পাকিস্তান ও আফগানিস্তানের মধ্যে দীর্ঘদিনের উত্তেজনা এবার সরাসরি সামরিক সংঘাতে রূপ নিয়েছে। আফগান সীমান্তে হামলার জবাবে পাকিস্তান কাবুলসহ দেশটির কয়েকটি এলাকায় বিমান হামলা চালিয়েছে। পাকিস্তানের প্রতিরক্ষামন্ত্রী খাজা আসিফ বলেছেন, আফগানিস্তানের তালেবান সরকারের সঙ্গে তাদের ধৈর্যের সীমা শেষ হয়ে গেছে এবং এখন দুই দেশের মধ্যে ‘খোলামেলা যুদ্ধ’ চলছে।
কাবুলে বিমান হামলা
প্রতিবেদন অনুযায়ী, শুক্রবার ভোররাতে আফগানিস্তানের রাজধানী কাবুলে পাকিস্তানি যুদ্ধবিমান হামলা চালায়। স্থানীয় সময় রাত ১টা ৫০ মিনিটে প্রথম হামলার পর আরেক দফা বিমান হামলা হয়। প্রথম হামলার পর আফগানিস্তানের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা থেকে পাল্টা গুলিবর্ষণ শুরু হয় এবং দ্বিতীয় হামলার পরও তা অব্যাহত থাকে।
আফগান সরকারের একটি সূত্র জানিয়েছে, কাবুলে হামলার পাশাপাশি দক্ষিণাঞ্চলীয় কান্দাহার প্রদেশের একটি সামরিক ঘাঁটিতেও পাকিস্তানি বিমান হামলা হয়েছে। পাকিস্তানের তথ্যমন্ত্রী আতাউল্লাহ তারার দাবি করেছেন, শুক্রবারের হামলায় ১৩৩ জন আফগান তালেবান যোদ্ধা নিহত হয়েছেন।
তিনি আরও দাবি করেন, কাবুল, কান্দাহার ও পাকতিয়া এলাকায় তালেবানের অবস্থান লক্ষ্য করে হামলা চালানো হয়েছে। পাকিস্তানের দাবি অনুযায়ী, নয়টি তালেবান অবস্থান দখল এবং ২৭টি অবস্থান ধ্বংস করা হয়েছে।
পাল্টা হামলার দাবি আফগানিস্তানের
আফগান সরকারের মুখপাত্র জাবিউল্লাহ মুজাহিদ জানিয়েছেন, পাকিস্তানের সাম্প্রতিক হামলার জবাবে আফগান বাহিনী কান্দাহার ও হেলমান্দে পাকিস্তানি সামরিক ঘাঁটিতে হামলা চালিয়েছে।
এর আগে বৃহস্পতিবার রাতে দুই দেশের সীমান্তে পাকিস্তানি সামরিক অবস্থানে আফগান বাহিনী হামলা চালায়। আফগান সামরিক সূত্রের দাবি, ওই অভিযানে ১০ পাকিস্তানি সেনা নিহত এবং ১৩টি সীমান্তচৌকি দখল করা হয়।
আফগান পক্ষের ভাষ্য অনুযায়ী, কয়েক দিন আগে পাকিস্তানের চালানো হামলার প্রতিক্রিয়াতেই সীমান্তে পাল্টা অভিযান চালানো হয়েছিল। পাকিস্তান অবশ্য দাবি করেছিল, তাদের ওই হামলায় অন্তত ৭০ জন যোদ্ধা নিহত হয়েছে। আফগানিস্তান সেই দাবি প্রত্যাখ্যান করে বলেছে, হামলায় বেসামরিক মানুষ নিহত হয়েছেন।
ধৈর্যের বাঁধ ভেঙে গেছে: পাকিস্তান
পাকিস্তানের প্রতিরক্ষামন্ত্রী খাজা আসিফ বলেছেন, পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে ইসলামাবাদ দীর্ঘদিন ধরে সরাসরি আলোচনা ও কূটনৈতিক উদ্যোগ চালিয়েছে। বন্ধুত্বপূর্ণ দেশগুলোর মাধ্যমেও সমাধানের চেষ্টা করা হয়েছে। কিন্তু তার ভাষ্য অনুযায়ী, তালেবান সরকার পাকিস্তানের বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়া শক্তিগুলোর সহযোগী হয়ে উঠেছে।
