পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবিরের দ্বৈত নাগরিকত্ব নিয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে পাল্টা প্রশ্ন তোলার ঘটনাকে ‘শুট দ্য মেসেঞ্জার’ বা প্রশ্নকারীকে আক্রমণের সংস্কৃতি হিসেবে অভিহিত করেছে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)। সংস্থাটি বলেছে, এ ধরনের আচরণ ক্ষমতাচ্যুত স্বৈরাচারী শাসনামলের চর্চার কথা মনে করিয়ে দেয় এবং তা গণমাধ্যমের স্বাধীনতা, স্বাধীন সাংবাদিকতা, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ও জনগণের তথ্য জানার অধিকারকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে।
মঙ্গলবার এক বিবৃতিতে টিআইবি বলেছে, জনস্বার্থে সাংবাদিকদের উত্থাপিত প্রশ্নের সরাসরি উত্তর দেওয়া উচিত ছিল প্রতিমন্ত্রীর। পাল্টা প্রশ্ন না তুলে দ্বৈত নাগরিকত্বের বিষয়ে নিজের অবস্থান স্পষ্ট করা প্রয়োজন ছিল। কারণ, তাঁর নিয়োগকে ঘিরে চলমান বিতর্কের কেন্দ্রে রয়েছে নাগরিকত্বের এই প্রশ্ন।
দ্বৈত নাগরিকত্ব নিয়ে সাংবিধানিক প্রশ্ন
টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেছেন, একাধিক গণমাধ্যমের প্রতিবেদনে হুমায়ুন কবিরের বিদেশি নাগরিকত্ব এবং সংশ্লিষ্ট দেশে সক্রিয় রাজনীতিতে সম্পৃক্ততার তথ্য উঠে এসেছে। তাঁর দাবি, দ্বৈত নাগরিকত্ব বহাল থাকা অবস্থায় টেকনোক্র্যাট কোটায় পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হিসেবে নিয়োগ পাওয়া সাংবিধানিক প্রশ্ন তৈরি করে।
সংবিধানের ৫৬(২) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, সংসদ সদস্য নন এমন কাউকে মন্ত্রী বা প্রতিমন্ত্রী করা হলে তাঁকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়ার যোগ্য হতে হয়। অন্যদিকে ৬৬(২)(গ) অনুচ্ছেদে বিদেশি রাষ্ট্রের নাগরিকত্ব অর্জন বা সেই রাষ্ট্রের প্রতি আনুগত্য স্বীকারকারী ব্যক্তিকে সংসদ সদস্য নির্বাচনের অযোগ্য বলা হয়েছে। দ্বৈত নাগরিকত্বের ক্ষেত্রে বিদেশি নাগরিকত্ব ত্যাগের বিষয়েও ৬৬(২ক) অনুচ্ছেদে বিধান রয়েছে।
টিআইবির মতে, এসব বিধানের আলোকে হুমায়ুন কবিরের দ্বৈত নাগরিকত্ব বহাল থাকা অবস্থায় টেকনোক্র্যাট কোটায় নিয়োগের সাংবিধানিক বৈধতা স্পষ্ট করা জরুরি।
সাংবাদিকদের প্রশ্নে সরাসরি জবাবের আহ্বান
ইফতেখারুজ্জামান বলেন, দায়িত্বশীল রাষ্ট্রীয় পদে থেকে জনস্বার্থের গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নের সরাসরি, তথ্যভিত্তিক উত্তর দেওয়া প্রত্যাশিত। প্রয়োজনীয় নথি ও প্রমাণ প্রকাশ করে প্রতিমন্ত্রী চাইলে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে পারতেন।
কিন্তু দ্বৈত নাগরিকত্ব নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশকারী গণমাধ্যম ও প্রশ্ন তোলা সাংবাদিকদের প্রতি তাঁর ক্ষুব্ধ ও আক্রমণাত্মক পাল্টা প্রতিক্রিয়া রাষ্ট্রীয় প্রতিমন্ত্রীর মর্যাদা ও দায়িত্বের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয় বলে মন্তব্য করেছে টিআইবি।
সংস্থাটি বলেছে, ক্ষমতাসীন বা রাষ্ট্রীয় পদে থাকা ব্যক্তিদের অস্বস্তিকর বিষয়ে প্রশ্ন করার ক্ষেত্রে সাংবাদিকদের ওপর এ ধরনের চাপ স্বাধীন সাংবাদিকতার জন্য হুমকি তৈরি করতে পারে। এতে সাংবাদিকদের মধ্যে আত্মনিয়ন্ত্রণ বা ‘চিলিং ইফেক্ট’ তৈরি হওয়ার আশঙ্কা থাকে, যা শেষ পর্যন্ত জনগণের জানার অধিকারকে দুর্বল করে।
সরকারের কাছে তথ্য প্রকাশের দাবি
টিআইবি বলেছে, পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রীর মতো গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় পদে থাকা ব্যক্তিকে ঘিরে নাগরিকত্বের প্রশ্নের দ্রুত ও নির্ভরযোগ্য সমাধান প্রয়োজন। বিষয়টি আন্তর্জাতিক পরিসরেও বাংলাদেশের ভাবমূর্তির ওপর প্রভাব ফেলতে পারে বলে সতর্ক করেছে সংস্থাটি।
এ কারণে হুমায়ুন কবিরের প্রকৃত নাগরিকত্বের অবস্থান সম্পর্কে সঠিক ও যাচাইযোগ্য তথ্য প্রকাশ এবং তাঁর নিয়োগের সাংবিধানিক বৈধতা নিয়ে যথাযথ সিদ্ধান্ত নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে টিআইবি।
একই সঙ্গে কোনো মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী বা সমপর্যায়ের পদধারীর দ্বৈত নাগরিকত্ব নিয়ে প্রশ্ন উঠলে স্বচ্ছতা ও সাংবিধানিক জবাবদিহির স্বার্থে তাঁদের নাগরিকত্বসংক্রান্ত অবস্থান এবং সংশ্লিষ্ট সরকারি নথিপত্র জনসমক্ষে প্রকাশের দাবি জানিয়েছে সংস্থাটি।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















