চীনের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা শিল্পের এক অদ্ভুত বাস্তবতার গল্প। একদিকে বিশ্বের সেরা প্রযুক্তির সঙ্গে পাল্লা দিয়ে এগিয়ে চলেছে চীনের এআই প্রতিষ্ঠানগুলো, অন্যদিকে সেই সাফল্যের আড়ালে জমছে বিপুল আর্থিক ক্ষতি। নতুন নতুন মডেল তৈরি হচ্ছে, আন্তর্জাতিক প্রযুক্তি জগতে প্রশংসা মিলছে, ব্যবহারকারীর সংখ্যা বাড়ছে—তবু লাভের মুখ দেখা যাচ্ছে না। বরং উন্নত প্রযুক্তি ধরে রাখতে প্রতিনিয়ত বাড়ছে ব্যয়, আর সেই ব্যয়ের ভারই এখন চীনের প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোর সবচেয়ে বড় উদ্বেগ।
চীনের শীর্ষ প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলো গত কয়েক বছরে এমন সব কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা মডেল উন্মুক্ত করেছে, যেগুলোর সক্ষমতা বিশ্বের সেরা এআই ব্যবস্থার কাছাকাছি পৌঁছে গেছে। প্রযুক্তিগত উৎকর্ষের দিক থেকে তারা দ্রুত অগ্রসর হলেও ব্যবসায়িক বাস্তবতা তাদের জন্য অনেক কঠিন। কারণ আধুনিক এআই প্রযুক্তি তৈরি করা যেমন ব্যয়বহুল, তেমনি সেটিকে সচল রাখা আরও বেশি ব্যয়সাপেক্ষ।

এই পরিস্থিতির একটি উল্লেখযোগ্য উদাহরণ হলো চীনের এআই স্টার্টআপ জেড.এআই। কম খরচে শক্তিশালী এআই মডেল সরবরাহ করে প্রতিষ্ঠানটি যুক্তরাষ্ট্রের সিলিকন ভ্যালির বহু সফটওয়্যার নির্মাতার দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। গত বছরে তাদের আয় দ্বিগুণেরও বেশি বেড়েছে। কিন্তু এত সাফল্যের পরও প্রতিষ্ঠানটি প্রায় ৭০ কোটি মার্কিন ডলার লোকসান গুনেছে। অর্থাৎ ব্যবহারকারী বেড়েছে, জনপ্রিয়তাও বেড়েছে, কিন্তু মুনাফা আসেনি।
এই সংকট কাটাতে চীনের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ভিন্ন ভিন্ন কৌশল গ্রহণ করছে। ডিপসিক ও মুনশট এআইয়ের মতো নতুন কোম্পানিগুলো বিনিয়োগকারীদের কাছ থেকে শত শত কোটি ডলার সংগ্রহ করেছে। অন্যদিকে আলিবাবা তাদের উন্নত এআই মডেল ব্যবহারের জন্য অর্থ নেওয়া শুরু করেছে। টিকটকের মূল প্রতিষ্ঠান বাইটড্যান্সও ধাপে ধাপে মূল্য নির্ধারণের ব্যবস্থা চালু করেছে, যাতে উন্নত সুবিধা পেতে ব্যবহারকারীরা বেশি অর্থ ব্যয় করেন।
কিন্তু এই কৌশলও সব সময় কার্যকর হচ্ছে না। কারণ চীনের বাজারে প্রতিযোগিতা অত্যন্ত তীব্র। একই ধরনের প্রযুক্তি তুলনামূলক কম দামে অন্য প্রতিষ্ঠান সরবরাহ করলে ব্যবহারকারীরা দ্রুত সেদিকে চলে যান। ব্যবসা প্রতিষ্ঠান থেকে সাধারণ মানুষ—প্রায় সবাই কম খরচে উন্নত প্রযুক্তি ব্যবহারের সুযোগ খোঁজেন। ফলে দাম বাড়ানোর চেষ্টা অনেক ক্ষেত্রেই গ্রাহক হারানোর ঝুঁকি তৈরি করছে।

আধুনিক এআই মডেল তৈরির পেছনে সবচেয়ে বড় ব্যয় হয় উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন কম্পিউটার চিপ কেনার ক্ষেত্রে। শুধু মডেল তৈরি করলেই হয় না, সেটিকে আরও উন্নত করা, পরীক্ষা করা এবং বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তের ব্যবহারকারীদের জন্য নিরবচ্ছিন্নভাবে চালু রাখতে আরও বিপুল সংখ্যক চিপের প্রয়োজন হয়। পাশাপাশি বিশাল ডেটা সেন্টার নির্মাণ বা ভাড়া নেওয়ার খরচও বহন করতে হয়। ফলে আয় যত বাড়ছে, ব্যয়ও তার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে।
