চীনে মানবাকৃতির রোবট এখন আর শুধু প্রদর্শনীর আকর্ষণ নয়, ধীরে ধীরে বাস্তব কর্মক্ষেত্রের অংশ হয়ে উঠছে। বেইজিংয়ে অনুষ্ঠিত ২০২৬ সালের বিশ্ব রোবট সম্মেলনে রোবটের বাণিজ্যিক ব্যবহার ও বৃহৎ পরিসরে উৎপাদনের এই নতুন প্রবণতাই বিশেষভাবে সামনে এসেছে।
গুদাম থেকে কারখানায় রোবটের কর্মযজ্ঞ
সম্মেলনের প্রদর্শনীতে প্রায় ১০টি মানবাকৃতির রোবটকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে দেখা যায়। কোনোটি বাক্স ওঠানো ও সাজানোর কাজ করছে, আবার কোনোটি পণ্য বাছাই করছে। সবগুলো রোবট একসঙ্গে গুদামের পণ্য পরিবহন, বাছাই ও পুনরায় সরবরাহের একটি পূর্ণাঙ্গ স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থা প্রদর্শন করে।
চীনা রোবট নির্মাতা প্রতিষ্ঠান ইউবিটেকের এই প্রদর্শনী থেকে স্পষ্ট হয়েছে, রোবট প্রযুক্তি এখন কেবল ভবিষ্যতের সম্ভাবনা দেখানোর পর্যায়ে নেই। বরং বাস্তব উৎপাদন ও সরবরাহ ব্যবস্থায় এর ব্যবহার শুরু হয়ে গেছে।
১৯ থেকে ২৩ আগস্ট পর্যন্ত চলা এবারের সম্মেলনে ২৬টি দেশের তিন শতাধিক প্রতিষ্ঠান অংশ নিয়েছে। প্রদর্শনীতে দেখানো হয়েছে তিন হাজারের বেশি পণ্য, যার মধ্যে তিন শতাধিক পণ্য প্রথমবারের মতো উন্মোচন করা হয়েছে।
রাতের গুদাম সামলাবে রোবট
গ্যালাক্সিয়ার প্রদর্শনীতে দর্শনার্থীরা একটি সংকেতচিহ্ন স্ক্যান করে পানির বোতল অর্ডার করলে একটি রোবট নিজে থেকেই গুদামে গিয়ে পণ্যটি সংগ্রহ ও প্যাকেটজাত করে। পুরো প্রক্রিয়াটি সম্পন্ন করতে তার সময় লাগে এক মিনিটের কিছু বেশি।
প্রতিষ্ঠানটির প্রধান অর্থ কর্মকর্তা লুও তিয়ানছি বলেন, এই ব্যবস্থা রাতের গুদামে কর্মী নিয়োগের সমস্যা কমাতে পারে। রাতে অর্ডারের পরিমাণ খুব বেশি না হলেও কর্মীদের রাতের পালায় কাজ করতে হয়। সেই জায়গায় রোবট ব্যবহার করা অর্থনৈতিকভাবেও কার্যকর হতে পারে।
গাড়ি কারখানাতেও বাড়ছে ব্যবহার
চীনের ইলেকট্রনিক্সবিষয়ক প্রতিষ্ঠানগুলোর সংগঠনের প্রধান শু শিয়াওলান জানান, দেশটির মানবাকৃতির রোবট শিল্প এখন বড় পরিসরে বাণিজ্যিক উৎপাদন ও ব্যবহারের গুরুত্বপূর্ণ পর্যায়ে প্রবেশ করেছে।
বিওয়াইডি ও এসএআইসি-সহ প্রায় ১০টি বড় গাড়ি নির্মাতা প্রতিষ্ঠান ইতোমধ্যে উৎপাদন লাইনে বুদ্ধিমান রোবট ব্যবস্থা পরীক্ষা করছে। পণ্য ও যন্ত্রাংশ বহন, নির্দিষ্ট স্থানে বসানোসহ নানা কাজে এসব রোবট ব্যবহার করা হচ্ছে।
শুধু কারখানাই নয়, দুর্যোগ মোকাবিলা, বন্যার সময় উদ্ধারকাজ এবং ঝুঁকিপূর্ণ শিল্প এলাকায় পরিদর্শনের মতো বিপজ্জনক ও সংকীর্ণ স্থানেও এসব রোবট ব্যবহারের পরীক্ষা চলছে।
নতুন পর্যায়ে ইউনিট্রির রোবট শিল্প
ইউনিট্রি রোবটিক্সের প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান নির্বাহী ওয়াং শিংশিং জানান, তাদের রোবট গাড়ি তৈরির কারখানার উৎপাদন লাইনে এবং নিজেদের কারখানাতেও পরীক্ষা করা হচ্ছে। মানুষের ঘর ও শিল্পক্ষেত্রে বাস্তব কাজ সম্পাদনের সক্ষমতা বাড়াতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক গবেষণায় জোর দেওয়া হচ্ছে।

