০২:১২ অপরাহ্ন, শনিবার, ২২ অগাস্ট ২০২৬
চীনের রকেট প্রযুক্তিতে নতুন সাফল্য, প্রথমবার স্থলভাগে ফিরল ঝু-চু-৩ প্রদর্শনী থেকে বাস্তব কাজে, চীনে দ্রুত বাণিজ্যিক হচ্ছে মানবাকৃতির রোবট পাকিস্তান–আফগানিস্তান সীমান্তে সংঘাত তীব্র, ‘খোলামেলা যুদ্ধের’ ঘোষণা ইসলামাবাদের কঙ্গোতে ভয়াবহ ইবোলা সংক্রমণ, মৃতের সংখ্যা ছাড়াল ২,৫০০ শ্রীলঙ্কায় রাষ্ট্রপতির ক্ষমায় বন্দিদের মুক্তিতে আসছে আনুষ্ঠানিক নীতিমালা মেসিকে জরিমানা, বাংলাদেশের বংশোদ্ভূত সুলিভানের নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার শিশুদের গোপনীয়তা আইন লঙ্ঘনের মামলায় ৪০ কোটি ডলার ক্ষতিপূরণ দেবে টিকটক দিনাজপুরে ৩৮ কোটি ৫৭ লাখ টাকার সাপের বিষ জব্দ, আটক ৪ কিশোর-কিশোরীদের ভবিষ্যৎ সুস্থতা ও স্বনির্ভরতার জন্য বাস্তব জীবনের শিক্ষা জরুরি শিকড়ের সন্ধানে শত বছর পর চীনের সেই গ্রামে নাতনি

শিকড়ের সন্ধানে শত বছর পর চীনের সেই গ্রামে নাতনি

সিঙ্গাপুরে বেড়ে ওঠা এক নারী নিজের পরিবারের অতীতের সন্ধান করতে গিয়ে পৌঁছালেন চীনের গুয়াংদং প্রদেশের চাওআনের শা লং গ্রামে। সেখানেই তিনি খুঁজে পেলেন তাঁর প্রপিতামহের শিকড়—যিনি মাত্র ১১ বছর বয়সে চীন ছেড়ে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার পথে পাড়ি দিয়েছিলেন।

শৈশবের স্মৃতিতে তাঁর দাদি ছিলেন পরিবারের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মানুষদের একজন। দাদির রান্না, কথাবার্তা, তেওচিউ ভাষা আর ঘরের নানা আচার-অনুষ্ঠানের মধ্যেই তাঁর বেড়ে ওঠা। কিন্তু বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে তিনি উপলব্ধি করতে শুরু করেন, দাদির জীবনের পেছনেও রয়েছে এক দীর্ঘ অভিবাসনের ইতিহাস।

তখনই তাঁর মনে প্রশ্ন জাগে—তাঁদের পরিবার আসলে কোথা থেকে এসেছিল? কীভাবে তারা সিঙ্গাপুরে এসে বসতি গড়েছিল?

একটি কবরের শিলালিপি থেকে শুরু

তাঁর দাদা তান কুয়ান লোক ইন্দোনেশিয়ায় জন্মেছিলেন। তাঁর বাবা, অর্থাৎ লেখিকার প্রপিতামহ, চীন থেকে ইন্দোনেশিয়ায় গিয়েছিলেন। কিন্তু তিনি চীনের কোথা থেকে এসেছিলেন, তা পরিবারের কেউ জানত না।

পরিবারের এক আত্মীয় ইন্দোনেশিয়ার রিয়াউ দ্বীপপুঞ্জের তানজুং বালাই কারিমুনে থাকা প্রপিতামহের কবরের ছবি তুলে পাঠান। সময়ের ক্ষয়ে শিলালিপির অক্ষরগুলো অনেকটাই মুছে গিয়েছিল। তবু সেখানে চীনের গ্রামের নামের একটি অংশ বোঝা যাচ্ছিল।

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সাহায্যে সেই অস্পষ্ট অক্ষর বিশ্লেষণ করে তারা প্রথমে চাওআন এলাকার সন্ধান পান। পরে অনুসন্ধান সংকুচিত হয়ে আসে কাইতাং শহর এবং শেষ পর্যন্ত শা লং গ্রামে।