তবে এই সমস্যায় শুধু চীনের কোম্পানিগুলো নয়, যুক্তরাষ্ট্রের বড় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোও একই চাপে রয়েছে। ওপেনএআই, অ্যানথ্রপিক কিংবা গুগলের মতো প্রতিষ্ঠানগুলোও বর্তমানে এআই খাতে যত অর্থ ব্যয় করছে, সেই তুলনায় তাদের আয় এখনও অনেক কম।
তবে চীনের ক্ষেত্রে সমস্যাটি আরও জটিল। কারণ দেশটির অধিকাংশ শীর্ষ এআই মডেল উন্মুক্ত বা ওপেন সোর্স ভিত্তিক। এর ফলে নতুন প্রযুক্তি দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে এবং পুরো শিল্প খাতই একে অপরের উদ্ভাবন থেকে উপকৃত হয়। গবেষণা ও উন্নয়নের গতি বাড়লেও ব্যবসায়িক দিক থেকে এটি বড় চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে। যখন একই ধরনের প্রযুক্তি বিনা মূল্যে বা খুব কম খরচে পাওয়া যায়, তখন গ্রাহকদের কাছ থেকে বেশি অর্থ নেওয়া কঠিন হয়ে পড়ে।
সিলিকন ভ্যালিভিত্তিক ডেটাস্ট্রাটো প্রতিষ্ঠানের ভাইস প্রেসিডেন্ট রিচার্ড লিন মনে করেন, আগামী দুই থেকে তিন বছরেও বড় এআই মডেলগুলো কীভাবে নিয়মিত লাভ করবে, সেই প্রশ্নের উত্তর পাওয়া কঠিন হবে। তার মতে, বর্তমানে ব্যয় অনেক বেশি হলেও আয় এখনও পর্যাপ্ত নয়।

জেড.এআই সম্প্রতি জিএলএম-৫.২ নামে একটি নতুন মডেল উন্মুক্ত করেছে। প্রতিষ্ঠানটির দাবি, এটি অ্যানথ্রপিকের সেরা মডেলের কাছাকাছি সক্ষমতা অর্জন করেছে। তুলনামূলক কম দামের কারণে সিলিকন ভ্যালির বহু সফটওয়্যার নির্মাতা দ্রুত এটি ব্যবহার শুরু করেন। কিন্তু জনপ্রিয়তা বাড়লেও কোম্পানির লোকসান কমেনি।
হংকং শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত হওয়ার সময় জেড.এআই জানায়, তারা সংগৃহীত অর্থের বেশির ভাগই আরও উন্নত কম্পিউটার চিপ কেনার জন্য ব্যয় করবে। কিন্তু শেয়ারবাজারে আসার কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই প্রতিষ্ঠানটি জানায়, তারা অতিরিক্ত কম্পিউটিং সক্ষমতা ভাগাভাগি করার জন্য অংশীদার খুঁজছে। একই সঙ্গে ধীরগতির সেবা নিয়ে ব্যবহারকারীদের অভিযোগের জন্য ক্ষমাও চেয়েছে।
বেইজিংভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান কাউন্টারপয়েন্ট রিসার্চের প্রধান এআই বিশ্লেষক ওয়েই সান বলেন, ওপেন সোর্স প্রযুক্তি দ্রুত ব্যবহারকারী বাড়ানোর একটি শক্তিশালী উপায় হলেও এটি একা কোনো স্থায়ী ব্যবসায়িক মডেল নয়। শেয়ারবাজার থেকে অর্থ সংগ্রহ ভবিষ্যতের গবেষণায় সহায়তা করতে পারে, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে লাভজনক ব্যবসা নিশ্চিত করতে পারে না।
একই ধরনের সমস্যায় পড়েছে মুনশট এআইও। সম্প্রতি তারা কিমি কে–৩ নামে একটি নতুন মডেল প্রকাশ করে, যা কিছু ক্ষেত্রে ওপেনএআই ও অ্যানথ্রপিকের প্রযুক্তিকেও ছাড়িয়ে গেছে বলে দাবি করা হয়। কিন্তু মাত্র দুই দিনের মাথায় প্রতিষ্ঠানটি নতুন ব্যবহারকারী নেওয়া বন্ধ করতে বাধ্য হয়। কারণ পর্যাপ্ত কম্পিউটার চিপ না থাকায় তারা সবার জন্য সেবা চালু রাখতে পারেনি।
