দীর্ঘ ২৫ বছর ধরে ‘দ্য কিলার্স’-এর প্রধান গায়ক হিসেবে বিশ্বজুড়ে খ্যাতি পেয়েছেন ব্র্যান্ডন ফ্লাওয়ার্স। ‘মিস্টার ব্রাইটসাইড’, ‘হোয়েন ইউ ওয়্যার ইয়াং’ ও ‘হিউম্যান’-এর মতো জনপ্রিয় গানের মাধ্যমে তিনি রক সংগীতের অন্যতম পরিচিত মুখে পরিণত হয়েছেন। কিন্তু জীবনের এই পর্যায়ে এসে খ্যাতি, অর্থ ও সাফল্য আদৌ কতটা মূল্যবান—সেই প্রশ্নই এখন তাকে ভাবাচ্ছে।
সম্প্রতি নিজের নতুন একক অ্যালবাম নিয়ে কথা বলতে গিয়ে ফ্লাওয়ার্স স্বীকার করেছেন, জীবনের অনেকটা সময় তিনি খ্যাতির পেছনে ছুটেছেন। কিন্তু এখন তিনি আর নিশ্চিত নন, এই সাফল্য তাকে সত্যিকার অর্থে কতটা সুখী করেছে।
রকের তারকার মনে কান্ট্রি সংগীতের টান
ফ্লাওয়ার্সের সংগীতজীবনের শুরুটা রকের সঙ্গে হলেও ছোটবেলা থেকেই কান্ট্রি সংগীতের প্রতি তার গভীর আকর্ষণ ছিল। যুক্তরাষ্ট্রের ইউটাহ অঙ্গরাজ্যের ছোট শহর নেফিতে বেড়ে ওঠার সময় তার বাবা গাড়িতে জনি ক্যাশ, মার্ল হ্যাগার্ড ও জন কনলির গান শুনতেন।
নিজের শৈশবের সেই সংগীতের কাছে ফিরে গিয়ে ফ্লাওয়ার্স তৈরি করেছেন তার তৃতীয় একক অ্যালবাম ‘থ্র্যাশার’। অ্যালবামটি ন্যাশভিলের বিখ্যাত আরসিএ স্টুডিওতে মাত্র তিন সপ্তাহে রেকর্ড করা হয়েছে।
অ্যালবামে প্রবীণ ও অভিজ্ঞ সংগীতশিল্পীদের সঙ্গে সরাসরি গান রেকর্ড করেছেন তিনি। তার ভাষায়, এভাবে একই সময়ে সবাই মিলে গান ধারণ করার মধ্যে আলাদা এক আবেগ রয়েছে, যা বর্তমান সময়ে খুব বেশি দেখা যায় না।
এবার নিজের জীবনকেই গানের বিষয় করেছেন
বিশের কোঠায় থাকাকালে ফ্লাওয়ার্স মনে করতেন, তার জীবনে এমন কিছু ঘটেনি যা গানের কথা হয়ে উঠতে পারে। বয়স বাড়ার সঙ্গে সেই ধারণা বদলেছে।
এখন তিনি নিজের পুরোনো দিনলিপি ঘেঁটে শৈশব, গ্রামীণ পরিবেশ এবং লাস ভেগাসের ক্যাসিনোতে কাজ করার অভিজ্ঞতা থেকে গানের কথা লিখছেন। অ্যালবামে রয়েছে কয়েক বছর আগে আকস্মিকভাবে মারা যাওয়া তার ভগ্নিপতির প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদনও।
নিজের জন্মশহরে মাদকনির্ভরতার ভয়াবহ প্রভাব নিয়েও লিখেছেন তিনি। তার মতে, অতিরিক্ত ওষুধনির্ভরতা ছোট শহরটির বহু পরিবারের জীবনকে ধ্বংস করেছে।
‘আমেরিকান ড্রিম’-এ নিজের সাফল্য নিয়েই প্রশ্ন
অ্যালবামের ‘আমেরিকান ড্রিম’ গানটিতে ফ্লাওয়ার্স কল্পনা করেছেন, তিনি যেন এলভিস প্রিসলির সঙ্গে দেখা করছেন। সেখানে তিনি জানতে চান, খ্যাতি ও অর্থ আসলে যতটা আকর্ষণীয় বলে মনে হয়, সত্যিই কি ততটা মূল্যবান?
এই প্রশ্নটি অবশ্য শুধু গানের বিষয় নয়। নিজের জীবন নিয়েও একই প্রশ্ন করছেন ফ্লাওয়ার্স।
তিনি ভাবছেন, এত বছর ধরে তিনি আসলে কী অর্জন করতে চেয়েছেন, কাকে কিছু প্রমাণ করতে চেয়েছেন এবং সেই সাফল্য থেকে শেষ পর্যন্ত কী পেয়েছেন।
এই উপলব্ধির পেছনে তার তিন কিশোর ছেলের কথাও রয়েছে। নিজের সাফল্যের সঙ্গে যেন ছেলেরা নিজেদের জীবনকে তুলনা না করে, সেটিই তার উদ্বেগ।
বাবার জীবন দেখে নতুন উপলব্ধি
ফ্লাওয়ার্সের বাবা তার মতো খ্যাতিমান নন। বছরে সামান্য আয় করে সংসার চালিয়েছেন। কিন্তু ৮২ বছর বয়সেও তিনি ছবি আঁকেন, পুরোনো জিনিসের বাজারে ঘোরেন এবং নিজের ছোট ছোট আনন্দ নিয়ে উচ্ছ্বসিত থাকেন।
সেখান থেকেই ফ্লাওয়ার্সের উপলব্ধি—বেশি অর্থ বা খ্যাতি থাকলেই যে মানুষ বেশি সুখী হবে, তার কোনো নিশ্চয়তা নেই।
তিনি বলেন, তার বাবা হয়তো তার চেয়েও বেশি সুখী। আর সেখানেই নিজের কাছে প্রশ্ন জাগে—তাহলে এত খ্যাতি ও সাফল্য অর্জন করা কি সত্যিই মূল্যবান?