এটাই ছিল তাঁদের পরিবারের হারিয়ে যাওয়া অতীতের প্রথম বড় সূত্র।

পুরোনো বংশলতিকা খুলে দিল দরজা

লেখিকা তাঁর পরিবার নিয়ে তথ্য খুঁজতে সিঙ্গাপুরের তেওচিউ সংগঠনগুলোর সঙ্গে যোগাযোগ করেন। কিন্তু কোথাও তাঁদের পরিবারের শাখার কোনো নথি পাওয়া যায়নি।

শেষ পর্যন্ত চাওআনে যাতায়াত করেন এমন এক পরিচিত ব্যক্তির মাধ্যমে স্থানীয় একজন গাড়িচালকের সন্ধান পান। সেই চালক তাঁদের শা লং গ্রামে নিয়ে যেতে রাজি হন। তবে গ্রামটি সত্যিই তাঁদের পূর্বপুরুষের গ্রাম কি না, কিংবা সেখানে কেউ তাঁদের পরিবারের নাম চিনবে কি না—কিছুই নিশ্চিত ছিল না।

চীনে পৌঁছে তাঁরা একটি পুরোনো বংশীয় উপাসনালয়ের সামনে যান। সেখানে গ্রামের দুই প্রবীণ ব্যক্তি তাঁদের সঙ্গে কথা বলেন। লেখিকা ভাঙা তেওচিউ ভাষায় নিজের আসার কারণ বোঝানোর পর প্রবীণরা একটি পুরোনো বংশলতিকা বের করে আনেন।

এরপর ঘটে অবিশ্বাস্য ঘটনা। বহু মাস ধরে যে পারিবারিক ইতিহাসের টুকরোগুলো লেখিকা নিজে জোড়া লাগানোর চেষ্টা করছিলেন, গ্রামের প্রবীণরা কয়েক মিনিটের মধ্যেই সেই বংশলতিকার মাধ্যমে সেগুলো মিলিয়ে দেন।

সেখানে ছিল তাঁর প্রপিতামহের নামও।

তাঁরা সত্যিই খুঁজে পেয়েছিলেন পরিবারের পূর্বপুরুষের জন্মভূমি।

মাত্র ১১ বছর বয়সে দেশ ছাড়েন প্রপিতামহ

উনিশ শতকের শেষভাগ ও বিশ শতকের শুরুর দিকে চাওআন, রাওপিং ও বৃহত্তর চাওঝৌ অঞ্চল থেকে বহু তেওচিউ মানুষ দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বিভিন্ন দেশে পাড়ি জমিয়েছিলেন।

দারিদ্র্য, দুর্ভিক্ষ, রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং বিদেশে কাজের সুযোগ তাঁদের এই যাত্রায় ঠেলে দিয়েছিল। অনেকে মনে করতেন, কিছু অর্থ উপার্জন করে একদিন দেশে ফিরে আসবেন।

লেখিকার প্রপিতামহ তান সিয়াক কিয়াংও মাত্র ১১ বছর বয়সে চাওআন ছেড়েছিলেন। কিন্তু আর কখনো ফিরে আসেননি।

চীনের সেই গ্রামে দাঁড়িয়ে লেখিকার মনে বারবার প্রশ্ন জেগেছিল—এত ছোট একটি শিশু কীভাবে একা এমন দীর্ঘ যাত্রা করেছিল? জাহাজে ওঠার সময় কি কেউ তাঁর হাত ধরেছিল? তিনি কি জানতেন যে গন্তব্যে পৌঁছাতে কয়েক সপ্তাহ লাগবে?

আর সবচেয়ে বড় প্রশ্ন—নিজের বাড়ি ছেড়ে যাওয়ার সিদ্ধান্তে ১১ বছরের সেই শিশুটির আদৌ কোনো মত ছিল কি?

অভিবাসনই হয়ে উঠেছিল উত্তরাধিকার

চাওআনে গিয়ে লেখিকার চোখে তাঁর প্রপিতামহের পরিচয়ও বদলে যায়। এতদিন তিনি ছিলেন পারিবারিক ইতিহাসের এক দূরবর্তী চরিত্র। কিন্তু জন্মভূমিতে দাঁড়িয়ে তিনি তাঁকে দেখতে পেলেন একজন ১১ বছরের শিশু হিসেবে—যাকে নিজের পরিচিত পৃথিবী ছেড়ে অজানা দেশে যেতে হয়েছিল।

তেরোচিউ সম্প্রদায়ের একটি প্রবাদ আছে—সমুদ্র যেখানে আছে, সেখানে বিদেশে বসবাসকারী চীনারা আছে; আর যেখানে বিদেশে বসবাসকারী চীনারা আছে, সেখানে চাওশান অঞ্চলের মানুষও আছে।

