দুই শতাব্দী আগে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের হয়ে যুদ্ধ করতে নেপাল থেকে বাংলাদেশে এসেছিলেন গোরখা সৈন্যদের একটি অংশ। যুদ্ধের দায়িত্ব শেষ হওয়ার পর তাঁদের অনেকেই আর ফিরে যাননি। চট্টগ্রাম পার্বত্য অঞ্চলে বসতি গড়ে শুরু হয় তাঁদের নতুন জীবন। সময়ের স্রোতে সেই সৈন্যদের বংশধররা বাংলাদেশের সমাজেরই অংশ হয়ে উঠেছেন। কিন্তু তাঁদের দীর্ঘ ইতিহাস আজ অনেকটাই বিস্মৃত।
ব্রিটিশদের হাত ধরে বাংলাদেশে আগমন
গোরখা যোদ্ধাদের সাহস ও সামরিক দক্ষতার জন্য ব্রিটিশরা তাঁদের নিজেদের বাহিনীতে নিয়োগ করত। প্রায় দুইশ বছর আগে ব্রিটিশ শাসনের সামরিক প্রয়োজনেই নেপাল থেকে গোরখা সৈন্যদের একটি দল তৎকালীন পূর্বাঞ্চলে আসে। চট্টগ্রাম পার্বত্য এলাকায় তাঁদের দায়িত্ব ছিল সামরিক অভিযান ও নিরাপত্তার সঙ্গে যুক্ত।
সেই সময়ের অনেক সৈন্য পরবর্তীতে এই ভূখণ্ডেই থেকে যান। তাঁদের পরিবারও ধীরে ধীরে বাংলাদেশে স্থায়ী হয়। প্রজন্মের পর প্রজন্ম পেরিয়ে তাঁদের উত্তরসূরিরা এখন বাংলাদেশের নাগরিক হিসেবে জীবনযাপন করছেন।
নেপালের স্মৃতি, বাংলাদেশের বাস্তবতা
বাংলাদেশে বসবাসকারী গোরখা বংশোদ্ভূত মানুষের পরিচয়ের মধ্যে দুটি জগত পাশাপাশি রয়েছে। একদিকে তাঁদের পূর্বপুরুষদের দেশ নেপালের ভাষা, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য; অন্যদিকে তাঁদের জন্ম, বেড়ে ওঠা এবং বর্তমান জীবন বাংলাদেশের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত।
এই সম্প্রদায়ের অনেকেই নিজেদের শিকড়ের সঙ্গে যোগাযোগ ধরে রাখার চেষ্টা করেন। নেপালি ভাষা ও সংস্কৃতির বিভিন্ন অনুষ্ঠান তাঁদের কাছে শুধু উৎসব নয়, পূর্বপুরুষদের স্মৃতি ধরে রাখারও একটি উপায়।
ভাষা ও সংস্কৃতি টিকিয়ে রাখার চেষ্টা
প্রতিবেদনটিতে উঠে এসেছে সংগীতশিল্পী মনোজ বাহাদুর গোরখার কথা। তাঁর স্টুডিওতে নেপালের প্রতিষ্ঠাতা রাজা পৃথ্বী নারায়ণ শাহের একটি বাঁধানো ছবি রয়েছে। এটি তাঁর পারিবারিক ও সাংস্কৃতিক শিকড়ের প্রতি গভীর টানের প্রতীক।
তিনি প্রতিবছর ভানু জয়ন্তীও পালন করেন। নেপালি ভাষা ও সাহিত্যের সঙ্গে যুক্ত এই দিনটি তাঁর কাছে নিজের সাংস্কৃতিক পরিচয় উদ্যাপনের গুরুত্বপূর্ণ উপলক্ষ।
তবে নতুন প্রজন্মের মধ্যে নেপালি ভাষা ও ঐতিহ্য কতটা টিকে থাকবে, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন। দীর্ঘদিন বাংলাদেশের সমাজে বসবাসের ফলে তাঁদের জীবনযাপন স্বাভাবিকভাবেই স্থানীয় সংস্কৃতির সঙ্গে মিশে গেছে।
তিন দেশের মাঝখানে এক বিস্মৃত সম্প্রদায়
গোরখালিদের ইতিহাসের সবচেয়ে বেদনাদায়ক দিক হলো, তাঁদের পরিচয় যেন তিনটি দেশের ইতিহাসের মাঝখানে আটকে আছে।
