চীনের বেসরকারি মহাকাশ গবেষণায় বড় ধরনের সাফল্য এসেছে। পুনর্ব্যবহারযোগ্য ঝু-চু-৩ রকেটের প্রথম ধাপ সফলভাবে উৎক্ষেপণের পর স্থলভাগে ফিরিয়ে আনতে সক্ষম হয়েছে দেশটি। এর মাধ্যমে প্রথমবারের মতো চীনে অবতরণ পা ব্যবহার করে কোনো রকেটের প্রথম ধাপ নিয়ন্ত্রিতভাবে স্থলভাগে পুনরুদ্ধার করা হলো।
সফল উৎক্ষেপণ ও অবতরণ
১৯ আগস্ট সকালে উত্তর-পশ্চিম চীনের বাণিজ্যিক মহাকাশ উদ্ভাবন পরীক্ষাকেন্দ্র থেকে ঝু-চু-৩ ওয়াই-২ রকেটটি উৎক্ষেপণ করা হয়। স্থানীয় সময় সকাল ৭টা ৩৫ মিনিটে আকাশে ওঠার প্রায় ১৩৭ সেকেন্ড পর রকেটটির প্রথম ও দ্বিতীয় ধাপ আলাদা হয়ে যায়।
এরপর প্রথম ধাপটি নির্ধারিত প্রত্যাবর্তন প্রক্রিয়ায় প্রবেশ করে। উচ্চতায় অবস্থান পরিবর্তন, পুনঃপ্রবেশের সময় গতিনিয়ন্ত্রণ, নিয়ন্ত্রিত বায়ুগতীয় উড্ডয়ন, অবতরণের আগে গতি কমানো এবং অবতরণ পা মেলে ধরাসহ একাধিক জটিল ধাপ সফলভাবে সম্পন্ন করে এটি।
শেষ পর্যন্ত প্রথম ধাপটি উত্তর-পশ্চিম চীনের কানসু প্রদেশের মিনছিন জেলার নির্ধারিত স্থানে নিরাপদে অবতরণ করে। অন্যদিকে দ্বিতীয় ধাপটি উড্ডয়ন অব্যাহত রেখে হংহু-০৩ উপগ্রহকে নির্ধারিত কক্ষপথে স্থাপন করে। পুরো অভিযান সফল হয়েছে।
পুনর্ব্যবহারযোগ্য রকেট প্রযুক্তিতে বড় অগ্রগতি
এই সাফল্য চীনের পুনর্ব্যবহারযোগ্য রকেট প্রযুক্তির জন্য গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হিসেবে দেখা হচ্ছে। এর আগে ১০ জুলাই লং মার্চ-১০বি রকেটের প্রথম ধাপ সমুদ্রে স্থাপিত জালে সফলভাবে আটকে পুনরুদ্ধার করা হয়েছিল। তবে এবার প্রথমবারের মতো স্থলভাগে অবতরণ পা ব্যবহার করে নিয়ন্ত্রিতভাবে রকেটের প্রথম ধাপ ফিরিয়ে আনা হলো।
ঝু-চু-৩ তৈরি করেছে চীনের বেসরকারি মহাকাশ প্রতিষ্ঠান ল্যান্ডস্পেস। রকেটটি তরল অক্সিজেন ও মিথেন জ্বালানিচালিত নতুন প্রজন্মের উৎক্ষেপণযান। কম খরচে বেশি সংখ্যক এবং ঘন ঘন মহাকাশ উৎক্ষেপণের লক্ষ্যেই এর নকশা করা হয়েছে।
রকেটটির প্রযুক্তিগত বৈশিষ্ট্য
ঝু-চু-৩ দুই ধাপের রকেট। এর দৈর্ঘ্য প্রায় ৬৬ দশমিক ১ মিটার এবং উভয় ধাপের মূল কাঠামোর ব্যাস ৪ দশমিক ৫ মিটার। উপগ্রহ বহনের আবরণটির ব্যাস ৫ দশমিক ২ মিটার।
রকেটটির প্রধান কাঠামো স্টেইনলেস স্টিল দিয়ে তৈরি। এতে তরল অক্সিজেনের ট্যাংকের ওপরে মিথেনের ট্যাংক রাখা হয়েছে, যাতে উড্ডয়নের সময় ভারকেন্দ্রের ভারসাম্য ভালো থাকে।
প্রথম ধাপে রয়েছে নয়টি তরল অক্সিজেন-মিথেন ইঞ্জিন। এসব ইঞ্জিনের শক্তি নির্ধারিত ক্ষমতার ৪০ থেকে ১১০ শতাংশ পর্যন্ত নিয়ন্ত্রণ করা যায়।

আগের ব্যর্থতা থেকে শিক্ষা
ঝু-চু-৩-এর প্রথম পরীক্ষামূলক উড্ডয়ন হয়েছিল গত বছরের ডিসেম্বরে। সে সময় দ্বিতীয় ধাপ নির্ধারিত কক্ষপথে পৌঁছাতে পারলেও প্রথম ধাপ পুনরুদ্ধারের প্রচেষ্টা সফল হয়নি।
