কাবুল পতনের পাঁচ বছর পরও আফগানিস্তানের নারীদের জীবন যেন ক্রমেই সংকুচিত হয়ে আসছে। এক আফগান নারীর ভাষায়, ‘আমরা টিকে আছি, কিন্তু বেঁচে নেই।’ দেশটির প্রায় ২ কোটি ২০ লাখ নারী ও কন্যাশিশু এমন এক ব্যবস্থার মধ্যে আটকে আছেন, যেখানে জনজীবন থেকে তাদের সরিয়ে দেওয়াই যেন নীতিতে পরিণত হয়েছে।
একের পর এক অধিকার কেড়ে নেওয়া
২০২১ সালের আগস্টে তালেবান আফগানিস্তানের ক্ষমতা নেওয়ার পর ষষ্ঠ শ্রেণির পর মেয়েদের পড়াশোনায় নিষেধাজ্ঞাকে সাময়িক বলে দাবি করেছিল। কিন্তু সেই প্রতিশ্রুতি আর বাস্তবায়িত হয়নি। বরং সময়ের সঙ্গে নারীদের শিক্ষা, চাকরি, চিকিৎসাসেবা ও চলাফেরার স্বাধীনতার ওপর একের পর এক বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছে।
বর্তমানে নারীদের শরীর ও মুখ সম্পূর্ণ আবৃত করে বাইরে বের হওয়ার নির্দেশ রয়েছে। নির্দিষ্ট ধরনের পোশাক নিষিদ্ধ। অপরিচিত পুরুষের দিকে তাকানোও নিষেধ। নারীদের গান গাওয়া, আবৃত্তি করা কিংবা এমনভাবে কথা বলা নিষিদ্ধ, যাতে অন্যরা তাদের কণ্ঠ শুনতে পায়। পুরুষ অভিভাবক ছাড়া একা ভ্রমণেও রয়েছে নিষেধাজ্ঞা। নারী-পুরুষের মেলামেশা, সংগীতসহ জনজীবনের বহু স্বাভাবিক কর্মকাণ্ড থেকেও নারীদের দূরে রাখা হয়েছে।
পাঁচ বছর আগের আফগানিস্তান এখন কত দূরে
তালেবান কাবুল দখলের আগের দিনও লাখ লাখ আফগান কন্যাশিশু শ্রেণিকক্ষে বসে পড়াশোনা করছিল। দেশটির সংসদে এক-চতুর্থাংশের বেশি সদস্য ছিলেন নারী। নারী মন্ত্রী, বিচারক ও অধ্যাপক ছিলেন। নারীরা হেলিকপ্টার চালিয়েছেন, মঞ্চে গান গেয়েছেন, ছবি এঁকেছেন, অভিনয় করেছেন এবং মেয়েদের সংগীতদল পরিচালনা করেছেন।
আজ সেই বাস্তবতার খুব সামান্যই অবশিষ্ট আছে।
ক্ষুধা ও দারিদ্র্যের সঙ্গে লড়াই
নারীদের ওপর নিষেধাজ্ঞার পাশাপাশি দেশটিতে মানবিক সংকটও গভীর হচ্ছে। অনেক পরিবার খাবারের ব্যবস্থা করতে গিয়ে চরম সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হচ্ছে। কোথাও শিশুবিবাহের আয়োজন করা হচ্ছে, কোথাও পরিবারের অন্য সদস্যদের বাঁচাতে সন্তান বিক্রির মতো মর্মান্তিক ঘটনাও ঘটছে।
এক নারী জানিয়েছেন, আগে তারা দিনে দুই বেলা খাবার খেতে পারতেন। এখন এক বেলাতেই সীমাবদ্ধ থাকতে হচ্ছে। একটি রুটিও ভাগ হয়ে নেমে এসেছে অর্ধেকের পরিমাণে।
পরিষ্কার পানি ও মৌলিক চিকিৎসাসেবার সুযোগও কমেছে। কর্মক্ষেত্র থেকে নারীদের বড় অংশকে দূরে রাখায় পরিবারগুলোর আর্থিক সংকট আরও তীব্র হয়েছে।
সাহায্যের চেয়ে প্রয়োজন অর্থনৈতিক সুযোগ
আফগান নারীদের চাওয়া শুধু ত্রাণ নয়। তারা চান এমন অর্থনৈতিক ব্যবস্থা, যেখানে কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে এবং পরিবারগুলো নিজেদের উপার্জনে টিকে থাকতে পারবে। তারা চান মেয়েরা আবার বিদ্যালয়ে ফিরুক। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় যেন তাদের অধিকারহীন অবস্থাকে আফগানিস্তানের অভ্যন্তরীণ বিষয় বলে এড়িয়ে না যায়, সেই দাবিও জানাচ্ছেন তারা।
এক আফগান নারী বলেছেন, প্রতিদিন তালেবান নতুন নতুন বিধিনিষেধ জারি করছে, আর তাতে তাদের জীবনের পরিসর আরও ছোট হয়ে যাচ্ছে।
নীরবতা কি মেনে নেওয়ার নাম?
