ওয়েলসের কেয়ারনারফনের তরুণী এনলির জীবন মাত্র কিশোর বয়সেই বদলে যায় ডিম্বাশয়ের ক্যানসারে। ২০২৪ সালে মাসিকের ধরন বদলে যাওয়া, তীব্র ব্যথা ও শারীরিক অসুস্থতা দেখা দিলেও শুরুতে তার সমস্যাকে গুরুতর বলে মনে করা হয়নি। পরে পরীক্ষায় ধরা পড়ে, তার ডিম্বাশয়ের ক্যানসার তৃতীয় পর্যায়ে পৌঁছে গেছে এবং তা শ্রোণি অঞ্চলের বাইরেও ছড়িয়ে পড়েছে।
ব্যথা নিয়েও চালিয়ে গেছেন কাজ
এনলি জানান, দীর্ঘদিন ধরে তিনি তীব্র ব্যথায় ভুগছিলেন। ব্যথানাশক ওষুধ খেয়ে তিনি প্রশিক্ষণরত গাড়ি মেরামতকর্মী হিসেবে কাজ চালিয়ে যাচ্ছিলেন। একপর্যায়ে ব্যথা অসহনীয় হয়ে উঠলে তিনি হাসপাতালে যান।
পরীক্ষায় প্রথমে তার শ্রোণি অঞ্চলে একটি সিস্ট রয়েছে বলে ধারণা করা হয়। তাই নিয়মিত পর্যবেক্ষণের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল। পরে হাসপাতাল থেকে আবার পরীক্ষার জন্য ডাকা হলে এনলির মনে প্রথমেই ক্যানসারের আশঙ্কা তৈরি হয়। শেষ পর্যন্ত সেই আশঙ্কাই সত্যি হয়।

ক্যানসারের কথা জানার পর সবচেয়ে বড় ধাক্কা আসে সন্তান ধারণের সক্ষমতা হারানোর সম্ভাবনার কথা শুনে। তবে একই সঙ্গে রোগের কারণ জানতে পারায় তার মধ্যে এক ধরনের স্বস্তিও তৈরি হয়েছিল। কারণ এবার অন্তত তিনি জানতেন কী হয়েছে এবং কীভাবে চিকিৎসা শুরু করতে হবে।
চিকিৎসার আগে ডিম্বাণু সংরক্ষণ
চিকিৎসা শুরুর আগে এনলির জন্য সন্তান ধারণের সম্ভাবনা ধরে রাখার উদ্যোগ নেওয়া হয়। তার সাতটি ডিম্বাণু সংরক্ষণ করা সম্ভব হয়।
এরপর তিনি কেমোথেরাপি নেন এবং ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে চিকিৎসার সেই ধাপ শেষ করেন। মাত্র এক সপ্তাহ পরই তিনি গাড়ি চালানোর পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন।
তবে চিকিৎসা শেষ হলেও এর প্রভাব এখনো তার জীবনে রয়েছে। শরীরে হঠাৎ গরম অনুভূত হওয়া, স্মৃতিশক্তি ও মনোযোগে সমস্যা, জয়েন্ট ও পেশিতে ব্যথা এবং প্রচণ্ড ক্লান্তি তাকে ভোগাচ্ছে। এসবের কোনটি মেনোপজের কারণে আর কোনটি কেমোথেরাপির পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া—তা অনেক সময় আলাদা করে বোঝাও কঠিন হয়ে পড়ে।
বয়সের কারণে রোগ শনাক্তে দেরি?
এনলির ধারণা, তার কম বয়সের কারণে শুরুতেই ডিম্বাশয়ের ক্যানসার চিকিৎসকদের সন্দেহের তালিকায় আসেনি। তবে তিনি চিকিৎসকদের দোষারোপ করতে চান না। তার মতে, এত কম বয়সে এ ধরনের ক্যানসার অত্যন্ত বিরল হওয়ায় তার ঘটনাটি থেকে ভবিষ্যতের জন্য শিক্ষা নেওয়া জরুরি।
যুক্তরাজ্যে প্রতি বছর প্রায় ১২০ জন তরুণী ডিম্বাশয়ের ক্যানসারে আক্রান্ত হন। আর কৈশোরে মেনোপজের ঘটনা আরও বিরল—প্রায় ১০ হাজার নারীর মধ্যে একজনের ক্ষেত্রে এমনটি দেখা যায়।
এনলি চান, তরুণীদের শারীরিক উপসর্গকে গুরুত্ব দিয়ে দেখা হোক। তার ভাষ্য, কোনো তরুণী যখন নিজের শরীরের পরিবর্তন বা ব্যথার কথা জানান, তখন তা উপেক্ষা না করে প্রয়োজনীয় পরীক্ষা করা দরকার। কারণ দেরিতে রোগ ধরা পড়লে চিকিৎসা আরও কঠিন হয়ে যেতে পারে।

