ভারত-পাকিস্তান বিভক্তির ইতিহাস শুধু একটি ভূখণ্ডের ভাগ হয়ে যাওয়ার গল্প নয়, এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে অসংখ্য মানুষের হারানো ঘর, বিচ্ছিন্ন পরিবার, ভেঙে যাওয়া সম্পর্ক এবং বুকের ভেতর জমে থাকা অসংখ্য স্মৃতি। সেই বেদনাময় ইতিহাসকেই ভালোবাসা ও ব্যক্তিগত স্মৃতির আবহে পর্দায় তুলে ধরেছে ‘ম্যায় ওয়াপস আউঙ্গা’।
১২ জুন মুক্তি পাওয়া ছবিটির কাহিনি আবর্তিত হয়েছে ইশার সিং গ্রেওয়ালকে ঘিরে। বিভক্তির বহু দশক পরও অতীতের ক্ষত যার জীবনকে প্রভাবিত করে চলেছে। প্রবীণ ইশারের চরিত্রে নাসিরুদ্দিন শাহ এবং তরুণ বয়সের ইশারের ভূমিকায় অভিনয় করেছেন বেদাং রায়না। ছবিটি পরিচালনা করেছেন ইমতিয়াজ আলি।
হারানো ভালোবাসার স্মৃতিতে ফিরে দেখা অতীত
ইশারের জীবনে আফসানা ছিলেন গভীর ভালোবাসার মানুষ। কিন্তু দেশভাগের নির্মম বাস্তবতা তাদের আলাদা করে দেয়। বহু বছর পরও সেই বিচ্ছেদের স্মৃতি ইশারের মনে জীবন্ত হয়ে থাকে। আফসানার চরিত্রে অভিনয় করেছেন শার্ভারি।
অন্যদিকে ইশারের নাতি নির্বৈর তার দাদার নীরবতা ও অস্পষ্ট স্মৃতির আড়ালে লুকিয়ে থাকা অতীতকে বোঝার চেষ্টা করে। দিলজিৎ দোসাঞ্জ অভিনীত এই চরিত্রের মাধ্যমে নতুন প্রজন্মের সামনে পুরোনো প্রজন্মের হারানো ইতিহাসকে তুলে ধরা হয়েছে।
শুধু সীমান্ত নয়, মানুষের যন্ত্রণা
ছবিটি দেশভাগকে কেবল দুটি দেশের রাজনৈতিক বিভাজন হিসেবে দেখেনি। বরং সেই সময় সাধারণ মানুষের জীবনে নেমে আসা বিপর্যয়কে গল্পের কেন্দ্রে রাখা হয়েছে।
সহিংসতা, রক্তপাত, ঘরবাড়ি হারানো, স্বজন থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়া এবং কঠিন পারিবারিক সিদ্ধান্তের মধ্য দিয়ে দেখানো হয়েছে কীভাবে একটি ঐতিহাসিক ঘটনা অসংখ্য মানুষের ব্যক্তিগত জীবনকে চিরতরে বদলে দিয়েছিল।
নির্মাতার ব্যক্তিগত স্মৃতিও জড়িয়ে
ছবিটির গল্পের সঙ্গে নির্মাতার ব্যক্তিগত স্মৃতিরও গভীর যোগ রয়েছে। শৈশবের চারটি বছর সরগোধায় কাটিয়েছিলেন তিনি। সেই শহরের সঙ্গে জড়িয়ে আছে বন্ধুত্ব, বিদ্যালয়জীবন এবং নানা প্রিয় স্মৃতি।
তার দাদাও দেশভাগের সময় মাত্র ১৩ বছর বয়সে সেই ভয়াবহ অভিজ্ঞতার সাক্ষী হয়েছিলেন। জীবনের শেষ পর্যন্ত তিনি সেই সময়ের স্মৃতি বহন করেছেন। ফলে ছবির আবেগ ও স্মৃতির জগৎ কেবল কল্পিত নয়, এর পেছনে রয়েছে ব্যক্তিগত ইতিহাসের ছায়াও।
অভিনয় ও সংগীতে আবেগের গভীরতা
প্রবীণ ইশারের চরিত্রে নাসিরুদ্দিন শাহের অভিনয়ে সংলাপের চেয়ে অভিব্যক্তি, বিরতি ও নীরবতাই বেশি শক্তিশালী হয়ে উঠেছে। তার অভিনয়ে বহু বছরের জমে থাকা কষ্ট ও না-বলা কথাগুলো দর্শকের কাছে স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
বেদাং রায়না, শার্ভারি ও দিলজিৎ দোসাঞ্জও নিজেদের চরিত্রে গল্পের আবেগকে আরও গভীর করেছেন। এ আর রহমানের সংগীত ছবিটির আবহকে আরও হৃদয়স্পর্শী করে তুলেছে। মোহিত চৌহান ও দিলজিৎ দোসাঞ্জের কণ্ঠে গানগুলোও গল্পের অনুভূতির সঙ্গে মিশে গেছে।
অতীতকে নতুন প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দেওয়ার গল্প
‘ম্যায় ওয়াপস আউঙ্গা’ শেষ পর্যন্ত মনে করিয়ে দেয়, দেশভাগের সীমারেখা মানচিত্রে আঁকা হলেও তার ক্ষত মানুষের স্মৃতি থেকে সহজে মুছে যায় না। যারা সেই সময় দেখেছেন, তাদের কাছে দেশভাগ এখনো ব্যক্তিগত বেদনা ও হারানোর ইতিহাস।
পাকিস্তানে ছবিটির প্রদর্শন হলে প্রবীণ প্রজন্ম নিজেদের অতীতের স্মৃতির সঙ্গে আবারও মুখোমুখি হওয়ার সুযোগ পেতে পারে। একই সঙ্গে তরুণ প্রজন্মও বুঝতে পারবে, একটি সীমান্ত তৈরির পেছনে কত মানুষের স্বপ্ন, সম্পর্ক ও জীবন হারিয়ে গিয়েছিল।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















