ইরানকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সামরিক তৎপরতার মধ্যেই মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতি আবারও ভয়াবহ অনিশ্চয়তার দিকে যাচ্ছে। যুদ্ধের প্রভাব এখন শুধু ইরান ও তার আশপাশের দেশগুলোতেই সীমাবদ্ধ নেই; জ্বালানি সরবরাহ, সমুদ্রপথ, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য, বিমান চলাচল এবং বিশ্ব অর্থনীতিতেও এর চাপ স্পষ্ট হয়ে উঠছে।
সাম্প্রতিক পরিস্থিতিতে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের ওপর নতুন করে কঠোর অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা আরোপের উদ্যোগ নিয়েছে। একই সঙ্গে মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইঙ্গিত দিয়েছেন, হরমুজ প্রণালি কিংবা ইরানের আশপাশে সামরিক পদক্ষেপের সম্ভাবনাও পুরোপুরি বাতিল করা হয়নি। ফলে কূটনৈতিক সমাধানের পাশাপাশি সামরিক উত্তেজনা আরও বাড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল কমেছে
বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহনপথ হরমুজ প্রণালিতে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে। সোমবার মাত্র দুটি পণ্যবাহী জাহাজ এই গুরুত্বপূর্ণ জলপথ অতিক্রম করেছে, যা গত তিন মাসের মধ্যে সর্বনিম্ন দৈনিক সংখ্যা।
হরমুজের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগের কারণে অনেক জাহাজ কোম্পানি ঝুঁকি এড়িয়ে চলার চেষ্টা করছে। এর মধ্যেই ওমানের উপকূলের কাছে একটি তেলবাহী জাহাজ অজ্ঞাত একটি ক্ষেপণাস্ত্র বা গোলার আঘাতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। জাহাজটির ইঞ্জিন কক্ষে ক্ষতি হলেও কোনো হতাহতের খবর পাওয়া যায়নি।
গত ছয় মাসে হরমুজ ও আশপাশের জলসীমায় ৬৮টি সংঘর্ষ বা হামলার ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে। এসব ঘটনায় অন্তত ২০ জন নাবিক ও বন্দরকর্মী নিহত এবং ৩৫ জন আহত হয়েছেন। একজন এখনও নিখোঁজ রয়েছেন।
বিশ্ব জ্বালানি বাজারে বড় ঝুঁকি
হরমুজ প্রণালিতে অস্থিরতার কারণে বিশ্বের জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থা বড় ধরনের ঝুঁকির মুখে পড়েছে। বিশ্লেষকদের হিসাবে উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে প্রতিদিন প্রায় ৫০ থেকে ৭০ লাখ ব্যারেল তেল সরবরাহে বিঘ্ন ঘটছে।
তবে নতুন মার্কিন নিষেধাজ্ঞার ঘোষণার পর তেলের দাম বরং কমেছে। আন্তর্জাতিক বাজারে উত্তর সাগরের তেলের দাম প্রায় এক শতাংশ কমে ব্যারেলপ্রতি ৯১ ডলারের কাছাকাছি নেমেছে। যুক্তরাষ্ট্রের তেলের দামও কমেছে।
বাজারের এই প্রতিক্রিয়া ইঙ্গিত করছে, বিনিয়োগকারীরা আপাতত সরাসরি সামরিক হামলার চেয়ে অর্থনৈতিক চাপকে তুলনামূলক কম ঝুঁকিপূর্ণ পরিস্থিতি হিসেবে দেখছেন। তবে ইরান যদি হরমুজে জাহাজ চলাচল আরও বাধাগ্রস্ত করে, তাহলে তেলের বাজারে আবারও বড় ধরনের মূল্যবৃদ্ধি হতে পারে।
কাতারের কড়া অবস্থান
ইরানের সঙ্গে সংঘাতের প্রভাব যাতে উপসাগরীয় অন্যান্য দেশেও ছড়িয়ে না পড়ে, সে বিষয়ে সতর্ক অবস্থান নিয়েছে কাতার। দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, কোনো তৃতীয় পক্ষের হামলার পর ইরান আঞ্চলিক দেশগুলোকে সংঘাতে টেনে আনার চেষ্টা করলে কাতার তা প্রত্যাখ্যান করবে।
একই সঙ্গে কাতার যুক্তরাষ্ট্রের ইরানবিষয়ক নিষেধাজ্ঞাকে একতরফা পদক্ষেপ হিসেবে অভিহিত করেছে এবং সংকট নিরসনে মধ্যস্থতার উদ্যোগকে সমর্থন জানিয়েছে। উপসাগরীয় দেশগুলো সম্ভাব্য বিভিন্ন পরিস্থিতি মোকাবিলায় নিজেদের মধ্যে সমন্বয়ও বাড়িয়েছে।
চীনের সঙ্গে ইরানের সম্পর্কেও চাপ