ক্যানসারের পর বদলে গেছে জীবন
ক্যানসারের সঙ্গে লড়াই এনলির জীবনে নতুন আত্মবিশ্বাস তৈরি করেছে। এখন তিনি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে রোগ সম্পর্কে সচেতনতা তৈরি করেন এবং প্রকাশ্যে নিজের অভিজ্ঞতার কথা বলেন।
আগের তুলনায় নিজেকে অনেক বেশি আত্মবিশ্বাসী মনে করেন তিনি। অন্যদের পাশে দাঁড়ানোর ইচ্ছাও বেড়েছে। এমনকি ভবিষ্যতে নিজের পেশা পরিবর্তন করে ক্যানসার চিকিৎসাসেবায় কাজ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, যাতে একই পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যাওয়া অন্য মানুষদের সাহায্য করতে পারেন।
কেমোথেরাপির কারণে চুল পড়ে যাওয়ার পর নিজের চেহারাতেও পরিবর্তন এনেছেন তিনি। মাথা কামিয়ে ফেলেছেন এবং নতুন এই রূপকে আত্মবিশ্বাসের সঙ্গেই গ্রহণ করেছেন।
উপসর্গকে হালকাভাবে না দেখার পরামর্শ
চিকিৎসক রেবেকা টমলিনসনের মতে, এনলির ঘটনা অত্যন্ত বিরল। ডিম্বাশয়ের ক্যানসার শনাক্ত করা কঠিন হওয়ার অন্যতম কারণ হলো এর উপসর্গ অনেক সময় স্পষ্ট থাকে না।
তার মতে, পেট ফাঁপা ডিম্বাশয়ের ক্যানসারের একটি গুরুত্বপূর্ণ সতর্কসংকেত। অনেক সময় এটিকে সাধারণ হজমের সমস্যা বা অন্ত্রের সমস্যার সঙ্গে মিলিয়ে দেখা হয়। তাই দীর্ঘস্থায়ী পেট ফাঁপা বা অস্বাভাবিক শারীরিক পরিবর্তন দেখা দিলে বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে পরীক্ষা করা প্রয়োজন।

সাধারণত ডিম্বাশয়ের ক্যানসারে আক্রান্ত অধিকাংশ নারীর বয়স ৫০ বছর বা তার বেশি। তবে কিশোর-কিশোরী ও তরুণদের মধ্যেও এই রোগ দেখা যায়। যুক্তরাজ্যে প্রতি বছর ১৫ থেকে ২৪ বছর বয়সী প্রায় ১২০ জন তরুণ-তরুণী এ ধরনের ক্যানসারে আক্রান্ত হন। ওয়েলসে সংখ্যাটি প্রায় পাঁচজন।
চিকিৎসক রেবেকা টমলিনসন বলেন, রোগ দ্রুত শনাক্ত হলে কিছু ক্ষেত্রে সম্পূর্ণ জরায়ু অপসারণ ছাড়াও চিকিৎসার সুযোগ থাকতে পারে। তবে কম বয়সীদের ক্ষেত্রে কিছু ক্যানসার তুলনামূলকভাবে দ্রুত ছড়িয়ে পড়তে পারে। তাই প্রাথমিক পর্যায়ে রোগ শনাক্ত করাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
এনলির অভিজ্ঞতা তাই শুধু একটি বিরল রোগের গল্প নয়; বরং তরুণীদের অস্বাভাবিক শারীরিক উপসর্গকে গুরুত্ব দিয়ে দেখার প্রয়োজনীয়তারও একটি শক্তিশালী উদাহরণ।
মাত্র কিশোর বয়সে ক্যানসারের কারণে মেনোপজে চলে যাওয়া এনলি এখন নিজের অভিজ্ঞতাকেই অন্যদের সচেতন করার শক্তিতে পরিণত করেছেন।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