পরিবার ও দাম্পত্য নিয়েও ভাবছেন
প্রায় ২১ বছরের দাম্পত্য জীবনের দিকে তাকিয়েও ফ্লাওয়ার্স নিজের জীবনকে নতুন করে মূল্যায়ন করছেন। দীর্ঘ সময় সফরে থাকার কারণে পরিবার থেকে দূরে থাকতে হয় তাকে। এতে দূরত্ব তৈরি হওয়ার আশঙ্কা থাকলেও তার মতে, মাঝে মাঝে দূরে থাকা আবার সম্পর্কের মধ্যে নতুনত্বও ফিরিয়ে আনতে পারে।
নিজের লেখা একটি পুরোনো গানের কথাও তাকে ভাবিয়েছে। সেই গানের একটি লাইন শুনে কিছু শ্রোতা নিজেদের সম্পর্ক নিয়ে নেতিবাচকভাবে ভাবতে শুরু করেছিলেন। এমনকি একজন শ্রোতা দাবি করেছিলেন, ওই গানের প্রভাবেই তার বিবাহবিচ্ছেদ হয়েছে।
বিষয়টি জানার পর ফ্লাওয়ার্স সেই ভাবনাটিকে নতুনভাবে তুলে ধরতে আরেকটি গান লিখেছেন। সেখানে তিনি বোঝাতে চেয়েছেন, পৃথিবীর অসংখ্য মানুষের ভিড়ে দুজন মানুষের একসঙ্গে জীবন কাটানোকে শুধু কাকতালীয় ঘটনা হিসেবে দেখার প্রয়োজন নেই।
‘দ্য কিলার্স’-এর ভবিষ্যৎ কী?
একক অ্যালবাম নিয়ে ব্যস্ত থাকলেও ‘দ্য কিলার্স’ ভেঙে যাচ্ছে না। দলটি আবারও নতুন অ্যালবাম তৈরির পরিকল্পনা করছে। তবে ব্যান্ডটির ভবিষ্যৎ কী হবে, তা নিয়ে ফ্লাওয়ার্স নিজেও পুরোপুরি নিশ্চিত নন।
তার মতে, বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে শিল্পীদের নিজেদেরও বদলাতে হয়। ২০ বছর বয়সে লেখা জনপ্রিয় গানগুলোর চরিত্র ধরে রেখে সারা জীবন একইভাবে কাজ করে যাওয়া তার কাছে অর্থহীন।
তিনি জন লেনন ও টম পেটির মতো শিল্পীদের উদাহরণ দিয়ে বলেন, তারা নিজেদের বয়স ও সময়কে গ্রহণ করেছিলেন। তারও ইচ্ছা, বয়সকে অস্বীকার না করে সংগীতের মধ্য দিয়ে নিজের বর্তমান অবস্থাকে প্রকাশ করা।
মঞ্চের জাদুও বদলে গেছে
দীর্ঘদিন মঞ্চে কাটানোর কারণে অন্য শিল্পীদের কনসার্ট দেখার আগের সেই উত্তেজনাও আর অনুভব করেন না ফ্লাওয়ার্স। একসময় মরিসি বা দ্য কিউরকে মঞ্চে দেখার অভিজ্ঞতা তার কাছে স্বপ্নের মতো ছিল। এখন কনসার্টে যাওয়া মানেই তার কাছে অনেকটা কাজের জায়গায় যাওয়ার মতো।
তবে নতুন গান নিয়ে মঞ্চে ফেরার ব্যাপারে তিনি আশাবাদী। পুরোনো গানগুলো নতুনভাবে সাজানোর পাশাপাশি নতুন অ্যালবামের গান গাওয়ার আনন্দই তাকে আবারও সফরে যেতে উৎসাহিত করছে।
আর তার সেই হারানো কনসার্ট-উন্মাদনা হয়তো ফিরিয়ে আনতে পারে এমন একটি ব্যান্ডের নামও তিনি জানেন—ওয়েসিস।
তার ১৫ বছর বয়সী ছেলে সম্প্রতি ওয়েসিসের গানে মুগ্ধ হয়েছে এবং গিটারেও সেই গানগুলো শিখছে। ছেলে গিটার বাজালে ফ্লাওয়ার্স পিয়ানোতে সঙ্গ দেন। এতে নিজের ১৯ বছর বয়সের স্মৃতি আবারও ফিরে আসে তার কাছে।
তাই বহুদিন পর ওয়েসিসকে সরাসরি মঞ্চে দেখতে গেলে হয়তো তার নিজেরও হারিয়ে যাওয়া সেই আনন্দ ফিরে আসতে পারে বলে মনে করছেন তিনি।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















