আইনকে বোঝার একটি গুরুত্বপূর্ণ পথ হলো আদালতের ভবিষ্যৎ সিদ্ধান্ত অনুমান করার চেষ্টা। বিচারক অতীতে কী সিদ্ধান্ত দিয়েছেন, কোন পরিস্থিতিতে দিয়েছেন এবং বর্তমান মামলার সঙ্গে সেই ঘটনাগুলোর কতটা মিল রয়েছে—এসব বিবেচনা করেই অনেক ক্ষেত্রে পরবর্তী রায় নির্ধারিত হয়। বিশেষ করে কমন ল’ ব্যবস্থায় পূর্ববর্তী রায়ের গুরুত্ব এতটাই বেশি যে আইনকে এক অর্থে অতীত সিদ্ধান্তের ওপর দাঁড়িয়ে ভবিষ্যৎ সিদ্ধান্ত অনুমানের একটি কাঠামোও বলা যায়।
এই জায়গাতেই কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সঙ্গে বিচারব্যবস্থার একটি আকর্ষণীয় মিল তৈরি হয়। মেশিন লার্নিংয়ের মডেলও অতীতের বিপুল তথ্য বিশ্লেষণ করে সম্ভাব্য পরবর্তী ফলাফল নির্ধারণ করে। আদালত যেমন পূর্ববর্তী মামলার সঙ্গে বর্তমান মামলার সাদৃশ্য খোঁজে, অ্যালগরিদমও তেমনি ডেটার মধ্যে পুনরাবৃত্ত প্যাটার্ন শনাক্ত করে সিদ্ধান্তে পৌঁছায়।
কিন্তু এই মিলের ভেতরেই একটি মৌলিক পার্থক্য লুকিয়ে আছে। অতীতের তথ্য যদি পক্ষপাতদুষ্ট হয়, তাহলে সেই পক্ষপাত পরবর্তী সিদ্ধান্তেও প্রবেশ করতে পারে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ক্ষেত্রে এই ঝুঁকি এখন বহুল আলোচিত। অথচ বিচারব্যবস্থা শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে একই সমস্যার মুখোমুখি। আগের যুগের বিচারিক সিদ্ধান্তে সেই যুগের সামাজিক, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক ধারণা প্রতিফলিত হয়। পরবর্তী প্রজন্ম যখন সেসব সিদ্ধান্তকে আইনের ভিত্তি হিসেবে ব্যবহার করে, তখন পুরোনো মানসিকতার ছাপও অনেক সময় নতুন বিচারব্যবস্থায় টিকে যায়।
পাকিস্তানের বিচারব্যবস্থায় এর উদাহরণ কম নেই। স্বাধীনতার বহু বছর পরও দেশটির আইনশাস্ত্রে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক আমলের বহু সিদ্ধান্তের প্রভাব রয়ে গেছে। অথচ পাকিস্তানের বর্তমান সাংবিধানিক কাঠামো একটি স্বাধীন, প্রতিনিধিত্বশীল ও অধিকারভিত্তিক রাষ্ট্রের নীতির ওপর প্রতিষ্ঠিত। ফলে প্রশ্ন উঠতেই পারে—অতীতের সিদ্ধান্ত কি সবসময় বর্তমানের জন্য যথেষ্ট নির্ভরযোগ্য নির্দেশনা?