চীনের এআই শিল্পকে আরও একটি বড় বাধার মুখে পড়তে হচ্ছে যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্যিক নিষেধাজ্ঞার কারণে। উন্নতমানের কম্পিউটার চিপ কেনার ওপর দীর্ঘদিন ধরেই নানা সীমাবদ্ধতা রয়েছে। ফলে অনেক চীনা প্রতিষ্ঠান বিদেশে থাকা ডেটা সেন্টারের কম্পিউটিং শক্তি ভাড়া নিয়ে কাজ চালাচ্ছে। এতে ব্যয় আরও বেড়ে যাচ্ছে।
অন্যদিকে অর্থ সংগ্রহের ক্ষেত্রেও যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে চীনের ব্যবধান বিশাল। ডিপসিক সম্প্রতি ৭৫০ কোটি ডলার বিনিয়োগ সংগ্রহ করেছে। মুনশট পেয়েছে ২০০ কোটি ডলার। কিন্তু একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের অ্যানথ্রপিক শুধু মে মাসেই ৬ হাজার ৫০০ কোটি ডলার বিনিয়োগ সংগ্রহ করেছে। এই তুলনা থেকেই দুই দেশের আর্থিক সক্ষমতার পার্থক্য স্পষ্ট হয়ে ওঠে।

তারপরও যুক্তরাষ্ট্রের প্রযুক্তি খাতে চীনের ওপেন সোর্স কৌশল নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। অনেক মার্কিন প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান মনে করছে, কম খরচে শক্তিশালী এআই মডেল তৈরি করে চীন পুরো শিল্পের ব্যবসায়িক কাঠামোই বদলে দিতে পারে। চীনা প্রতিষ্ঠানগুলোর দাবি, দীর্ঘদিনের নিষেধাজ্ঞা তাদের কম চিপ ব্যবহার করে আরও দক্ষ প্রযুক্তি তৈরিতে বাধ্য করেছে। ফলে বেশি চিপ ও আরও বড় ডেটা সেন্টার ছাড়া উন্নত এআই তৈরি সম্ভব নয়—এই ধারণাকেও তারা চ্যালেঞ্জ জানাচ্ছে।
এদিকে যুক্তরাষ্ট্রে নতুন আরেকটি বিতর্ক শুরু হয়েছে। ওপেনএআই ও অ্যানথ্রপিকের মতো প্রতিষ্ঠান অভিযোগ করেছে, কিছু চীনা কোম্পানি তাদের এআই ব্যবস্থা থেকে তথ্য সংগ্রহ করে নিজেদের প্রযুক্তির উন্নয়নে ব্যবহার করেছে। এ কারণে যুক্তরাষ্ট্রের কিছু প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান ও বিনিয়োগকারী ওয়াশিংটনের কাছে দাবি জানাচ্ছেন, চীনের ওপেন সোর্স এআই মডেলের ওপর আরও কঠোর নিয়ন্ত্রণ আরোপ করা হোক।
বিনিয়োগ প্রতিষ্ঠান ইন্টারকানেক্টেড ক্যাপিটালের প্রতিষ্ঠাতা কেভিন জু বলেন, সিলিকন ভ্যালির বহু স্টার্টআপ নিজেদের পণ্য উন্নত করতে এবং ওপেনএআই বা অ্যানথ্রপিকের উচ্চমূল্যের সেবা এড়াতে চীনের ওপেন মডেল ব্যবহার করে। যদি ভবিষ্যতে যুক্তরাষ্ট্র এসব মডেলে প্রবেশাধিকার সীমিত করে, তাহলে চীনের এআই কোম্পানিগুলো একটি গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক বাজার এবং আয়ের বড় উৎস হারাতে পারে।
সব মিলিয়ে চীনের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা শিল্প আজ এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। প্রযুক্তিগত উদ্ভাবনে তারা দ্রুত এগিয়ে যাচ্ছে, বিশ্বজুড়ে ব্যবহারকারীও বাড়ছে। কিন্তু সেই সাফল্যকে টেকসই লাভে রূপান্তর করা এখনও সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। বিপুল বিনিয়োগ, বাড়তে থাকা অবকাঠামোগত ব্যয়, আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা এবং তীব্র মূল্য প্রতিযোগিতার মধ্যে চীনের এআই প্রতিষ্ঠানগুলোকে এখন এমন একটি ব্যবসায়িক পথ খুঁজে বের করতে হবে, যা শুধু প্রযুক্তিগত উৎকর্ষই নয়, দীর্ঘমেয়াদে আর্থিক স্থিতিশীলতাও নিশ্চিত করতে পারে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















