অস্কারের ২০২৭ সালের আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র বিভাগে দক্ষিণ কোরিয়ার হয়ে লড়বে খ্যাতিমান নির্মাতা লি চ্যাং-দংয়ের নতুন চলচ্চিত্র ‘পসিবল লাভ’। দক্ষিণ কোরিয়ার চলচ্চিত্র পরিষদ ১৫ সদস্যের একটি বাছাই কমিটির মাধ্যমে ছবিটিকে দেশটির আনুষ্ঠানিক মনোনয়ন হিসেবে নির্বাচন করেছে।
আট বছর পর লি চ্যাং-দংয়ের নতুন ছবি
‘পসিবল লাভ’ নির্মাতা লি চ্যাং-দংয়ের আট বছর পর নির্মিত প্রথম পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র। এর আগে তার নির্মিত ‘বার্নিং’, ‘পোয়েট্রি’ ও ‘সিক্রেট সানশাইন’ আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র অঙ্গনে ব্যাপক প্রশংসা পেয়েছে।
নতুন ছবির গল্প আবর্তিত হয়েছে দুই বিবাহিত দম্পতিকে ঘিরে। এক অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ার পর তাদের জীবনের নানা ঘটনা পরস্পরের সঙ্গে জড়িয়ে যেতে শুরু করে। মি-ওক ও তার চাকরি হারানো স্বামী হো-সক তাদের ছোট ছেলে চিওলের সঙ্গে শান্ত জীবন কাটান। অন্যদিকে চলচ্চিত্র নির্মাতা ই-জি চাকরি হারানো শ্রমিকদের নিয়ে একটি প্রামাণ্যচিত্র তৈরি করছেন। তার স্বামী সাং-উ।
মি-ওক ই-জির প্রামাণ্যচিত্রে অংশ নিতে রাজি হওয়ার পর দুই নারীর মধ্যে ঘনিষ্ঠতা তৈরি হয়। একই সময়ে মি-ওকের মনে সাং-উকে ঘিরে এক ধরনের আকর্ষণ জন্ম নেয়। ধীরে ধীরে দুই পরিবারের জীবন একে অপরের সঙ্গে জড়িয়ে পড়তে থাকলে তাদের দাম্পত্য জীবনের লুকিয়ে থাকা টানাপোড়েনও প্রকাশ্যে আসতে শুরু করে।
মানবিক সম্পর্ক ও সামাজিক বাস্তবতার গল্প
বাছাই কমিটি ছবিটির নির্মাণশৈলী, পরিচালকের সুস্পষ্ট দৃষ্টিভঙ্গি এবং পুরো গল্পজুড়ে তৈরি হওয়া চাপ ও অস্বস্তির আবহকে বিশেষভাবে প্রশংসা করেছে। কমিটির মতে, চলচ্চিত্রটি নরম ও অদৃশ্য ধরনের সহিংসতা, অসম্পূর্ণ স্বাধীনতা এবং প্রকৃত সুখের অর্থ নিয়ে দর্শককে ভাবতে বাধ্য করবে।
ছবিতে শ্রমিক আন্দোলনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশও রয়েছে। এই দৃশ্যের মধ্য দিয়ে সমাজের নানা স্তরে থাকা জটিল বাস্তবতা ও অন্তর্নিহিত টানাপোড়েন ফুটে উঠেছে বলে মনে করছে বাছাই কমিটি।
কমিটি আরও বলেছে, ছবিটির মানবিক আবেদন ও সূক্ষ্ম পরিচালনা, বহুস্তরীয় চরিত্র সম্পর্ক এবং ভালোবাসা, আকাঙ্ক্ষা ও মানুষের অন্তর্নিহিত অপরাধবোধ নিয়ে ভাবনার জায়গাগুলো বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। চার প্রধান অভিনেতার অভিনয়কেও প্রায় নিখুঁত বলে প্রশংসা করা হয়েছে।
অস্কারে দক্ষিণ কোরিয়ার দীর্ঘ অপেক্ষা
আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র বিভাগে নির্মাতাকেন্দ্রিক ও নিজস্ব স্বরসম্পন্ন নাট্যধর্মী চলচ্চিত্রের সাফল্যের ইতিহাস রয়েছে। লি চ্যাং-দংয়ের ২০১৮ সালের ‘বার্নিং’ প্রথম দক্ষিণ কোরীয় চলচ্চিত্র হিসেবে অস্কারের আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র বিভাগের সংক্ষিপ্ত তালিকায় জায়গা করে নিয়েছিল।
এরপর বং জুন-হোর ‘প্যারাসাইট’ ২০২০ সালে আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র বিভাগে পুরস্কার জেতার পাশাপাশি শ্রেষ্ঠ চলচ্চিত্রের পুরস্কারও অর্জন করে। এটি ছিল ইংরেজি ভাষার বাইরে নির্মিত প্রথম চলচ্চিত্র, যা শ্রেষ্ঠ চলচ্চিত্রের অস্কার জিতেছিল।
পরবর্তী সময়ে পার্ক চান-উকের ‘ডিসিশন টু লিভ’ এবং ‘নো আদার চয়েস’ও সংক্ষিপ্ত তালিকায় জায়গা করে নেয়। তবে দুটির কোনোটিই চূড়ান্ত মনোনয়ন পায়নি।
উৎসব দিয়ে শুরু হবে যাত্রা
‘পসিবল লাভ’-এর বিশ্ব প্রিমিয়ার হবে ভেনিস চলচ্চিত্র উৎসবে। এরপর উত্তর আমেরিকায় ছবিটির প্রথম প্রদর্শনী হবে টরন্টো চলচ্চিত্র উৎসবে।
অস্কারের আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র বিভাগের নিয়ম অনুযায়ী, মনোনয়ন বিবেচনায় আসতে ছবিটিকে আগামী ৩০ সেপ্টেম্বরের মধ্যে দক্ষিণ কোরিয়ায় প্রেক্ষাগৃহে মুক্তি সম্পন্ন করতে হবে। দেশটিতে ছবিটির মুক্তি নির্ধারিত হয়েছে ২৩ সেপ্টেম্বর।
এরপর ২২ অক্টোবর অস্ট্রেলিয়ায় এবং ২৩ অক্টোবর যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা, যুক্তরাজ্য, আয়ারল্যান্ড ও জাপানে নির্বাচিত প্রেক্ষাগৃহে ছবিটি মুক্তি পাবে। বিশ্বব্যাপী অনলাইন প্রদর্শন শুরু হবে ৬ নভেম্বর থেকে।
অস্কারে বাড়তি প্রত্যাশা
উত্তর আমেরিকার সংবাদমাধ্যমে ছবিটি নিয়ে আগ্রহ ইতোমধ্যে তৈরি হয়েছে। ছবিটির পুরস্কার মৌসুমের প্রচারণায় বড় ধরনের প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে। এমনকি শ্রেষ্ঠ চলচ্চিত্রের পুরস্কারের দৌড়েও ছবিটিকে এগিয়ে নেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে বলে জানা গেছে।
লি চ্যাং-দংয়ের চলচ্চিত্রে ব্যক্তিগত সম্পর্ক, সামাজিক বাস্তবতা ও মানুষের অন্তর্গত দ্বন্দ্বের যে গভীর অনুসন্ধান দেখা যায়, ‘পসিবল লাভ’-এও তার প্রতিফলন ঘটেছে। ফলে অস্কারের আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র বিভাগে ছবিটি দক্ষিণ কোরিয়ার জন্য আবারও বড় সাফল্যের সম্ভাবনা তৈরি করতে পারে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















