যুক্তরাজ্যে দায়িত্ব পালনরত অবস্থায় নিহত পুলিশ কর্মকর্তা অ্যান্ড্রু হার্পারের হত্যাকাণ্ড আবারও আলোচনায় এসেছে। এবার বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে হত্যাকাণ্ডে দোষী সাব্যস্ত দুই ব্যক্তির সম্ভাব্য আগাম মুক্তি। এ সিদ্ধান্ত ঠেকাতে আইনি পদক্ষেপে যোগ দেওয়ার বিষয়টি বিবেচনা করছেন থেমস ভ্যালি পুলিশের প্রধান কর্মকর্তা জেসন হগ।
তিনি জানিয়েছেন, এ বিষয়ে ইংল্যান্ড ও ওয়েলসের পুলিশ ফেডারেশনের সঙ্গে আলোচনা চলছে। তাঁর ভাষায়, অভিযুক্তদের আগাম মুক্তির সম্ভাবনা নিয়ে জনমতের প্রতিক্রিয়া অত্যন্ত তীব্র এবং অধিকাংশ মানুষ এর বিরোধিতা করছেন।
২০১৯ সালের মর্মান্তিক ঘটনা
২০১৯ সালে বার্কশায়ারে একটি চার চাকার মোটরযান চুরির ঘটনায় জড়িত তিন কিশোর পালিয়ে যাওয়ার সময় পুলিশ কর্মকর্তা অ্যান্ড্রু হার্পার একটি গাড়ির সঙ্গে টেনে নিয়ে যাওয়া হলে ঘটনাস্থলেই প্রাণ হারান। ঘটনাটি দেশজুড়ে ব্যাপক শোক ও ক্ষোভের সৃষ্টি করেছিল।

ঘটনার পর গাড়ির চালক হেনরি লংকে ১৬ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়। অন্যদিকে গাড়ির দুই আরোহী জেসি কোল ও অ্যালবার্ট বাওয়ার্সকে ২০২০ সালে অনিচ্ছাকৃত হত্যার দায়ে ১৩ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়। বর্তমান আইনের আওতায় তারা সাজা অর্ধেক ভোগ করার পর আগাম মুক্তির আবেদন করতে পারবেন।
কেন তৈরি হয়েছে বিতর্ক?
বর্তমান নীতিমালা অনুযায়ী হত্যা, ধর্ষণ, শিশু যৌন নির্যাতন এবং এ ধরনের গুরুতর অপরাধে দণ্ডিতরা আগাম মুক্তির সুযোগ পাবেন না। তবে অনিচ্ছাকৃত হত্যার মামলায় দণ্ডিতরা এখনও সেই সুযোগের আওতায় রয়েছেন।
জেসন হগের মতে, কারাগারের ধারণক্ষমতা সংকটের বাস্তবতা তিনি বুঝতে পারেন। তবে যাঁরা অন্যের জীবন কেড়ে নিয়েছেন, তাঁদের আগাম মুক্তি দেওয়া উচিত নয়। তিনি বলেন, আইনটি অতীতের ঘটনার ক্ষেত্রে কার্যকর না হলেও এই ধরনের সিদ্ধান্ত সাধারণ মানুষের কাছে অযৌক্তিক বলে মনে হচ্ছে।
তিনি আরও জানান, পুলিশ ফেডারেশন যদি আইনি লড়াইয়ে যায়, তাহলে তিনিও প্রয়োজনীয় আইনগত পরামর্শ নিয়ে সেই উদ্যোগে যুক্ত হওয়ার বিষয়টি বিবেচনা করবেন।
পুলিশ ফেডারেশনের অবস্থান
থেমস ভ্যালি পুলিশ ফেডারেশনের শাখা প্রধান আইলিন ও’কনরও জানিয়েছেন, আইনি চ্যালেঞ্জের সম্ভাবনা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। তিনি বলেন, বিশেষজ্ঞ আইনজীবীরা যদি মনে করেন যে আদালতে এই সিদ্ধান্ত চ্যালেঞ্জ করার সুযোগ রয়েছে, তাহলে তারা সেই পথেই এগোবেন।

‘হার্পার আইন’ কেন কার্যকর হচ্ছে না?
অ্যান্ড্রু হার্পারের মৃত্যুর পর তাঁর স্ত্রী লিসির দীর্ঘ আন্দোলনের ফলে ২০২২ সালে নতুন আইন কার্যকর হয়, যা জরুরি সেবা কর্মীদের হত্যার ক্ষেত্রে বাধ্যতামূলক যাবজ্জীবন দণ্ডের বিধান করে। পাশাপাশি পুলিশ ও অন্যান্য জরুরি সেবা কর্মীদের ওপর হামলার সর্বোচ্চ শাস্তিও বাড়ানো হয়।
তবে এই আইন পূর্ববর্তী ঘটনার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয়। ফলে হার্পারের হত্যাকাণ্ডে দণ্ডিতদের ক্ষেত্রে নতুন বিধান কার্যকর হচ্ছে না।
সরকারের ব্যাখ্যা
যুক্তরাজ্যের দণ্ডবিষয়ক মন্ত্রী জেক রিচার্ডস বলেছেন, কোনো নির্দিষ্ট মামলাকে আলাদা করে আগাম মুক্তির সুযোগ বাতিল করা আইনগতভাবে সঠিক হবে না। তিনি স্পষ্ট করেন, অনিচ্ছাকৃত হত্যার অপরাধ বর্তমান সংশোধিত নীতিমালায় আগাম মুক্তি থেকে বাদ পড়েনি। ফলে ওই দুই দণ্ডিত নতুন ব্যবস্থার আওতায় থাকবেন।

এদিকে বিচার মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, কারাগারে ধারণক্ষমতার সংকট মোকাবিলায় অক্টোবর থেকে ধাপে ধাপে প্রায় পাঁচ হাজার বন্দিকে আগাম মুক্তি দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। যদিও নীতিমালায় সাম্প্রতিক সংশোধনের ফলে প্রায় এক হাজার বন্দি এই সুবিধার বাইরে থাকবেন।
সরকার আরও ঘোষণা দিয়েছে, অপরাধে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তি ও তাদের পরিবারের সহায়তায় সামনের সারির সেবাগুলো শক্তিশালী করতে অতিরিক্ত এক কোটি পাউন্ড বরাদ্দ দেওয়া হবে। এর আওতায় একটি জাতীয় সহায়তা ফোনসেবাও চালু করা হবে।
কারাগারের সংকট, অপরাধ দমনের নীতি এবং ভুক্তভোগী পরিবারের ন্যায়বিচারের প্রত্যাশার মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা নিয়ে যুক্তরাজ্যে নতুন করে রাজনৈতিক ও জনমত বিতর্ক আরও তীব্র হওয়ার ইঙ্গিত মিলছে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















