চাঁদকে মানুষের জন্য তো বটেই, পৃথিবীর অধিকাংশ জীবের জন্যও অত্যন্ত প্রতিকূল একটি স্থান হিসেবে ধরা হয়। সেখানে শ্বাস নেওয়ার মতো বায়ু নেই, তাপমাত্রার ব্যাপক ওঠানামা রয়েছে এবং মহাজাগতিক বিকিরণের তীব্র প্রভাব রয়েছে। কিন্তু নতুন এক গবেষণায় দেখা গেছে, পৃথিবীর কিছু ছত্রাক ও ব্যাকটেরিয়া চাঁদের নির্দিষ্ট পরিবেশে কয়েক সপ্তাহ থেকে কয়েক মাস পর্যন্ত টিকে থাকতে পারে।
এই গবেষণা পরিচালনা করেছেন মার্কিন মহাকাশ গবেষণা সংস্থার বিজ্ঞানীরা। গবেষণায় পৃথিবীর পাঁচ ধরনের ছত্রাক ও ব্যাকটেরিয়াকে নিয়ে চাঁদের পরিবেশের অনুকরণে কম্পিউটারভিত্তিক মডেল তৈরি করা হয়। এতে চাঁদের দক্ষিণ মেরুর নোবাইল রিম, কানেক্টিং রিজ ও দ্য জেরলাশ রিম এলাকার পরিবেশ বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে।
চাঁদের কিছু এলাকায় জীবাণুর টিকে থাকার সম্ভাবনা
গবেষণার ফল অনুযায়ী, চাঁদের কিছু নির্দিষ্ট এলাকায় পৃথিবীর জীবাণু তুলনামূলকভাবে দীর্ঘ সময় টিকে থাকতে পারে। বিশেষ করে যেসব গর্তে সূর্যের আলো কখনোই পৌঁছায় না, সেসব স্থানে জীবাণুর বেঁচে থাকার সম্ভাবনা বেশি।
গবেষকদের মতে, শরৎ ও শীতের মতো নির্দিষ্ট সময়েও কিছু জীবাণু চাঁদের পরিবেশে কয়েক সপ্তাহ থেকে কয়েক মাস পর্যন্ত টিকে থাকতে পারে।
পরীক্ষা করা দুটি ছত্রাক তিন ধরনের ব্যাকটেরিয়ার তুলনায় বেশি সহনশীল বলে প্রমাণিত হয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি সহনশীল ছিল অ্যাসপারজিলাস নাইজার নামের এক ধরনের ছত্রাক, যা সাধারণত উষ্ণ অঞ্চলে বেশি দেখা যায় এবং কালো ছাঁচ হিসেবেও পরিচিত।
মানুষের সঙ্গে চাঁদে পৌঁছাতে পারে জীবাণু
অ্যাসপারজিলাস সাধারণত উষ্ণ ও স্যাঁতসেঁতে পরিবেশে জন্মায়। বাড়ির গোসলখানা থেকে শুরু করে বায়ু চলাচল ও তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণের বিভিন্ন ব্যবস্থাতেও এটি পাওয়া যায়। আন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশনেও এই ছত্রাকের উপস্থিতি শনাক্ত করেছেন মহাকাশচারীরা।
গবেষণায় ফুসারিয়াম নামের কয়েক ধরনের মাটিতে বসবাসকারী ছত্রাকও পরীক্ষা করা হয়েছে। এগুলোও প্রতিকূল পরিবেশে টিকে থাকার ক্ষেত্রে যথেষ্ট সক্ষমতা দেখিয়েছে।
গবেষণার প্রধান লেখক প্রাবাল সাক্সেনার মতে, চাঁদের মেরু অঞ্চলের পরিবেশে টিকে থাকার ক্ষেত্রে অ্যাসপারজিলাস সবচেয়ে বেশি সক্ষম। ফুসারিয়ামও তুলনামূলকভাবে শক্তিশালী হলেও অ্যাসপারজিলাসের মতো সহনশীল নয়।
যে তিন ব্যাকটেরিয়াকে পরীক্ষা করা হয়েছে
গবেষণায় ডেইনোকক্কাস রেডিওডিউরানস, স্ট্যাফাইলোকক্কাস অরিয়াস এবং ব্যাসিলাস সাবটিলিস—এই তিন ধরনের ব্যাকটেরিয়া পরীক্ষা করা হয়।
ডেইনোকক্কাস রেডিওডিউরানস মাটিতে পাওয়া যায় এবং ঠান্ডা ও বিকিরণ সহ্য করার জন্য এটি পরিচিত। স্ট্যাফাইলোকক্কাস অরিয়াস সাধারণত মানুষের ত্বক ও নাকের ভেতরে পাওয়া যায়। অন্যদিকে ব্যাসিলাস সাবটিলিস মাটি, উদ্ভিদ এবং মানুষের পরিপাকতন্ত্রেও থাকতে পারে।
তবে এই ব্যাকটেরিয়াগুলো ছত্রাকের তুলনায় অতিবেগুনি রশ্মির প্রতি বেশি সংবেদনশীল বলে গবেষণায় দেখা গেছে। তিনটির মধ্যে ডেইনোকক্কাস সবচেয়ে বেশি সহনশীল হলেও স্ট্যাফাইলোকক্কাস ও ব্যাসিলাস তুলনামূলকভাবে কম সময় টিকে থাকতে পারে।