এই অভিবাসনের ধারাই লেখিকার পরিবারের উত্তরাধিকার হয়ে উঠেছে।

প্রপিতামহ পরে বিয়ে করে ছয় সন্তানের বাবা হন। কিন্তু মাত্র ৩৫ বছর বয়সে তাঁর মৃত্যু হয়। তাঁর সন্তানদের মধ্যে ছিলেন লেখিকার দাদাও।

মাত্র নয় বছর বয়সে দাদাকেও নিজের ঘর ছেড়ে সিঙ্গাপুরের উদ্দেশে জাহাজে উঠতে হয়েছিল।

এক শতাব্দী পর ফিরে আসা

২০১৫ সালে লেখিকাও সিঙ্গাপুর ছেড়ে যুক্তরাজ্যে চলে যান। তবে তাঁর অভিবাসনের পরিস্থিতি ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন। তাঁকে দারিদ্র্য বা দুর্ভিক্ষের কারণে দেশ ছাড়তে হয়নি। নিজের ইচ্ছাতেই তিনি নতুন দেশে গিয়েছিলেন।

তবু তিনি বুঝতে পারেন, আজ যে সুযোগকে তিনি নিজের পছন্দ হিসেবে দেখছেন, তাঁর পূর্বপুরুষদের কাছে সেটিই একসময় ছিল বেঁচে থাকার প্রয়োজন।

নতুন দেশে গিয়ে কাজ খোঁজা, পরিস্থিতির সঙ্গে মানিয়ে নেওয়া, অভিযোগ না করে এগিয়ে চলা—এই মানসিকতাগুলো হয়তো তাঁর পরিবারের প্রকৃত উত্তরাধিকার।

চাওআন ছাড়ার আগে তিনি একবার পেছনে ফিরে সেই পুরোনো উপাসনালয়ের দিকে তাকান। গ্রামের প্রবীণরা দাঁড়িয়ে তাঁকে বিদায় জানাচ্ছিলেন। তাঁদের আচরণে মনে হচ্ছিল, তাঁরা কোনো অপরিচিত মানুষকে নয়, বরং বহুদিন পর ফিরে আসা এক আত্মীয়কে বিদায় দিচ্ছেন।

এক শতাব্দীরও বেশি আগে, একই গ্রামে তাঁর প্রপিতামহের মা দাঁড়িয়ে ছিলেন। নিজের একমাত্র ছেলেকে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার উদ্দেশে বিদায় দিয়েছিলেন এই আশায় যে, একদিন সে ফিরে আসবে।

সে আর ফেরেনি।

কিন্তু একশ বছরেরও বেশি সময় পর তার বংশধর সেখানে ফিরে এসেছেন।

হয়তো এটাই ছিল সেই পরিবারের জন্য যথেষ্ট এক প্রত্যাবর্তন।

জনপ্রিয় সংবাদ

চীনের রকেট প্রযুক্তিতে নতুন সাফল্য, প্রথমবার স্থলভাগে ফিরল ঝু-চু-৩

শিকড়ের সন্ধানে শত বছর পর চীনের সেই গ্রামে নাতনি

০১:১৯:০৯ অপরাহ্ন, শনিবার, ২২ অগাস্ট ২০২৬

সিঙ্গাপুরে বেড়ে ওঠা এক নারী নিজের পরিবারের অতীতের সন্ধান করতে গিয়ে পৌঁছালেন চীনের গুয়াংদং প্রদেশের চাওআনের শা লং গ্রামে। সেখানেই তিনি খুঁজে পেলেন তাঁর প্রপিতামহের শিকড়—যিনি মাত্র ১১ বছর বয়সে চীন ছেড়ে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার পথে পাড়ি দিয়েছিলেন।

শৈশবের স্মৃতিতে তাঁর দাদি ছিলেন পরিবারের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মানুষদের একজন। দাদির রান্না, কথাবার্তা, তেওচিউ ভাষা আর ঘরের নানা আচার-অনুষ্ঠানের মধ্যেই তাঁর বেড়ে ওঠা। কিন্তু বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে তিনি উপলব্ধি করতে শুরু করেন, দাদির জীবনের পেছনেও রয়েছে এক দীর্ঘ অভিবাসনের ইতিহাস।

তখনই তাঁর মনে প্রশ্ন জাগে—তাঁদের পরিবার আসলে কোথা থেকে এসেছিল? কীভাবে তারা সিঙ্গাপুরে এসে বসতি গড়েছিল?