এখানেই বিচারকের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ক্ষমতা সামনে আসে: যুক্তি দিয়ে অতীতকে পরীক্ষা করা।
পূর্ববর্তী রায় মানেই চূড়ান্ত সত্য নয়
একটি মামলার সঙ্গে আগের কোনো মামলার মিল পাওয়া গেলেই যে একই সিদ্ধান্ত দিতে হবে, এমন নয়। বিচারকের কাজ কেবল সাদৃশ্য শনাক্ত করা নয়; সেই সাদৃশ্যের আইনি গুরুত্ব নির্ধারণ করাও তার দায়িত্ব।
বর্তমান মামলার তথ্য কি সত্যিই আগের মামলার সঙ্গে তুলনীয়? আগের সিদ্ধান্তটি যে পরিস্থিতিতে দেওয়া হয়েছিল, তা কি এখনো বিদ্যমান? পুরোনো রায়ের পেছনে যে সামাজিক বা সাংবিধানিক বাস্তবতা ছিল, তা কি বদলে গেছে? আগের সিদ্ধান্তটি বর্তমান সংবিধানের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ কি না—এসব প্রশ্ন বিচারককে বিবেচনা করতে হয়।
অর্থাৎ বিচারিক নজির একটি মানচিত্র হতে পারে, কিন্তু সেটিই পুরো পথ নয়। একজন বিচারক প্রয়োজন হলে নজির অনুসরণ করবেন, আবার প্রয়োজন হলে তার সীমা নির্ধারণ করবেন, পার্থক্য দেখাবেন কিংবা কোনো পুরোনো সিদ্ধান্তকে পুনর্বিবেচনার জন্য সামনে আনবেন। এই ক্ষমতাই বিচারিক যুক্তির প্রাণ।
এখানে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সীমাবদ্ধতা স্পষ্ট। একটি অ্যালগরিদম যদি হাজার হাজার মামলার তথ্য বিশ্লেষণ করে কোনো নির্দিষ্ট ফলাফলের সম্ভাবনা দেখায়, তবুও সেই সম্ভাবনাকে ন্যায়বিচারের চূড়ান্ত উত্তর বলা যায় না। কারণ ন্যায়বিচারের প্রশ্ন কেবল ‘আগে কী হয়েছিল’—এতে সীমাবদ্ধ নয়। কখনো কখনো গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো, ‘আগে যা হয়েছে, সেটি কি এখনো সঠিক?’
অতীতের পক্ষপাত নতুন সিদ্ধান্তে ফিরে আসতে পারে
আইন ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সাদৃশ্য সম্ভবত এখানেই। কোনো ব্যবস্থার ফলাফল তার ব্যবহৃত তথ্যের ওপর নির্ভরশীল। সেই তথ্য যদি অসম্পূর্ণ, পক্ষপাতদুষ্ট বা নির্দিষ্ট একটি ঐতিহাসিক বাস্তবতার প্রতিনিধিত্ব করে, তাহলে সেই ব্যবস্থার সিদ্ধান্তেও তার প্রতিফলন ঘটতে পারে।
বিচারব্যবস্থায় পূর্ববর্তী সিদ্ধান্তগুলো সামাজিক বাস্তবতার বাইরে তৈরি হয় না। যে সময়ে যে মূল্যবোধ প্রভাবশালী ছিল, তা বিচারিক ব্যাখ্যার মধ্যেও স্থান পেতে পারে। পরে রাষ্ট্রের সংবিধান বদলালেও কিংবা নাগরিক অধিকারের ধারণা বিস্তৃত হলেও পুরোনো নজির যদি প্রশ্নহীনভাবে অনুসরণ করা হয়, তাহলে অতীতের সীমাবদ্ধতা বর্তমানেও বহন করা সম্ভব।
২০২৩ সালে লাহোর হাইকোর্টের হারুন ফারুক বনাম ফেডারেশন অব পাকিস্তান মামলার সিদ্ধান্ত এই বিষয়টি বোঝার জন্য গুরুত্বপূর্ণ। পাকিস্তান পেনাল কোডের ১২৪-এ ধারা, যা রাষ্ট্রদ্রোহের অপরাধসংক্রান্ত বিধান হিসেবে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের সময় প্রণীত হয়েছিল, স্বাধীনতার পরও বহাল ছিল। আদালত ওই ধারাটিকে সংবিধানের ১৯ ও ১৯এ অনুচ্ছেদের সঙ্গে অসঙ্গতিপূর্ণ বলে ঘোষণা করে এবং পুরো ধারাটিকে অসাংবিধানিক হিসেবে বাতিল করে।
এই সিদ্ধান্ত দেখায়, বিচারব্যবস্থা কেবল অতীতের উত্তরাধিকার সংরক্ষণ করার প্রতিষ্ঠান নয়। প্রয়োজনে আদালত অতীতের কোনো বিধান বা বিচারিক ধারা পরীক্ষা করে দেখতে পারে সেটি বর্তমান সাংবিধানিক মূল্যবোধের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ কি না।
অতীত এখানে প্রমাণ হতে পারে, কিন্তু তার নিজের পক্ষে আত্মপক্ষ সমর্থনের ক্ষমতা নেই। সেই কাজটি করতে হয় বর্তমানের যুক্তিকে।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার জায়গা কোথায়?
