রোহিঙ্গা মানবিক সহায়তায় ২০২৬ সালের যৌথ সাড়া পরিকল্পনার (জেআরপি) আওতায় বরাদ্দ অর্থের প্রায় ৮৮ শতাংশই জাতিসংঘের সংস্থাগুলোর নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। বিপরীতে শরণার্থী শিবিরে বরাদ্দ অর্থের মাত্র ২ দশমিক ৫ শতাংশ পাচ্ছে স্থানীয় বেসরকারি সংস্থাগুলো (এনজিও)। কক্সবাজারে মঙ্গলবার এক সংবাদ সম্মেলনে উপস্থাপিত এক গবেষণায় এ তথ্য উঠে এসেছে।
কক্সবাজার সিএসও-এনজিও ফোরাম (সিসিএনএফ) ও কোস্ট ফাউন্ডেশন আয়োজিত ‘রোহিঙ্গা সাড়ায় অর্থ যাচ্ছে কোথায়?’ শীর্ষক সংবাদ সম্মেলনে গবেষণার ফলাফল তুলে ধরা হয়। কক্সবাজার প্রেস ক্লাবে অনুষ্ঠিত এ আয়োজনে স্থানীয় সংগঠনগুলোর অংশগ্রহণ বাড়ানো এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও বাস্তবায়ন প্রক্রিয়ায় তাদের অর্থবহ সম্পৃক্ততার দাবি জানানো হয়।
জেআরপির অর্থ বণ্টনে বড় বৈষম্য
কোস্ট ফাউন্ডেশনের মো. শাহিনুর ইসলাম গবেষণার তথ্য উপস্থাপন করে জানান, ২০২৬ সালের জেআরপিতে ১৫ লাখ ৬০ হাজার মানুষের সহায়তার জন্য প্রয়োজন ৭১০ দশমিক ৫ মিলিয়ন মার্কিন ডলার।
গবেষণা অনুযায়ী, এই অর্থের ৮৭ দশমিক ৯৬ শতাংশ রয়েছে জাতিসংঘের বিভিন্ন সংস্থার হাতে। আন্তর্জাতিক এনজিওগুলোর হাতে রয়েছে ৭ দশমিক ৭৮ শতাংশ এবং জাতীয় এনজিওগুলোর হাতে ৪ দশমিক ২৬ শতাংশ। অন্যদিকে জেআরপিতে স্থানীয় এনজিওগুলো কোনো অর্থের জন্য আবেদনকারী অংশীদার হিসেবেই নেই।
শুধু রোহিঙ্গা শিবিরের জন্য বরাদ্দ অর্থের হিসাবেও বড় ব্যবধান দেখা গেছে। এ অর্থের ৬৩ দশমিক ৬ শতাংশ পাচ্ছে আন্তর্জাতিক এনজিও, ৩৩ দশমিক ৯ শতাংশ জাতীয় এনজিও এবং মাত্র ২ দশমিক ৫ শতাংশ স্থানীয় এনজিও।
যুক্তরাষ্ট্রের দেওয়া ১৫০ মিলিয়ন ডলারের ক্ষেত্রেও একই চিত্র উঠে এসেছে। এর ৯২ শতাংশ জাতিসংঘের সংস্থাগুলোর মাধ্যমে গেছে এবং বাকি ৮ শতাংশ পেয়েছে আন্তর্জাতিক এনজিও।
স্থানীয় এনজিওর সরাসরি অর্থপ্রাপ্তির দাবি
সংবাদ সম্মেলনে বক্তারা বলেন, অর্থের বড় অংশ জাতিসংঘের সংস্থা ও আন্তর্জাতিক এনজিওগুলোর মাধ্যমে প্রবাহিত হওয়ায় স্থানীয় সংগঠনগুলো কার্যত প্রান্তিক অবস্থানে রয়েছে। একই সঙ্গে এসব প্রতিষ্ঠানের পরিচালন ব্যয়ও উল্লেখযোগ্য বলে তারা দাবি করেন।
রোকেয়া ফাউন্ডেশনের অঞ্জুমান আরা বেগম মানবিক সহায়তা কার্যক্রমে স্থানীয় এনজিওগুলোর অর্থবহ সম্পৃক্ততার আহ্বান জানিয়ে অন্তত ২৫ শতাংশ মানবিক তহবিল সরাসরি স্থানীয় এনজিওগুলোর কাছে দেওয়ার দাবি জানান।
স্থানীয় এনজিও অগ্রযাত্রার নির্বাহী পরিচালক হেলাল উদ্দিন বলেন, বর্তমান জেআরপি ও পুলড ফান্ড ব্যবস্থায় স্থানীয় সংগঠনগুলোর অর্থপ্রাপ্তির সুযোগ নেই অথবা অত্যন্ত সীমিত। জেআরপিতে স্থানীয় সংগঠনগুলোকে আবেদনকারী অংশীদার হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করে সরাসরি তহবিলে প্রবেশাধিকার দেওয়ার দাবি জানান তিনি।