একটি কবরের শিলালিপি থেকে শুরু

তাঁর দাদা তান কুয়ান লোক ইন্দোনেশিয়ায় জন্মেছিলেন। তাঁর বাবা, অর্থাৎ লেখিকার প্রপিতামহ, চীন থেকে ইন্দোনেশিয়ায় গিয়েছিলেন। কিন্তু তিনি চীনের কোথা থেকে এসেছিলেন, তা পরিবারের কেউ জানত না।

পরিবারের এক আত্মীয় ইন্দোনেশিয়ার রিয়াউ দ্বীপপুঞ্জের তানজুং বালাই কারিমুনে থাকা প্রপিতামহের কবরের ছবি তুলে পাঠান। সময়ের ক্ষয়ে শিলালিপির অক্ষরগুলো অনেকটাই মুছে গিয়েছিল। তবু সেখানে চীনের গ্রামের নামের একটি অংশ বোঝা যাচ্ছিল।

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সাহায্যে সেই অস্পষ্ট অক্ষর বিশ্লেষণ করে তারা প্রথমে চাওআন এলাকার সন্ধান পান। পরে অনুসন্ধান সংকুচিত হয়ে আসে কাইতাং শহর এবং শেষ পর্যন্ত শা লং গ্রামে।

এটাই ছিল তাঁদের পরিবারের হারিয়ে যাওয়া অতীতের প্রথম বড় সূত্র।

পুরোনো বংশলতিকা খুলে দিল দরজা

লেখিকা তাঁর পরিবার নিয়ে তথ্য খুঁজতে সিঙ্গাপুরের তেওচিউ সংগঠনগুলোর সঙ্গে যোগাযোগ করেন। কিন্তু কোথাও তাঁদের পরিবারের শাখার কোনো নথি পাওয়া যায়নি।

শেষ পর্যন্ত চাওআনে যাতায়াত করেন এমন এক পরিচিত ব্যক্তির মাধ্যমে স্থানীয় একজন গাড়িচালকের সন্ধান পান। সেই চালক তাঁদের শা লং গ্রামে নিয়ে যেতে রাজি হন। তবে গ্রামটি সত্যিই তাঁদের পূর্বপুরুষের গ্রাম কি না, কিংবা সেখানে কেউ তাঁদের পরিবারের নাম চিনবে কি না—কিছুই নিশ্চিত ছিল না।

চীনে পৌঁছে তাঁরা একটি পুরোনো বংশীয় উপাসনালয়ের সামনে যান। সেখানে গ্রামের দুই প্রবীণ ব্যক্তি তাঁদের সঙ্গে কথা বলেন। লেখিকা ভাঙা তেওচিউ ভাষায় নিজের আসার কারণ বোঝানোর পর প্রবীণরা একটি পুরোনো বংশলতিকা বের করে আনেন।

এরপর ঘটে অবিশ্বাস্য ঘটনা। বহু মাস ধরে যে পারিবারিক ইতিহাসের টুকরোগুলো লেখিকা নিজে জোড়া লাগানোর চেষ্টা করছিলেন, গ্রামের প্রবীণরা কয়েক মিনিটের মধ্যেই সেই বংশলতিকার মাধ্যমে সেগুলো মিলিয়ে দেন।

সেখানে ছিল তাঁর প্রপিতামহের নামও।

তাঁরা সত্যিই খুঁজে পেয়েছিলেন পরিবারের পূর্বপুরুষের জন্মভূমি।

মাত্র ১১ বছর বয়সে দেশ ছাড়েন প্রপিতামহ

উনিশ শতকের শেষভাগ ও বিশ শতকের শুরুর দিকে চাওআন, রাওপিং ও বৃহত্তর চাওঝৌ অঞ্চল থেকে বহু তেওচিউ মানুষ দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বিভিন্ন দেশে পাড়ি জমিয়েছিলেন।

দারিদ্র্য, দুর্ভিক্ষ, রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং বিদেশে কাজের সুযোগ তাঁদের এই যাত্রায় ঠেলে দিয়েছিল। অনেকে মনে করতেন, কিছু অর্থ উপার্জন করে একদিন দেশে ফিরে আসবেন।

লেখিকার প্রপিতামহ তান সিয়াক কিয়াংও মাত্র ১১ বছর বয়সে চাওআন ছেড়েছিলেন। কিন্তু আর কখনো ফিরে আসেননি।

চীনের সেই গ্রামে দাঁড়িয়ে লেখিকার মনে বারবার প্রশ্ন জেগেছিল—এত ছোট একটি শিশু কীভাবে একা এমন দীর্ঘ যাত্রা করেছিল? জাহাজে ওঠার সময় কি কেউ তাঁর হাত ধরেছিল? তিনি কি জানতেন যে গন্তব্যে পৌঁছাতে কয়েক সপ্তাহ লাগবে?