এ কারণে বিচারব্যবস্থায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহার নিয়ে আলোচনাকে ‘বিচারক বনাম মেশিন’ ধরনের সরল দ্বন্দ্বে নামিয়ে আনা ঠিক হবে না। বাস্তবতা বরং অনেক বেশি জটিল।
আদালতে মামলার সংখ্যা বাড়ছে, আইনি নথির পরিমাণ বিপুল হচ্ছে এবং বিচারকদের একই সঙ্গে গবেষণা, নথি বিশ্লেষণ, মামলা ব্যবস্থাপনা ও রায় প্রস্তুতির নানা পর্যায় সামলাতে হচ্ছে। এই পরিস্থিতিতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা গুরুত্বপূর্ণ সহায়ক শক্তি হতে পারে।
পাকিস্তানের সুপ্রিম কোর্টও ইশফাক আহমেদ বনাম মুশতাক আহমেদ মামলায় বিচারিক ব্যবস্থায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সম্ভাবনাকে গুরুত্ব দিয়েছে। মামলার চাপ কমানো, বিচারিক কার্যক্রমকে দ্রুততর করা এবং ব্যবস্থাপনা উন্নত করার ক্ষেত্রে প্রযুক্তির ব্যবহার যে বাস্তব প্রয়োজন হয়ে উঠছে, তা অস্বীকার করার সুযোগ নেই।
আইনি গবেষণায় প্রাসঙ্গিক নজির খুঁজে বের করা, বিপুল নথি সংগঠিত করা, মামলার প্রাথমিক সারাংশ তৈরি করা কিংবা প্রক্রিয়াগত কাজ দ্রুত সম্পন্ন করার ক্ষেত্রে এআই বিচারকদের সময় বাঁচাতে পারে। একটি জটিল মামলায় কয়েক হাজার পৃষ্ঠার নথি থাকলে সেগুলোর মধ্যে প্রয়োজনীয় তথ্য দ্রুত শনাক্ত করার ক্ষমতা নিঃসন্দেহে বিচারিক কাজকে আরও কার্যকর করতে পারে।
কিন্তু দক্ষতা এবং বিচার এক জিনিস নয়।
একটি মেশিন কোনো সিদ্ধান্তের সম্ভাবনা নির্ণয় করতে পারে; সিদ্ধান্তটি ন্যায্য কি না, সেই প্রশ্নের নৈতিক ও সাংবিধানিক দায় তাকে দেওয়া যায় না।

পাকিস্তানের জন্য প্রয়োজন স্পষ্ট সীমারেখা
এই কারণে পাকিস্তানে বিচারব্যবস্থায় এআই ব্যবহারের জন্য ২০২৬ সালের জাতীয় নির্দেশিকাগুলো বিশেষ গুরুত্ব বহন করে। ন্যাশনাল জুডিশিয়াল অটোমেশন কমিটির প্রণয়ন এবং ন্যাশনাল জুডিশিয়াল পলিসি মেকিং কমিটির অনুমোদিত নির্দেশিকায় মূল নীতিটি স্পষ্ট—কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা মানবিক যুক্তিনির্ভর সিদ্ধান্তকে সহায়তা করবে, তার জায়গা নেবে না।
নির্দেশিকায় বিচারিক কাজে এআই ব্যবহারের চারটি ক্ষেত্র নির্ধারণ করা হয়েছে: প্রশাসনিক কার্যক্রম, আইনি গবেষণা, পূর্বাভাসভিত্তিক বিশ্লেষণ এবং বিচারিক সহায়তা। এর মধ্যে মামলার প্রাথমিক সারাংশ তৈরি, খসড়া প্রস্তুত এবং প্রমাণসংক্রান্ত উপাদান সংগঠিত করার মতো কাজও রয়েছে।
তবে প্রযুক্তি ব্যবহারের অনুমতি দেওয়ার পাশাপাশি গুরুত্বপূর্ণ সুরক্ষার কথাও বলা হয়েছে। এআই-নির্ভর প্রক্রিয়ায় মানবিক যাচাইয়ের সুযোগ থাকতে হবে। অ্যালগরিদমিক বা ডেটাভিত্তিক পক্ষপাত শনাক্ত ও নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। একই সঙ্গে মামলার গোপনীয় তথ্য, ব্যক্তিগত তথ্য এবং সাক্ষী ও পক্ষগুলোর সংবেদনশীল নথি সুরক্ষিত রাখতে হবে।