সাংবাদিক অ্যাসোসিয়েশন কক্সবাজারের সভাপতি নুরুল ইসলাম হেলালী বলেন, স্থানীয় এনজিওগুলোকে অর্থ দেওয়া কোনো দয়া নয়, বরং স্থানীয় সংগঠনগুলোর অধিকার।
হোস্ট কমিউনিটি ও পরিবেশ নিয়েও উদ্বেগ
রোহিঙ্গা সংকটের প্রভাব শুধু শরণার্থী শিবিরেই সীমাবদ্ধ নেই বলে সংবাদ সম্মেলনে বক্তারা উল্লেখ করেন। কক্সবাজারের স্থানীয় জনগোষ্ঠী, কৃষিজমি, পানি ও পরিবেশের ওপরও এর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়।
রাজাপালং ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য নুরুল কবির বলেন, শিবিরের ভেতরের এলাকায় বসবাসকারী স্থানীয় মানুষ কোনো সহায়তা পাচ্ছেন না, অথচ পাশের রোহিঙ্গারা বিভিন্ন ধরনের সহায়তা পাচ্ছেন।
উখিয়া অধিকার বাস্তবায়ন কমিটির সভাপতি রবিউল আলম পরিবেশ সুরক্ষা, ভূপৃষ্ঠের পানি সংরক্ষণ এবং কৃষিজমি পুনরুদ্ধারের ওপর গুরুত্ব দেন। হেলাল উদ্দিন বলেন, শিবিরের বর্জ্য স্থানীয় কৃষিজমির ক্ষতি করছে এবং এ সমস্যার স্থায়ী সমাধান প্রয়োজন।
প্রত্যাবাসনে অগ্রগতি না থাকায় হতাশা
নাসির উদ্দিন বলেন, রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে কোনো অগ্রগতি হয়নি। ফলে স্থানীয় জনগোষ্ঠীর মধ্যে হতাশা ও অনিশ্চয়তা বাড়ছে। রোহিঙ্গা সংকট কক্সবাজারের শিক্ষা খাতেও বড় প্রভাব ফেলেছে উল্লেখ করে স্থানীয় জনগণের শিক্ষা ও দক্ষতা উন্নয়নে দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগের প্রয়োজনীয়তার কথা বলেন তিনি।
সিসিএনএফের সদস্যসচিব জাহাঙ্গীর আলম বলেন, সংকটের টেকসই সমাধান ছাড়া শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান সম্ভব নয়। উখিয়া ইমাম সমিতির সাধারণ সম্পাদক জাফর আলম সংকট সমাধানে আসিয়ান, চীনসহ আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সংস্থার আরও সক্রিয় সম্পৃক্ততার আহ্বান জানান।
কক্সবাজার প্রেস ক্লাবের সাধারণ সম্পাদক মমতাজ উদ্দিন বাহারীও রোহিঙ্গা সংকটের কার্যকর ও টেকসই সমাধানের ওপর গুরুত্ব দেন। জাহাঙ্গীর আলমের সঞ্চালনায় অনুষ্ঠিত সংবাদ সম্মেলনে সিসিএনএফের সদস্য এবং বিভিন্ন গণমাধ্যমের সাংবাদিকরা উপস্থিত ছিলেন।
২০১৭ সালে রোহিঙ্গাদের বড় পরিসরে বাংলাদেশে প্রবেশের পর সংকটটি এখন দশম বছরে পড়েছে। আয়োজকদের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে কক্সবাজারে প্রায় ১২ লাখ রোহিঙ্গা শরণার্থী আশ্রয় নিয়ে আছে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















