদ্য উৎপাদন ও পরিবহন ব্যয়ও উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যায়। এর সরাসরি প্রভাব পড়েছে এশিয়ার ছোট ব্যবসায়ী ও নিম্ন আয়ের মানুষের জীবনে।
দক্ষিণ কোরিয়ায় নুডলসের দাম নতুন সীমা ছুঁয়েছে

দক্ষিণ কোরিয়ার রাজধানী সিউলে বহু বছর ধরে কিম মুন-জুং নামের এক রেস্তোরাঁ মালিক হাতে কাটা ঐতিহ্যবাহী নুডলসের এক বাটি বিক্রি করতেন ৯ হাজার ওনে। কিন্তু একের পর এক কাঁচামালের দাম বাড়তে থাকায় তিনি আগামী কয়েক মাসের মধ্যে দাম বাড়িয়ে অন্তত ১০ হাজার ওন করার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।
চলতি বছরের মার্চে দেশটির ভোক্তা সংস্থা জানায়, সিউলে এক বাটি নুডলসের গড় দাম প্রথমবারের মতো ১০ হাজার ওনের সীমা অতিক্রম করেছে। এটি শুধু দামের বৃদ্ধি নয়, সাধারণ মানুষের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ মানসিক ধাক্কাও হয়ে দাঁড়ায়। এরপর সাশ্রয়ী মূল্যের খাবার খুঁজতে অনেক বাসিন্দা মিলে এমন একটি মানচিত্র তৈরি করেন, যেখানে ১০ হাজার ওনের কম দামে খাবার পাওয়া যায় এমন রেস্তোরাঁর তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছে।
৫৯ বছর বয়সী কিম মুন-জুং বলেন, এমন কোনো উপকরণ নেই যার দাম বাড়েনি। তবে তিনি মনে করেন, ক্রেতারা পরিস্থিতি বুঝতে পারছেন বলেই দাম বাড়ালেও তারা বিক্রেতাদের দোষ দিচ্ছেন না।
ভারতে সামোসা বিক্রি করেও লাভ থাকছে না
ভারতের উত্তর প্রদেশের লখনউ শহর দীর্ঘদিন ধরে তার সমৃদ্ধ পথের খাবারের জন্য পরিচিত। কিন্তু সেখানকার সামোসা বিক্রেতা শুভম যাদব এখন বলছেন, ব্যবসা চালিয়েও প্রায় কোনো লাভ থাকছে না।

২৯ বছর বয়সী এই ব্যবসায়ী জানান, যে গ্যাস সিলিন্ডার দিয়ে তিনি সামোসা ভাজেন, তার দাম দ্বিগুণ হয়ে ৩ হাজার ৬০০ রুপিতে পৌঁছেছে। ভারত তার তরল গ্যাসের প্রায় ৬০ শতাংশ আমদানি করে, যার বড় অংশই হরমুজ প্রণালি দিয়ে আসে। যুদ্ধের কারণে ওই নৌপথে সরবরাহ ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হওয়ায় জ্বালানির দাম দ্রুত বেড়েছে।
তিনি বলেন, গ্যাসের দাম যতটা বেড়েছে, ততটা বাড়িয়ে সামোসার দাম নেওয়া সম্ভব নয়। তাই বাধ্য হয়ে প্রতিটি সামোসার দাম সামান্য বাড়িয়েছেন। কিন্তু এতেও লাভের পরিমাণ খুব কমে গেছে। ভবিষ্যতে আরও দাম বাড়াতে হতে পারে বলে তিনি আশঙ্কা করছেন। তবে ক্রেতারা তখনও সামোসা কিনবেন কি না, সেটিই এখন তার সবচেয়ে বড় চিন্তা।
থাইল্যান্ডে ক্রেতার অপেক্ষায় বসে থাকেন বিক্রেতারা
ব্যাংককের সোম তাম বিক্রেতা সুপাতরা রুয়ামথট গত ২০ বছর ধরে সবুজ পেঁপের সালাদ বিক্রি করছেন। যুদ্ধ শুরুর আগে প্রতিদিন সকালে দোকান খোলার আগেই তার কাছে অর্ডার আসতে শুরু করত। দুপুরের সময় অনেক ক্রেতাকে আধা ঘণ্টা পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হতো।
এখন সেই দৃশ্য পুরোপুরি বদলে গেছে। তিনি বলেন, আগে মানুষ তার জন্য অপেক্ষা করত, আর এখন তাকে বসে বসে ক্রেতার অপেক্ষা করতে হয়। ব্যবসা খুবই ধীর হয়ে গেছে।