এই সতর্কতাগুলো কেবল প্রযুক্তিগত নিরাপত্তার বিষয় নয়; এগুলো বিচারিক স্বাধীনতার সঙ্গেও সরাসরি সম্পর্কিত।
যদি কোনো বিচারক কেবল একটি এআই সিস্টেমের পূর্বাভাস অনুসরণ করেন, তাহলে রায়ের প্রকৃত যুক্তির জায়গাটি কোথায় থাকবে? একজন বিচারপ্রার্থী যদি জানতে চান কেন তার বিরুদ্ধে সিদ্ধান্ত হলো, তখন ‘অ্যালগরিদম এমন বলেছে’ কোনো গ্রহণযোগ্য বিচারিক ব্যাখ্যা হতে পারে না।
রায়ের সঙ্গে কারণ থাকতে হয়। কারণের সঙ্গে যুক্তি থাকতে হয়। আর যুক্তিকে প্রশ্ন করার সুযোগ থাকতে হয়।
ভবিষ্যতের বিচারব্যবস্থা হবে সহযোগিতামূলক
তাই সামনে যে বিচারব্যবস্থা তৈরি হবে, সেখানে এআইকে বাদ দেওয়া যেমন বাস্তবসম্মত নয়, তেমনি বিচারকের জায়গায় এআই বসানোর ধারণাও বিপজ্জনক। প্রকৃত পথটি হলো মানুষের বিচারিক ক্ষমতা এবং প্রযুক্তির বিশ্লেষণাত্মক সক্ষমতার মধ্যে একটি সুস্পষ্ট দায়িত্ববণ্টন তৈরি করা।
মেশিন দ্রুত তথ্য খুঁজে দিতে পারে। সম্ভাব্য নজির শনাক্ত করতে পারে। বিশাল ডেটাসেট বিশ্লেষণ করতে পারে। পুনরাবৃত্ত কাজ কমিয়ে দিতে পারে। কিন্তু কোনো নজির বর্তমান মামলায় কতটা প্রযোজ্য, কোনো পুরোনো সিদ্ধান্ত এখনো ন্যায়সঙ্গত কি না, কিংবা একটি কঠোর আইনি বিধান সাংবিধানিক অধিকারের সঙ্গে সংঘর্ষে পড়লে কোন মূল্যবোধকে অগ্রাধিকার দেওয়া উচিত—এসব প্রশ্নে শেষ দায়িত্ব মানুষেরই।
বিচারের বিশেষত্ব কেবল সিদ্ধান্তে নয়, সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর ন্যায়সংগত প্রক্রিয়ায়। একজন বিচারককে নিজের সিদ্ধান্তের কারণ ব্যাখ্যা করতে হয়, পক্ষগুলোর যুক্তি শুনতে হয় এবং প্রয়োজন হলে প্রতিষ্ঠিত ধারণার বিরুদ্ধেও অবস্থান নিতে হয়।
এই জায়গাটিই কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার জন্য সবচেয়ে কঠিন সীমারেখা।
আইন যদি অতীতের অভিজ্ঞতা থেকে ভবিষ্যৎ অনুমানের একটি ব্যবস্থা হয়, তাহলে এআই সেই অনুমানকে আরও দ্রুত ও দক্ষ করতে পারে। কিন্তু বিচার কেবল অনুমান নয়। বিচার হলো কোন অতীত অনুসরণ করা উচিত, কোনটি সংশোধন করা দরকার এবং কোন পরিস্থিতিতে অতীতের পথ থেকে সরে আসা ন্যায়সংগত—সেই সিদ্ধান্ত নেওয়ার প্রক্রিয়া।
অতএব, ভবিষ্যতের আদালতে প্রশ্নটি হওয়া উচিত নয়—এআই কি বিচারককে প্রতিস্থাপন করবে? বরং প্রশ্ন হওয়া উচিত—কীভাবে এআইকে এমনভাবে ব্যবহার করা যায়, যাতে বিচারক আরও ভালোভাবে যুক্তি প্রয়োগ করতে পারেন, কিন্তু যুক্তির দায়িত্ব কখনো মেশিনের হাতে চলে না যায়।
শেষ পর্যন্ত আদালতের কর্তৃত্ব কোনো ডেটাসেট থেকে আসে না। তা আসে ন্যায়বিচারের দায়িত্ব গ্রহণ, কারণ ব্যাখ্যা এবং নিজের সিদ্ধান্তের জন্য জবাবদিহি করার সক্ষমতা থেকে। প্রযুক্তি বিচারকের চোখকে আরও তীক্ষ্ণ করতে পারে; কিন্তু বিচার করার দায়িত্বটি মানুষেরই থাকতে হবে।
মুহাম্মদ জুবায়ের 



