বুধবার হাংচৌভিত্তিক প্রতিষ্ঠানটি চীনের শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত প্রথম মানবাকৃতির রোবট নির্মাতা হিসেবে নতুন দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। এর মধ্য দিয়ে চীনের মানবাকৃতির রোবট শিল্পের বাণিজ্যিক বিকাশ আরও এক ধাপ এগিয়ে গেল।
পুরো শিল্পশৃঙ্খলকে একসঙ্গে আনার চেষ্টা
এবারের সম্মেলনে শুধু রোবট প্রদর্শন নয়, পুরো শিল্পশৃঙ্খলের মধ্যে সহযোগিতার ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার অ্যালগরিদম নির্মাতা, ত্রিমাত্রিক দৃষ্টিসংক্রান্ত প্রযুক্তি ও ব্যাটারি সরবরাহকারী, রোবট নির্মাতা এবং ব্যবহারকারী প্রতিষ্ঠানগুলোকে একই প্ল্যাটফর্মে আনার চেষ্টা চলছে।
এর ফলে গবেষণা ও উন্নয়নের সময় কমবে এবং নতুন প্রযুক্তির পরীক্ষা ও উন্নয়ন দ্রুত করা সম্ভব হবে বলে মনে করা হচ্ছে।
৩০ হাজার কোটি ইউয়ান ছাড়িয়েছে শিল্পের আয়
চীনের শিল্প ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে দেশটির রোবট শিল্পের আয় ৩০ হাজার কোটি ইউয়ান ছাড়িয়েছে। গত পাঁচ বছরে এ খাতে গড় বার্ষিক প্রবৃদ্ধি ছিল ২০ শতাংশের বেশি।
২০২৬ সালের প্রথম ছয় মাসে রোবট শিল্পের আয় দাঁড়িয়েছে ১৬ হাজার ৫৫০ কোটি ইউয়ানে, যা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ২৪ দশমিক ৫ শতাংশ বেশি।
দেশজুড়ে মানবাকৃতির বুদ্ধিমান রোবটের প্রশিক্ষণের জন্য জুন পর্যন্ত ৭০টির বেশি প্রশিক্ষণকেন্দ্র তৈরি হয়েছে। আরও ৪৬টি কেন্দ্র নির্মাণাধীন অথবা পরিকল্পনার পর্যায়ে রয়েছে।

বড় সাফল্যের অপেক্ষায় চীনের রোবট শিল্প
চীন ইতোমধ্যে মার্শাল আর্ট প্রদর্শন থেকে শুরু করে দৌড় প্রতিযোগিতা পর্যন্ত নানা ক্ষেত্রে রোবটের সক্ষমতা দেখিয়েছে। তবে দেশটির বর্তমান লক্ষ্য শুধু চমক দেখানো নয়, মানুষের দৈনন্দিন জীবন ও শিল্প উৎপাদনে রোবটের ব্যবহার দ্রুত বাড়ানো।
২০২৫ সালে চীনের সরকারি কর্মপরিকল্পনায় প্রথমবারের মতো বাস্তব জগতে কাজ করতে সক্ষম কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত করা হয়। ২০২৬ থেকে ২০৩০ সালের পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনাতেও ভবিষ্যৎ শিল্প হিসেবে এই প্রযুক্তির বিকাশ এবং নতুন খাতে অর্থায়ন ও ঝুঁকি ভাগাভাগির ব্যবস্থা জোরদারের কথা বলা হয়েছে।
ইউনিট্রি রোবটিক্সের প্রতিষ্ঠাতা ওয়াং শিংশিংয়ের মতে, মানবাকৃতির রোবটের ক্ষেত্রে বড় ধরনের প্রযুক্তিগত পরিবর্তনের মুহূর্ত তখনই আসবে, যখন অপরিচিত পরিবেশে একটি রোবটকে পাঠিয়ে সাধারণ মৌখিক বা লিখিত নির্দেশের মাধ্যমে অধিকাংশ কাজ করানো সম্ভব হবে।
আশাবাদী পরিস্থিতিতে আগামী দুই থেকে তিন বছরের মধ্যেই এমন অগ্রগতি ঘটতে পারে বলে তিনি মনে করেন। আর তা না হলে পাঁচ থেকে দশ বছরের মধ্যে এই পর্যায়ে পৌঁছানোর সম্ভাবনা রয়েছে।
চীনের রোবট শিল্প তাই এখন প্রদর্শনীর মঞ্চ থেকে বাস্তব অর্থনীতির দিকে দ্রুত এগোচ্ছে। কারখানা, গুদাম, দুর্যোগ মোকাবিলা কিংবা দৈনন্দিন জীবনে রোবটের ব্যবহার যত বাড়বে, ততই এই প্রযুক্তি চীনের ভবিষ্যৎ শিল্পব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তিতে পরিণত হতে পারে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















