পর্তুগালের আটলান্টিক উপকূলে নিখোঁজ হওয়া ব্রিটিশ সার্ফার অ্যারান স্ট্রংকে খুঁজে পাওয়ার আশা কার্যত শেষ হয়ে এসেছে। টানা চার দিনের অনুসন্ধানের পর দেশটির সামুদ্রিক কর্তৃপক্ষ উদ্ধার অভিযান বন্ধ ঘোষণা করেছে। ২৮ বছর বয়সী এই সার্ফারের নিখোঁজ হওয়ার ঘটনায় আন্তর্জাতিক সার্ফিং অঙ্গনে নেমে এসেছে গভীর শোকের ছায়া।
চার দিনের অনুসন্ধানেও মিলল না কোনো সন্ধান
পর্তুগালের জাতীয় সামুদ্রিক কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, সোমবার সকালে অ্যারান স্ট্রং নিখোঁজ হওয়ার পরপরই ব্যাপক অনুসন্ধান শুরু হয়। স্থল, সমুদ্র ও আকাশপথে টানা চার দিন খোঁজ চালানো হলেও তার কোনো সন্ধান পাওয়া যায়নি। বৃহস্পতিবার আনুষ্ঠানিকভাবে অনুসন্ধান কার্যক্রম বন্ধ করা হয়।
কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, স্থানীয় সময় সকাল সাড়ে ১১টার কিছু পরে দক্ষিণ পর্তুগালের মন্টে ক্লেরিগো সৈকত থেকে কারাপাতেইরার দিকে সমুদ্রপথে যাওয়ার সময় তিনি বিপদের মুখে পড়েন।
কোচকে উদ্ধার করা হলেও নিখোঁজ হন অ্যারান
অ্যারানের সঙ্গে ছিলেন তার দীর্ঘদিনের কোচ জোসে মারিয়া পিররাইত। তিনি জানান, কিছুক্ষণ বিরতি নিয়ে পানি পান ও ছবি তোলার পর তারা আবার যাত্রা শুরু করেন। শুরুতে অ্যারান এগিয়ে থাকলেও পরে তিনি সামনে চলে যান।
কিছুক্ষণ পর অপেক্ষা করতে গিয়ে তিনি দেখেন, অ্যারানের সার্ফবোর্ডটি ভেসে যাচ্ছে, কিন্তু অ্যারান কোথাও নেই। সঙ্গে সঙ্গে তিনি দ্রুত সেখানে পৌঁছে বারবার পানিতে ডুব দিয়ে খোঁজার চেষ্টা করেন। তবে গভীর পানি ও খুব কম দৃশ্যমানতার কারণে তাকে আর খুঁজে পাওয়া যায়নি।
পরে তীরে থাকা সহকর্মীদের খবর দিলে উদ্ধার অভিযান শুরু হয়। কাছাকাছি থাকা একটি মাছ ধরার নৌকা কোচকে উদ্ধার করে। এরপর আরও প্রায় আড়াই ঘণ্টা নৌকা নিয়ে অ্যারানকে খোঁজার চেষ্টা করা হয়।
‘সে ছিল আমার আরেক ছেলে’
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আবেগঘন এক বার্তায় কোচ জোসে মারিয়া পিররাইত লিখেছেন, অ্যারান মাত্র ১০ বছর বয়স থেকে তার কাছে প্রশিক্ষণ নিয়েছিল। সপ্তাহান্ত, ছুটি—অনেক সময়ই তারা একসঙ্গে কাটাতেন।
তিনি বলেন, অ্যারানের মা প্রায়ই বলতেন, বিচ্ছিন্ন পরিবারে বেড়ে ওঠা ছেলেটির কাছে তিনি যেন আরেকজন বাবা। সেই সম্পর্ক সময়ের সঙ্গে আরও গভীর হয়েছিল।
তার ভাষায়, ‘অ্যারান ছিল আমার আরেক ছেলে। শান্তিতে ঘুমাও, আমার ছেলে।’

ব্রিটিশ সার্ফিংয়ের উজ্জ্বল মুখ
অ্যারান স্ট্রং দীর্ঘ এক দশক বিশ্ব সার্ফিং প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়েছেন। টানা দুইটি বিশ্ব সার্ফিং গেমসে তিনি গ্রেট ব্রিটেনের প্রতিনিধিত্ব করেন এবং দুইবারই ব্রিটিশ প্রতিযোগীদের মধ্যে সর্বোচ্চ অবস্থান অর্জন করেন।
পর্তুগালেই তার স্থায়ী বসবাস ছিল এবং আন্তর্জাতিক সার্ফিং অঙ্গনে তিনি একজন প্রতিশ্রুতিশীল ও জনপ্রিয় প্রতিযোগী হিসেবে পরিচিত ছিলেন।
শোকে স্তব্ধ সার্ফিং বিশ্ব
গ্রেট ব্রিটেন সার্ফিং এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, অ্যারান শুধু দক্ষ সার্ফারই ছিলেন না, তিনি ছিলেন অসাধারণ একজন সতীর্থ, সম্মানিত প্রতিযোগী এবং উদার মনের মানুষ। সার্ফিংয়ের প্রতি তার ভালোবাসা ও ইতিবাচক উপস্থিতি সবার মনে দীর্ঘদিন বেঁচে থাকবে।
সংস্থাটি তার পরিবার, বন্ধু, সতীর্থ এবং প্রিয়জনদের প্রতি গভীর সমবেদনা জানিয়েছে।
এদিকে ব্রিটিশ সার্ফিং দলের পারফরম্যান্স কোচ লুক ডিলন বলেছেন, অ্যারান সবসময় হাসিমুখে কঠিন পরিস্থিতির মোকাবিলা করতেন এবং আশপাশের মানুষকে অনুপ্রাণিত করতেন।
আটবারের ব্রিটিশ জাতীয় চ্যাম্পিয়ন লুসি ক্যাম্পবেল বলেছেন, অ্যারানের হাসি সার্ফিং জগৎকে আলোকিত করত। তার এই অনুপস্থিতি সবাই গভীরভাবে অনুভব করবে।
আরেক ব্রিটিশ সার্ফিং চ্যাম্পিয়ন অ্যালিস বার্টন স্মরণ করে বলেন, বহু বছর একসঙ্গে প্রতিযোগিতা করার সময় অ্যারান সবসময় অন্যদের উৎসাহ দিতেন। মানুষের প্রতি তার আন্তরিকতা ও ইতিবাচক মনোভাব তাকে সবার কাছে প্রিয় করে তুলেছিল।
পর্তুগালের সমুদ্রে অ্যারান স্ট্রংয়ের নিখোঁজ হওয়ার ঘটনাটি শুধু একটি মর্মান্তিক দুর্ঘটনাই নয়, আন্তর্জাতিক সার্ফিং অঙ্গনের জন্যও এক অপূরণীয় ক্ষতি হিসেবে দেখা হচ্ছে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















