যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে এখন এক অদ্ভুত দ্বৈত চিত্র দেখা যাচ্ছে। নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য কিনতে গিয়ে ক্রেতারা হিসাব কষছেন, বড় ধরনের কেনাকাটা পিছিয়ে দিচ্ছেন; কিন্তু পছন্দের কোনো একটি পণ্য চোখে পড়লে আবার সেটির জন্য কিছুটা বেশি অর্থ খরচ করতেও দ্বিধা করছেন না।
গত কয়েক সপ্তাহে দেশটির বিভিন্ন বিপণিবিতান, গৃহনির্মাণ সামগ্রীর দোকান, খাবারের প্রতিষ্ঠান এবং বিলাসপণ্যের ব্যবসায়ীদের আর্থিক ফলাফলে এই পরিবর্তন স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। সামগ্রিকভাবে মানুষের খরচ একেবারে থেমে যায়নি, তবে অর্থ কোথায় খরচ করা হবে, সে বিষয়ে ক্রেতারা আগের চেয়ে অনেক বেশি সতর্ক।
প্রয়োজনের বাইরে কেনাকাটায় লাগাম
জ্বালানি ও নিত্যপণ্যের বাড়তি দামের চাপে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবিত্ত পরিবারগুলো এখন প্রয়োজনীয় পণ্য কেনাকাটাকেই বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে। বড় ধরনের ঘরবাড়ির কাজ, দামি পণ্য কেনা কিংবা একসঙ্গে অনেক কিছু কেনার পরিকল্পনা অনেকেই পিছিয়ে দিচ্ছেন।
বড় খুচরা বিক্রেতা ওয়ালমার্ট গত জুলাই পর্যন্ত তিন মাসে প্রায় ১১ হাজার পণ্যের দাম কমিয়েছে। কিন্তু এত বড় মূল্যছাড়ের পরও প্রত্যাশিত হারে বিক্রি বাড়েনি। বরং একই দোকানে বিক্রির প্রবৃদ্ধি ছয় বছরের মধ্যে সবচেয়ে ধীর হয়েছে।

দোকানে ক্রেতাদের আসা মোটামুটি স্বাভাবিক থাকলেও প্রতিবার কেনাকাটায় গড় ব্যয়ের পরিমাণ কমেছে। অর্থাৎ মানুষ দোকানে যাচ্ছেন ঠিকই, কিন্তু প্রয়োজনের অতিরিক্ত পণ্য কেনা থেকে বিরত থাকছেন।
শুধু দাম কমালেই মন গলছে না
বর্তমান বাজারে ক্রেতাদের আকৃষ্ট করতে শুধু মূল্যছাড় দেওয়াই যথেষ্ট হচ্ছে না। ম্যাকডোনাল্ডস তুলনামূলক কম দামের খাবারের আয়োজন করেও প্রত্যাশিত সাড়া পায়নি। বিপরীতে নতুন খাবারের আয়োজন নিয়ে টাকো বেল, কেএফসি ও পিৎজা হাটের মতো প্রতিষ্ঠানগুলো তুলনামূলক ভালো সাড়া পেয়েছে।
বাজার বিশ্লেষকদের মতে, ক্রেতারা এখন ‘সবকিছু একটু একটু করে’ কেনার বদলে নিজের পছন্দের জিনিসটি বেছে নিচ্ছেন। কোনো একটি পণ্য খুব প্রয়োজনীয় বা আকর্ষণীয় মনে হলে সেটির জন্য বেশি অর্থ খরচ করছেন, কিন্তু একই সঙ্গে দ্বিতীয় বা তৃতীয় অপ্রয়োজনীয় পণ্যটি আর কিনছেন না।
সচ্ছলদের কেনাকাটায় এখনো জোর
তবে সবার ক্ষেত্রে চিত্র এক নয়। উচ্চ আয়ের ক্রেতারা এখনো বিলাসপণ্য ও তুলনামূলক দামি পণ্যে অর্থ খরচ করছেন।
রালফ লরেনের পোশাক, উচ্চমূল্যের প্রসাধনী, দামি ব্যাগ ও সুগন্ধির মতো পণ্যের চাহিদা এখনো শক্তিশালী। ট্যাপেস্ট্রি, এস্টি লডার ও বিরকেনস্টকের মতো প্রতিষ্ঠানও সাম্প্রতিক সময়ে ভালো ব্যবসার খবর দিয়েছে।
কফি বিক্রির ক্ষেত্রেও একই প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। স্টারবাকস উন্নত সেবা ও দোকানের পরিবেশে পরিবর্তন এনে তুলনামূলক দামি কফির ক্রেতাদের আবার ফিরিয়ে আনতে পেরেছে।

একই সঙ্গে সস্তা ও দামি পণ্যের আয়োজন
বাজারের এই পরিবর্তিত বাস্তবতায় বড় খুচরা বিক্রেতারা দুই ধরনের ক্রেতাকেই ধরে রাখার চেষ্টা করছে। একদিকে কম দামের নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য, অন্যদিকে তুলনামূলক দামি ও আকর্ষণীয় পণ্য—দুটিই রাখা হচ্ছে দোকানে।
টার্গেট নিজেদের খাদ্যপণ্যের পরিসর বাড়ানোর পাশাপাশি দামি শিশুপণ্যও বিক্রি করছে। বিদ্যালয় খোলার মৌসুমের প্রায় ৯৫ শতাংশ পণ্যের দাম গত বছরের সমান বা তার চেয়ে কম রাখার উদ্যোগ নিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি।
ওয়ালমার্ট ও টার্গেট আবার শুল্ক ফেরত হিসেবে পাওয়া অর্থের একটি অংশ ব্যবহার করছে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম কমাতে। এর মধ্যে গরুর মাংসও রয়েছে, যার দাম গত এক বছরে উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।
সামনে আরও কঠিন সময়
জ্বালানির দাম বাড়তে থাকলে এই সতর্ক খরচের প্রবণতা আসন্ন ছুটির মৌসুমের কেনাকাটাতেও প্রভাব ফেলতে পারে। ফলে ক্রেতাদের আকৃষ্ট করতে ব্যবসায়ীদের একদিকে মূল্যছাড় দিতে হবে, অন্যদিকে নতুন ও উচ্চমানের পণ্যের আকর্ষণও বাড়াতে হবে।
সব মিলিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের মানুষ খরচ বন্ধ করে দেয়নি; বরং খরচের ধরন বদলে ফেলেছে। প্রয়োজনীয় পণ্যে অর্থ ব্যয় হচ্ছে, শখের কোনো একটি জিনিসের জন্যও পকেট খুলছে, কিন্তু অপ্রয়োজনীয় কেনাকাটায় পড়ছে কঠোর কাটছাঁট। এই বদলে যাওয়া অভ্যাসই এখন যুক্তরাষ্ট্রের ভোক্তা বাজারের নতুন বাস্তবতা।

সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