ইরানের ওপর নতুন মার্কিন নিষেধাজ্ঞার প্রভাব চীনের ওপরও পড়েছে। ওয়াশিংটনের পদক্ষেপের পর বেইজিং জানিয়েছে, তারা নিজেদের অধিকার ও স্বার্থ রক্ষায় প্রয়োজনীয় সব ব্যবস্থা নেবে।
চীন স্পষ্ট করেছে, আন্তর্জাতিক আইনের কাঠামোর মধ্যেই ইরানের সঙ্গে তাদের সহযোগিতা পরিচালিত হচ্ছে এবং এই সম্পর্ক কোনোভাবেই বাধাগ্রস্ত করা উচিত নয়। ফলে ইরানকে কেন্দ্র করে যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যকার অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক টানাপোড়েন আরও বাড়তে পারে।
পাকিস্তানের কূটনৈতিক তৎপরতা
সংঘাত কমাতে পাকিস্তানও সক্রিয় কূটনৈতিক উদ্যোগ চালিয়ে যাচ্ছে। দেশটির সামরিক ও রাজনৈতিক প্রতিনিধিরা ইরানের শীর্ষ নেতৃত্বের সঙ্গে বৈঠক করেছেন। আলোচনায় ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সংঘাত, হরমুজ প্রণালি পুনরায় সচল করা এবং স্থায়ীভাবে উত্তেজনা কমানোর উপায় নিয়ে আলোচনা হয়েছে।
পাকিস্তানের উদ্যোগকে ইরানের নেতৃত্ব ইতিবাচকভাবে গ্রহণ করেছে বলে দেশটির সামরিক কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে। আলোচনায় ভবিষ্যৎ সমঝোতার পথ তৈরির বিষয়েও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
বিশ্ব অর্থনীতিতে যুদ্ধের ছায়া
ইরান যুদ্ধের প্রভাব ইউরোপের আর্থিক বাজারেও পড়েছে। ইউরোপের বিভিন্ন দেশের দীর্ঘমেয়াদি সরকারি ঋণের সুদের হার বহু বছরের উচ্চ অবস্থানের কাছাকাছি রয়েছে। বিনিয়োগকারীরা জ্বালানি সংকট ও যুদ্ধজনিত মূল্যস্ফীতির ঝুঁকি বিবেচনা করছেন।
তবে জার্মান অর্থনীতি সাম্প্রতিক ধাক্কা সামলে তুলনামূলক ভালো অবস্থানে রয়েছে। চলতি বছরের দ্বিতীয় প্রান্তিকে দেশটির অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি আগের হিসাবের চেয়ে কিছুটা বেশি হয়েছে। রপ্তানি বৃদ্ধিই এই প্রবৃদ্ধির প্রধান কারণ বলে সরকারি পরিসংখ্যানে উঠে এসেছে।
তানজানিয়ার গ্যাস প্রকল্পে নতুন সম্ভাবনা
মধ্যপ্রাচ্যের জ্বালানি সরবরাহে অনিশ্চয়তা আফ্রিকার তানজানিয়ায় দীর্ঘদিন ধরে আটকে থাকা বিশাল গ্যাস প্রকল্পের গুরুত্বও বাড়িয়ে দিয়েছে। সেখানে প্রায় ৪২ বিলিয়ন ডলার ব্যয়ে একটি তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস রপ্তানি প্রকল্প গড়ে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে।
প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে এশিয়ার বাজারে মধ্যপ্রাচ্যের বাইরে আরও একটি বড় জ্বালানি সরবরাহের উৎস তৈরি হতে পারে। মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংকটের কারণে বিকল্প জ্বালানি উৎসের প্রয়োজনীয়তা যে কতটা বেড়েছে, তানজানিয়ার প্রকল্পকে ঘিরে নতুন আগ্রহ তারই একটি উদাহরণ।
যুদ্ধের সমাধান কি কূটনীতিতে?
ইরানকে ঘিরে বর্তমান পরিস্থিতি এখন এমন এক পর্যায়ে পৌঁছেছে, যেখানে সামরিক সংঘাতের পাশাপাশি অর্থনৈতিক চাপও বড় অস্ত্র হয়ে উঠেছে। হরমুজ প্রণালির নিরাপত্তা, তেলের সরবরাহ, আঞ্চলিক দেশগুলোর নিরাপত্তা এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্য—সবকিছুই একই সংকটের সঙ্গে যুক্ত হয়ে পড়েছে।
একদিকে যুক্তরাষ্ট্র নিষেধাজ্ঞার মাধ্যমে ইরানের ওপর চাপ বাড়াচ্ছে, অন্যদিকে ইরানও পাল্টা প্রতিক্রিয়ার হুঁশিয়ারি দিচ্ছে। এর মাঝখানে কাতার, পাকিস্তানসহ কয়েকটি দেশ আলোচনার মাধ্যমে উত্তেজনা কমানোর চেষ্টা করছে।
সবচেয়ে বড় প্রশ্ন এখন একটাই—এই সংঘাত কি আরও বিস্তৃত হবে, নাকি কূটনীতির মাধ্যমে একটি স্থায়ী সমাধানের পথ তৈরি হবে? হরমুজ প্রণালির পরিস্থিতি এবং আগামী কয়েক দিনের রাজনৈতিক সিদ্ধান্তই সেই প্রশ্নের উত্তর নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