আগের অভিযানের তথ্য ও প্রকৌশলগত অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে নতুন সংস্করণে বেশ কিছু পরিবর্তন আনা হয়। অবতরণের সময় চালু করা ইঞ্জিনের সংখ্যা কমানো হয়েছে, যাতে ব্যবস্থাটি সরল হয় এবং নির্ভরযোগ্যতা বাড়ে। একই সঙ্গে অবতরণের সম্ভাব্য স্থান আগেভাগে নির্ধারণ ও নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থা উন্নত করা হয়েছে।
পুনঃপ্রবেশের সময় প্রচণ্ড যান্ত্রিক চাপ ও তাপের বিরুদ্ধে রকেটের সহনশীলতাও বাড়ানো হয়েছে। এসব পরিবর্তনের ফলেই এবার প্রথম ধাপটি সফলভাবে পৃথিবীতে ফিরিয়ে আনা সম্ভব হয়েছে।
কম খরচে মহাকাশ উৎক্ষেপণের সম্ভাবনা
পুনর্ব্যবহারযোগ্য রকেটের সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো উৎক্ষেপণ ব্যয় কমানোর সম্ভাবনা। তরল অক্সিজেন-মিথেন জ্বালানির খরচ সাধারণত একটি উৎক্ষেপণের মোট ব্যয়ের মাত্র ১ থেকে ৩ শতাংশ। বিপরীতে রকেটের প্রথম ধাপ তৈরিতেই মোট ব্যয়ের প্রায় ৭০ শতাংশ পর্যন্ত খরচ হতে পারে।
ফলে একটি প্রথম ধাপ বারবার ব্যবহার করা গেলে প্রতিটি নতুন উৎক্ষেপণে ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো সম্ভব। তবে বাস্তবে কতটা সাশ্রয় হবে, তা নির্ভর করবে পুনরুদ্ধার করা রকেটের পরীক্ষা, রক্ষণাবেক্ষণ, ইঞ্জিনের আয়ু, জ্বালানি ট্যাংক, অবতরণ ব্যবস্থা এবং পরবর্তী উড্ডয়নের প্রস্তুতিতে কত সময় ও অর্থ লাগে তার ওপর।
ল্যান্ডস্পেস জানিয়েছে, তারা উদ্ধার করা প্রথম ধাপটি যত দ্রুত সম্ভব আবার উড্ডয়ন করাতে চায়। এর মাধ্যমে উৎক্ষেপণ, পুনরুদ্ধার, পরীক্ষা ও পুনঃব্যবহারের একটি পূর্ণ চক্র তৈরি করার লক্ষ্য রয়েছে।
উপগ্রহ বহনে নতুন যুগের ইঙ্গিত
ঝু-চু-৩-এর এই সাফল্য চীনের নিম্ন-পৃথিবী কক্ষপথে বৃহৎ উপগ্রহসমষ্টি তৈরির পরিকল্পনাকেও এগিয়ে নিতে পারে। একই সঙ্গে বিপুল সংখ্যায় উপগ্রহ উৎপাদন এবং ঘন ঘন রকেট উৎক্ষেপণের সক্ষমতা পরস্পরকে আরও শক্তিশালী করবে।
এই অভিযানে বহন করা হংহু-০৩ উপগ্রহটিও সেই প্রবণতার উদাহরণ। এর নকশার শুরু থেকেই মূল যন্ত্রাংশ থেকে পূর্ণাঙ্গ ব্যবস্থা পর্যন্ত ব্যাপক হারে উৎপাদনের উপযোগী প্রযুক্তি ব্যবহারের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
চীনের মহাকাশ কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, দেশটি পুনর্ব্যবহারযোগ্য উৎক্ষেপণযানের কার্যকর ব্যবহার আরও এগিয়ে নেবে। এর ফলে ভবিষ্যতে কম খরচে, বেশি ক্ষমতায় এবং আরও ঘন ঘন মহাকাশে যাওয়ার সক্ষমতা বাড়বে।
ঝু-চু-৩-এর সফল অবতরণ তাই শুধু একটি রকেটের প্রত্যাবর্তন নয়; বরং বাণিজ্যিক মহাকাশযাত্রাকে আরও সাশ্রয়ী ও নিয়মিত করার পথে চীনের একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