তীব্র তাপ ও বিকিরণ বড় হুমকি

চাঁদের পরিবেশে জীবাণুর জন্য সবচেয়ে বড় হুমকিগুলোর মধ্যে রয়েছে অতিবেগুনি রশ্মি, তীব্র তাপ, মহাজাগতিক কণার বিকিরণ এবং চাঁদের পৃষ্ঠের প্রাকৃতিক শূন্যতা।
চাঁদের দিনের তাপমাত্রা প্রায় ১২৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত উঠতে পারে। তারপরও গবেষণার কম্পিউটার মডেলে এমন কিছু এলাকা শনাক্ত হয়েছে, যেখানে জীবাণু টিকে থাকার মতো পরিবেশ তৈরি হতে পারে।
কিছু গর্তের তলদেশ কয়েক কিলোমিটার পর্যন্ত বিস্তৃত হতে পারে এবং এসব এলাকাকে জীবাণুর জন্য সম্ভাব্য নিরাপদ আশ্রয়স্থল হিসেবে দেখা হয়েছে। এমনকি কিছু সূর্যালোক পৌঁছানো এলাকাতেও অ্যাসপারজিলাসের টিকে থাকার সম্ভাবনা পাওয়া গেছে।
তবে গবেষকরা স্পষ্ট করেছেন, এই গবেষণায় জীবাণুগুলো শুধু টিকে থাকতে পারে কি না, সেটিই পরীক্ষা করা হয়েছে। সেখানে তারা বংশবিস্তার বা বৃদ্ধি করতে পারবে কি না, তা পরীক্ষা করা হয়নি।
বরফ ও মাটির ওপর পড়তে পারে প্রভাব
গবেষকদের মতে, কিছু পরিস্থিতিতে জীবাণু চাঁদের মাটির নিচে চাপা পড়ে যেতে পারে। এতে তারা তীব্র বিকিরণ থেকে সুরক্ষা পেতে পারে এবং তুলনামূলক উষ্ণ পরিবেশে টিকে থাকতে পারে।
এ ছাড়া চাঁদের কিছু এলাকায় বরফ হিসেবে পানি রয়েছে। বিশেষ পরিস্থিতিতে সেখানে অল্প পরিমাণ তরল পানির সৃষ্টি হলে জীবাণুর বৃদ্ধি বা সক্রিয় হওয়ার সম্ভাবনাও তৈরি হতে পারে।
এ ধরনের জীবাণু চাঁদের পানি ও অন্যান্য সম্পদের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন গবেষকরা। ভবিষ্যতে মহাকাশচারীদের জন্য এসব সম্পদ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
তবে জীবাণুগুলো চাঁদের পরিবেশে পরিবর্তিত হয়ে মানুষের জন্য আরও বিপজ্জনক রোগজীবাণুতে পরিণত হবে কি না, তা এই গবেষণায় পরীক্ষা করা হয়নি।
ভবিষ্যৎ চন্দ্র অভিযানে বাড়ছে দূষণের উদ্বেগ
যুক্তরাষ্ট্র ও চীন আবারও চাঁদের মাটিতে মানুষ পাঠানোর পরিকল্পনা করছে। ১৯৭২ সালের পর দীর্ঘমেয়াদি চন্দ্র অভিযান ও সেখানে স্থায়ী ঘাঁটি তৈরির পরিকল্পনাও এগিয়ে চলছে। যুক্তরাষ্ট্রের আর্টেমিস কর্মসূচির অন্যতম লক্ষ্য হলো চাঁদের দক্ষিণ মেরু এলাকায় মহাকাশচারী পাঠানো।
এই পরিস্থিতিতে পৃথিবীর জীবাণু অনিচ্ছাকৃতভাবে চাঁদে পৌঁছে গেলে তা ভবিষ্যতের বৈজ্ঞানিক গবেষণায় বিভ্রান্তি তৈরি করতে পারে।
মানুষের শরীরে স্বাভাবিকভাবেই অসংখ্য জীবাণু থাকে। ফলে মহাকাশচারীদের পোশাক, যন্ত্রপাতি কিংবা বিভিন্ন মহাকাশযানের মাধ্যমে কিছু জীবাণু চাঁদের মাটিতে পৌঁছে যাওয়া পুরোপুরি ঠেকানো কঠিন হতে পারে।
গবেষকদের মতে, এসব জীবাণু ভবিষ্যতের চাঁদের মাটি ও নমুনা বিশ্লেষণে সমস্যা তৈরি করতে পারে। চাঁদের মাটিতে থাকা রাসায়নিক উপাদান বা জৈব অণুর উৎস নির্ধারণের সময় পৃথিবী থেকে নিয়ে যাওয়া জীবাণুর কারণে বিভ্রান্তি সৃষ্টি হতে পারে।
তাই ভবিষ্যৎ চন্দ্র অভিযানে কোন কোন জীবাণু পৃথিবী থেকে সঙ্গে যাচ্ছে, তা সঠিকভাবে শনাক্ত ও নথিভুক্ত করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