আর সবচেয়ে বড় প্রশ্ন—নিজের বাড়ি ছেড়ে যাওয়ার সিদ্ধান্তে ১১ বছরের সেই শিশুটির আদৌ কোনো মত ছিল কি?

অভিবাসনই হয়ে উঠেছিল উত্তরাধিকার

চাওআনে গিয়ে লেখিকার চোখে তাঁর প্রপিতামহের পরিচয়ও বদলে যায়। এতদিন তিনি ছিলেন পারিবারিক ইতিহাসের এক দূরবর্তী চরিত্র। কিন্তু জন্মভূমিতে দাঁড়িয়ে তিনি তাঁকে দেখতে পেলেন একজন ১১ বছরের শিশু হিসেবে—যাকে নিজের পরিচিত পৃথিবী ছেড়ে অজানা দেশে যেতে হয়েছিল।

তেরোচিউ সম্প্রদায়ের একটি প্রবাদ আছে—সমুদ্র যেখানে আছে, সেখানে বিদেশে বসবাসকারী চীনারা আছে; আর যেখানে বিদেশে বসবাসকারী চীনারা আছে, সেখানে চাওশান অঞ্চলের মানুষও আছে।

এই অভিবাসনের ধারাই লেখিকার পরিবারের উত্তরাধিকার হয়ে উঠেছে।

প্রপিতামহ পরে বিয়ে করে ছয় সন্তানের বাবা হন। কিন্তু মাত্র ৩৫ বছর বয়সে তাঁর মৃত্যু হয়। তাঁর সন্তানদের মধ্যে ছিলেন লেখিকার দাদাও।

মাত্র নয় বছর বয়সে দাদাকেও নিজের ঘর ছেড়ে সিঙ্গাপুরের উদ্দেশে জাহাজে উঠতে হয়েছিল।

এক শতাব্দী পর ফিরে আসা

২০১৫ সালে লেখিকাও সিঙ্গাপুর ছেড়ে যুক্তরাজ্যে চলে যান। তবে তাঁর অভিবাসনের পরিস্থিতি ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন। তাঁকে দারিদ্র্য বা দুর্ভিক্ষের কারণে দেশ ছাড়তে হয়নি। নিজের ইচ্ছাতেই তিনি নতুন দেশে গিয়েছিলেন।

তবু তিনি বুঝতে পারেন, আজ যে সুযোগকে তিনি নিজের পছন্দ হিসেবে দেখছেন, তাঁর পূর্বপুরুষদের কাছে সেটিই একসময় ছিল বেঁচে থাকার প্রয়োজন।

নতুন দেশে গিয়ে কাজ খোঁজা, পরিস্থিতির সঙ্গে মানিয়ে নেওয়া, অভিযোগ না করে এগিয়ে চলা—এই মানসিকতাগুলো হয়তো তাঁর পরিবারের প্রকৃত উত্তরাধিকার।

চাওআন ছাড়ার আগে তিনি একবার পেছনে ফিরে সেই পুরোনো উপাসনালয়ের দিকে তাকান। গ্রামের প্রবীণরা দাঁড়িয়ে তাঁকে বিদায় জানাচ্ছিলেন। তাঁদের আচরণে মনে হচ্ছিল, তাঁরা কোনো অপরিচিত মানুষকে নয়, বরং বহুদিন পর ফিরে আসা এক আত্মীয়কে বিদায় দিচ্ছেন।

এক শতাব্দীরও বেশি আগে, একই গ্রামে তাঁর প্রপিতামহের মা দাঁড়িয়ে ছিলেন। নিজের একমাত্র ছেলেকে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার উদ্দেশে বিদায় দিয়েছিলেন এই আশায় যে, একদিন সে ফিরে আসবে।

সে আর ফেরেনি।

কিন্তু একশ বছরেরও বেশি সময় পর তার বংশধর সেখানে ফিরে এসেছেন।

হয়তো এটাই ছিল সেই পরিবারের জন্য যথেষ্ট এক প্রত্যাবর্তন।