ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিকে লক্ষ্য করে ফেসবুকে প্রকাশিত একাধিক আপত্তিকর ভিডিওকে কেন্দ্র করে নতুন করে চাপে পড়েছে প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান মেটা। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া এসব ভিডিওর জেরে প্রতিষ্ঠানটির ভারতীয় শাখার প্রধান অরুণ শ্রীনিবাসের বিরুদ্ধে মামলা করেছে হায়দরাবাদ পুলিশ। একই সঙ্গে মেটাকে আনুষ্ঠানিক নোটিশ পাঠানোর প্রস্তুতিও চলছে বলে জানিয়েছে কর্তৃপক্ষ।
এই ঘটনা এমন এক সময়ে ঘটল, যখন অনলাইন প্ল্যাটফর্মে প্রকাশিত বিষয়বস্তুর ওপর ভারতের নজরদারি ও নিয়ন্ত্রণ আরও কঠোর হয়েছে। নতুন নিয়মে আদালত বা সরকারের নির্দেশে চিহ্নিত অবৈধ কনটেন্ট দ্রুত সরিয়ে না ফেললে প্ল্যাটফর্মগুলোর আইনি সুরক্ষা হারানোর ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।
আপত্তিকর ভিডিও ঘিরে পুলিশের পদক্ষেপ
হায়দরাবাদের সাইবার অপরাধ দমন বিভাগের কর্মকর্তারা জানান, ফেসবুকে প্রকাশিত কয়েকটি ভিডিওতে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিকে অবমাননাকরভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে বলে অভিযোগ ওঠে। এসব অভিযোগের ভিত্তিতেই মামলা নথিভুক্ত করা হয়েছে।
পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, খুব শিগগিরই মেটাকে আনুষ্ঠানিক নোটিশ পাঠানো হবে এবং প্রতিষ্ঠানটির কাছ থেকে এ বিষয়ে ব্যাখ্যা চাওয়া হবে। তবে সংবাদ প্রকাশ পর্যন্ত মেটা এ বিষয়ে কোনো আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া জানায়নি।

কেন ব্যক্তিগতভাবে নাম এল অরুণ শ্রীনিবাসের
বিশ্বের বড় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের কোনো শীর্ষ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ব্যক্তিগতভাবে মামলা হওয়া ভারতে খুবই বিরল ঘটনা। ঠিক কী কারণে অরুণ শ্রীনিবাসকে ব্যক্তিগতভাবে মামলায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে, তা এখনো পরিষ্কার নয়।
প্রযুক্তি আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, কোনো প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তাকে ব্যক্তিগতভাবে দায়ী করতে হলে সংশ্লিষ্ট বিষয়ে তাঁর সক্রিয় ভূমিকা ও পূর্বজ্ঞান থাকার প্রমাণ দেখাতে হয়। তদন্তে সেই বিষয়গুলোই গুরুত্ব পাবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
কড়া হয়েছে ভারতের নতুন নিয়ম
চলতি বছর ভারত অনলাইন কনটেন্ট নিয়ন্ত্রণে নতুন বিধান কার্যকর করেছে। আগে আদালত বা সরকারের নির্দেশে আপত্তিকর কনটেন্ট অপসারণের জন্য প্ল্যাটফর্মগুলো ৩৬ ঘণ্টা সময় পেত। এখন সেই সময়সীমা কমিয়ে মাত্র তিন ঘণ্টা করা হয়েছে।
নির্ধারিত সময়ের মধ্যে নির্দেশনা কার্যকর না হলে প্ল্যাটফর্মগুলো ব্যবহারকারীদের পোস্টের জন্য যে আইনি সুরক্ষা পেত, তা হারানোর সম্ভাবনা রয়েছে। ফলে প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর প্রশাসনিক চাপ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।
বিক্ষোভের আবহে বাড়ছে নজরদারি

ভারতে সম্প্রতি জাতীয় পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসকে কেন্দ্র করে দেশজুড়ে ব্যাপক ছাত্র আন্দোলন শুরু হয়। এক দশকেরও বেশি সময়ের মধ্যে এটিকে সবচেয়ে বড় তরুণ-নেতৃত্বাধীন আন্দোলন হিসেবে দেখা হচ্ছে। এই আন্দোলনের রাজনৈতিক প্রভাবও স্পষ্ট হয়েছে; এর জেরে দেশটির শিক্ষামন্ত্রী পদত্যাগ করেছেন।
এ সময় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রধানমন্ত্রী মোদিকে নিয়ে সমালোচনা, ব্যঙ্গ ও নানা ধরনের ভিডিও ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে। সরকার মনে করছে, এসব কনটেন্টের কিছু অংশ বিভ্রান্তিকর বা বিকৃত তথ্যের মাধ্যমে জনমত প্রভাবিত করার চেষ্টা করছে।
মেটা ও সরকারের টানাপোড়েন
মেটার সঙ্গে ভারতের সরকারের সম্পর্ক গত কয়েক বছরে একাধিকবার উত্তপ্ত হয়েছে। ফেসবুক ও ইনস্টাগ্রামে ঘৃণামূলক বক্তব্য, ভুয়া তথ্য এবং রাজনৈতিক কনটেন্ট নিয়ন্ত্রণ নিয়ে প্রতিষ্ঠানটি বারবার সমালোচনার মুখে পড়েছে।
কয়েক দিন আগেই প্রধানমন্ত্রী মোদির একটি ফেসবুক পোস্ট সাময়িকভাবে সীমিত হয়ে যাওয়ার ঘটনায় তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রণালয় মেটার কর্মকর্তাদের তলব করেছিল। পরে মেটা জানায়, সেটি অনিচ্ছাকৃত একটি প্রযুক্তিগত ত্রুটির ফল ছিল।
বিশ্বে ফেসবুক ব্যবহারকারীর সংখ্যার বিচারে ভারতই সবচেয়ে বড় বাজার। ফলে দেশটিতে মেটার কার্যক্রম এবং সরকারের সঙ্গে তাদের সম্পর্ক আন্তর্জাতিক প্রযুক্তি খাতেও বিশেষ গুরুত্ব বহন করে। নতুন এই মামলা সেই সম্পর্ককে আরও সংবেদনশীল পর্যায়ে নিয়ে যেতে পারে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