তাঁদের পূর্বপুরুষরা এসেছিলেন নেপাল থেকে। তাঁদের বাংলাদেশে নিয়ে এসেছিল ব্রিটিশ সাম্রাজ্য। আর তাঁদের পরবর্তী প্রজন্মের জীবন গড়ে উঠেছে বাংলাদেশে। কিন্তু এই তিন পরিচয়ের কোনোটিতেই তাঁরা আজ খুব বেশি দৃশ্যমান নন।
নেপালের ইতিহাসে তাঁরা মূলত বিদেশে যাওয়া গোরখা সৈন্যদের উত্তরসূরি। ব্রিটিশ সামরিক ইতিহাসে তাঁরা বৃহত্তর গোরখা বাহিনীর একটি অংশ। আর বাংলাদেশের ইতিহাসে তাঁদের উপস্থিতি এখনও তুলনামূলকভাবে অনালোচিত।
ইতিহাসের পাতার বাইরে মানুষের জীবন

শুধু সৈন্য হিসেবে তাঁদের পূর্বপুরুষদের ইতিহাস দেখলে এই সম্প্রদায়ের বর্তমান বাস্তবতা বোঝা যায় না। কয়েক প্রজন্ম ধরে বাংলাদেশের মাটি তাঁদের ঘর। এখানেই তাঁদের পরিবার, কাজ, বন্ধুত্ব, স্মৃতি ও ভবিষ্যৎ।
তাঁদের জীবন তাই অভিবাসনের একটি পুরোনো গল্পের চেয়েও বেশি কিছু। এটি পরিচয়, সংস্কৃতি এবং ইতিহাসের সঙ্গে মানুষের দীর্ঘ সম্পর্কের গল্প।
যে সৈন্যরা একসময় ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের সামরিক অভিযানের অংশ হয়ে এই অঞ্চলে এসেছিলেন, তাঁদের বংশধররা আজ আর বহিরাগত নন। তাঁরা বাংলাদেশেরই মানুষ। অথচ তাঁদের পূর্বপুরুষদের আগমন এবং তাঁদের নিজেদের সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকার সম্পর্কে বৃহত্তর সমাজে খুব কমই আলোচনা হয়।
শিকড় হারিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা
সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ভাষা ও সংস্কৃতির পরিবর্তন স্বাভাবিক। কিন্তু ছোট কোনো সম্প্রদায়ের ক্ষেত্রে এই পরিবর্তন দ্রুত সাংস্কৃতিক স্মৃতি মুছে দিতে পারে। নতুন প্রজন্ম যদি পূর্বপুরুষের ভাষা, গান, উৎসব ও ইতিহাস থেকে দূরে সরে যায়, তাহলে কয়েক শতকের পুরোনো পরিচয়ের অনেকটাই হারিয়ে যেতে পারে।
বাংলাদেশের গোরখালিদের গল্প তাই শুধু অতীতের গল্প নয়। এটি একটি সম্প্রদায়ের পরিচয় সংরক্ষণের বর্তমান সংগ্রামের গল্পও।
দুই শতাব্দী আগে যুদ্ধের কারণে যাঁরা নেপাল থেকে এসেছিলেন, তাঁদের উত্তরসূরিরা আজ বাংলাদেশের সমাজে নিজেদের জায়গা তৈরি করেছেন। কিন্তু তাঁদের ইতিহাসকে দৃশ্যমান করা, তাঁদের সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকারকে সংরক্ষণ করা এবং নতুন প্রজন্মের কাছে সেই গল্প পৌঁছে দেওয়াই হতে পারে এই বিস্মৃত অধ্যায়ের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পুনরুদ্ধার।
বাংলাদেশের ইতিহাস বহু জাতি, ভাষা ও সংস্কৃতির মানুষের সম্মিলিত পথচলার ইতিহাস। সেই বৃহত্তর ইতিহাসে গোরখালিদের দুই শতকের উপস্থিতিও তাই নতুন করে স্মরণ করার দাবি রাখে।

সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