আসিফ বলেন, পাকিস্তান বহু বছর ধরে লাখ লাখ আফগান নাগরিককে আশ্রয় দিয়েছে এবং এখনও দেশটিতে বিপুলসংখ্যক আফগান জীবিকা নির্বাহ করছেন। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতিতে পাকিস্তানের ধৈর্যের সীমা অতিক্রম করেছে।
তিনি বলেন, এখন পাকিস্তান ও আফগানিস্তানের মধ্যে ‘খোলামেলা যুদ্ধ’ চলছে।

সীমান্ত উত্তেজনার পেছনে কী
পাকিস্তান ও আফগানিস্তানের মধ্যে প্রায় ২ হাজার ৬১১ কিলোমিটার দীর্ঘ সীমান্ত রয়েছে। গত অক্টোবরের সংঘর্ষে উভয় দেশের ৭০ জনের বেশি মানুষ নিহত হওয়ার পর সম্পর্ক আরও অবনতি ঘটে।
ইসলামাবাদের প্রধান অভিযোগ, আফগানিস্তান তার ভূখণ্ডে পাকিস্তান তালেবানসহ সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোকে ঘাঁটি গড়ে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে হামলা চালানোর সুযোগ দিচ্ছে। আফগান তালেবান ও পাকিস্তান তালেবানের মধ্যে আদর্শগত ঘনিষ্ঠতা থাকলেও তারা পৃথক সংগঠন।
আফগানিস্তান পাকিস্তানের এসব অভিযোগ অস্বীকার করে আসছে।
ভারতের অবস্থান
পাকিস্তানের সঙ্গে ভারতের দীর্ঘদিনের বৈরিতাও এই সংকটকে আরও জটিল করে তুলেছে। মে মাসে দুই দেশের মধ্যে স্বল্পস্থায়ী যুদ্ধের পর নতুন করে আঞ্চলিক উত্তেজনা তৈরি হয়েছিল।
আফগানিস্তানে পাকিস্তানের হামলার সমালোচনা করে ভারত বলেছে, নিজেদের অভ্যন্তরীণ ব্যর্থতার দায় অন্য দেশের ওপর চাপানোর এটি পাকিস্তানের আরেকটি প্রচেষ্টা।

যুদ্ধ বন্ধের আহ্বান জাতিসংঘের
পরিস্থিতির দ্রুত অবনতি ঠেকাতে দুই দেশকে অবিলম্বে উত্তেজনা কমানোর আহ্বান জানিয়েছে জাতিসংঘ। সংস্থাটি বলেছে, উভয় পক্ষকে আন্তর্জাতিক আইন ও আন্তর্জাতিক মানবিক আইনের বাধ্যবাধকতা মেনে চলতে হবে এবং বেসামরিক মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে।
জাতিসংঘের মহাসচিবের মুখপাত্র স্টিফেন দুজারিক জানিয়েছেন, বিরোধ কূটনৈতিক উপায়ে সমাধানের চেষ্টা চালিয়ে যেতে উভয় পক্ষের প্রতি আহ্বান জানানো হয়েছে।
আফগানিস্তানে যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক রাষ্ট্রদূত জালমাই খলিলজাদও সাম্প্রতিক পাল্টাপাল্টি হামলাকে বিপজ্জনক পরিস্থিতি হিসেবে উল্লেখ করে তা বন্ধ করার আহ্বান জানিয়েছেন। তার প্রস্তাব, দুই দেশ এমন একটি চুক্তিতে পৌঁছাতে পারে যাতে কেউই নিজেদের ভূখণ্ড অন্য দেশের নিরাপত্তার জন্য হুমকি সৃষ্টি করতে ব্যবহার করতে না দেয়। চুক্তির বাস্তবায়ন কোনো নিরপেক্ষ ও বিশ্বাসযোগ্য তৃতীয় পক্ষের মাধ্যমে পর্যবেক্ষণের কথাও তিনি বলেছেন।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