তার কাঁচামালের খরচ প্রায় ৩০ শতাংশ বেড়ে গেলেও তিনি খাবারের দাম বাড়াননি। কারণ দাম বাড়ালে আরও বেশি ক্রেতা হারানোর আশঙ্কা রয়েছে। তিনি বলেন, বর্তমান দামেও ক্রেতা কমে যাচ্ছে। মানুষ এখন অত্যন্ত হিসাব করে খরচ করছে, কারণ প্রায় সব পণ্যের দাম বেড়ে গেছে।
আগে যেখানে প্রতিদিন ভালো আয় হতো, এখন তার দৈনিক লাভ অর্ধেকেরও কমে প্রায় এক হাজার বাতের মধ্যে নেমে এসেছে। তিনি জানান, অন্য পথের খাবার বিক্রেতাদের অবস্থাও প্রায় একই রকম।
ইন্দোনেশিয়ায় টিকে থাকাই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ
ইন্দোনেশিয়ার রাজধানী জাকার্তায় প্রায় তিন দশক ধরে গাদো-গাদো বিক্রি করছেন রিদাহ। তিনি বলেন, দাম না বাড়ালে তার পক্ষে ব্যবসা চালিয়ে যাওয়া সম্ভব ছিল না।
তার মতে, চিনাবাদাম থেকে শুরু করে প্লাস্টিকের ব্যাগ—প্রায় সব কিছুর দাম বেড়ে গেছে। যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর তার লাভ অর্ধেকেরও বেশি কমে গেছে। এমনকি করোনা মহামারির সময়ও ব্যবসার অবস্থা এতটা খারাপ ছিল না। তখন অন্তত কিছু ক্রেতা আসতেন। এখন অনেক সময় কেউই খাবার কিনতে আসেন না।

বাধ্য হয়ে তিনি তার প্রতিটি খাবারের দাম এক হাজার রুপিয়া বাড়িয়ে ১৮ হাজার রুপিয়া করেছেন। তবুও ভবিষ্যৎ নিয়ে তিনি উদ্বিগ্ন। তার ভাষায়, এই ব্যবসাই তার একমাত্র জীবিকার উৎস। তাই যত কঠিনই হোক, টিকে থাকার জন্য লড়াই চালিয়ে যেতে হবে।
যুদ্ধের অভিঘাত সাধারণ মানুষের খাবারের থালায়
এশিয়ার বিভিন্ন দেশের অভিজ্ঞতা দেখাচ্ছে, যুদ্ধের প্রভাব শুধু যুদ্ধক্ষেত্রেই সীমাবদ্ধ থাকে না। হাজার হাজার কিলোমিটার দূরের মানুষও এর অর্থনৈতিক চাপ বহন করতে বাধ্য হন। জ্বালানির দাম বাড়লে পরিবহন ব্যয় বাড়ে, উৎপাদন খরচ বেড়ে যায়, খাদ্যের দাম বাড়ে এবং শেষ পর্যন্ত সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হন ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী ও নিম্ন আয়ের মানুষ।
যে পথের খাবার একসময় ছিল সাধারণ মানুষের সাশ্রয়ী ভরসা, সেটিও এখন অনেকের নাগালের বাইরে চলে যাচ্ছে। বিক্রেতারা লাভ কমিয়ে ব্যবসা টিকিয়ে রাখার চেষ্টা করছেন, আর ক্রেতারা প্রতিদিনের খরচ কমানোর জন্য খাবার কেনার ক্ষেত্রেও কঠিন হিসাব কষছেন। যুদ্ধের এই অর্থনৈতিক অভিঘাত এশিয়ার কোটি কোটি মানুষের দৈনন্দিন জীবনে নতুন অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