আন্তর্জাতিক বিশ্বের নীরবতাই এখন সবচেয়ে বড় উদ্বেগের বিষয় হয়ে উঠছে। কোনো বিদেশি প্রতিনিধিদল তালেবানের সঙ্গে বৈঠক করলে সেখানে একজন আফগান নারীও না থাকলে সেটি নারীদের কণ্ঠকে অগ্রাহ্য করার বার্তা দেয়। একইভাবে, বাস্তবতার যুক্তিতে কাবুলের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার উদ্যোগও নারীদের জনজীবন থেকে নির্বাসনকে এক ধরনের স্বীকৃতি দিতে পারে।
নারী ও কন্যাশিশুদের সুরক্ষায় নির্দিষ্টভাবে সহায়তা না করলে অনেক উদ্যোগই অসম্পূর্ণ থেকে যায়। এমনকি গোপনে পরিচালিত বিদ্যালয়গুলোও বহু মেয়ের শিক্ষার শেষ আশ্রয় হয়ে আছে।
সমস্যাটি গোপন নয়। মানবাধিকার পর্যবেক্ষকেরা তা নথিবদ্ধ করছেন, প্রতিবেদন প্রকাশিত হচ্ছে এবং ভুক্তভোগী নারীরা নিজেরাই তাদের অভিজ্ঞতার কথা জানাচ্ছেন। কিন্তু বিশ্বের মনোযোগ ধীরে ধীরে সরে যাচ্ছে। পাঁচ বছর ধরে চলতে থাকা সংকট এখন অনেকের কাছে যেন স্বাভাবিক বাস্তবতা হয়ে উঠছে। আর এখানেই সবচেয়ে বড় বিপদ।
নারীদের বাদ দিয়ে অর্থনীতি ঘুরে দাঁড়াবে কীভাবে
নারীদের শিক্ষা ও কর্মসংস্থান থেকে বাদ দিয়ে কোনো দেশের অর্থনীতি দীর্ঘমেয়াদে শক্তিশালী হতে পারে না। আফগানিস্তানের মোট জনসংখ্যার প্রায় অর্ধেককে উৎপাদনশীল কর্মকাণ্ডের বাইরে রাখা শুধু অধিকার লঙ্ঘন নয়, এটি পুরো অর্থনীতির ওপর অতিরিক্ত বোঝা তৈরি করছে।
দেশটিকে স্থিতিশীল করার যেকোনো আন্তর্জাতিক পরিকল্পনায় তাই নারীদের শিক্ষা, কর্মসংস্থান ও অর্থনৈতিক অংশগ্রহণকে কেন্দ্রীয় বিষয় হিসেবে বিবেচনা করা জরুরি।
আজকের কাবুলে একজন সাধারণ নারীর সকাল কল্পনা করলেই পরিস্থিতির ভয়াবহতা বোঝা যায়। তিনি সম্পূর্ণ আবৃত হয়ে বাড়ি থেকে বের হন, সঙ্গে পুরুষ আত্মীয় না থাকলে বাইরে যাওয়ার সুযোগ সীমিত। বিদ্যালয়ে ষষ্ঠ শ্রেণির পর তার পড়াশোনা থেমে গেছে। বিশ্ববিদ্যালয়ে যাওয়ার স্বপ্নও বাস্তবায়িত হয়নি। পার্কে প্রবেশের সুযোগ নেই। কোথাও বাধার মুখে পড়লে প্রতিকার চাওয়ার পথও অত্যন্ত সীমিত।
দিন শেষে তিনি আবার বাড়ি ফেরেন। পরদিনও একই বাস্তবতা অপেক্ষা করে থাকে।
এমন একটি সকাল যদি প্রতিদিন ২ কোটি ২০ লাখ নারীর জীবনে ফিরে আসে, পাঁচ বছর ধরে চলতে থাকে, তাহলে এই সংকটের ব্যাপ্তি সহজেই অনুমান করা যায়।
এক নারী বলেছেন, ‘আমরা যদি কথা বলতে না পারি, তাহলে বেঁচে থাকার অর্থ কী? আমরা যেন চলাফেরা করা মৃতদেহ।’
এটি কোনো অলঙ্কারিক বক্তব্য নয়; এটি এমন এক ব্যবস্থার অধীনে প্রতিদিনের জীবনের নির্মম বর্ণনা, যেখানে মানুষকে নীরব, নির্ভরশীল ও অদৃশ্য করে তোলা হচ্ছে।
তারপরও আফগান নারীরা প্রতিরোধ থামাননি। তারা মেয়েদের বড় করে তুলছেন, তাদের স্বপ্ন দেখাচ্ছেন এবং এমন এক ভবিষ্যতের অপেক্ষায় আছেন, যেখানে তারা নিজেদের জীবন নিজেরাই নির্ধারণ করতে পারবেন। এখন তাদের অপেক্ষা শুধু একটি প্রমাণের—বিশ্ব এখনও তাদের কথা শুনছে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















