ইউরোপীয় ইউনিয়নে যোগদানের আলোচনা আবার শুরু করার প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছেন আইসল্যান্ডের ভোটাররা। দেশটির সম্প্রচারমাধ্যমের প্রকাশিত প্রাথমিক ফল অনুযায়ী, সংখ্যাগরিষ্ঠ ভোটার ইইউর সঙ্গে সদস্যপদ নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু না করার পক্ষে মত দিয়েছেন। একটি নির্বাচনী এলাকার কিছু ভোট গণনা তখনও বাকি ছিল, তবে সেগুলো ফলাফল বদলানোর মতো প্রভাব ফেলবে বলে ধারণা করা হচ্ছিল না।
ইইউতে যোগ না দেওয়ার পক্ষে ভোট দেওয়ার পেছনে সবচেয়ে বড় কারণগুলোর একটি ছিল আইসল্যান্ডের সমুদ্রসীমা ও মৎস্যসম্পদের ওপর নিজেদের নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখার আকাঙ্ক্ষা। দেশটির বিরোধীরা দীর্ঘদিন ধরে বলে আসছেন, ইউরোপীয় ইউনিয়নের সদস্য হলে আইসল্যান্ডের মাছ ধরার অধিকার ও জাতীয় সার্বভৌমত্ব ঝুঁকিতে পড়তে পারে।
সরকারের ‘এখন না হলে কখনো নয়’ অবস্থান
প্রধানমন্ত্রী ক্রিস্ত্রুন ফ্রোস্তাদোত্তিরের সরকার ইইউ সদস্যপদ নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরুর পক্ষে প্রচারণা চালিয়েছিল। সরকারের যুক্তি ছিল, বর্তমান বাণিজ্যিক সংঘাত, আন্তর্জাতিক অস্থিরতা এবং আর্কটিক অঞ্চলে বাড়তে থাকা প্রতিদ্বন্দ্বিতার সময়ে ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক আইসল্যান্ডের জন্য একটি নিরাপত্তাবলয় তৈরি করতে পারে।
সরকার গণভোটটিকে অনেকটা ‘এখন না হলে কখনো নয়’ ধরনের সুযোগ হিসেবে তুলে ধরেছিল। প্রধানমন্ত্রী সতর্ক করেছিলেন, প্রস্তাব প্রত্যাখ্যাত হলে ভবিষ্যতে ইইউ সদস্যপদের প্রশ্নটি দীর্ঘ সময়ের জন্য আলোচনার বাইরে চলে যেতে পারে।
তবে ভোটারদের বড় অংশ সরকারের এই যুক্তিতে আশ্বস্ত হননি। ইইউবিরোধীরা মনে করেন, নিজেদের সিদ্ধান্ত নিজেরাই নেওয়া এবং সমুদ্রসম্পদের ওপর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখাই আইসল্যান্ডের জন্য বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
বহু বছরের পুরোনো বিতর্ক
ইইউতে যোগদানের প্রশ্নটি আইসল্যান্ডে নতুন নয়। ২০০৯ সালে ভয়াবহ আর্থিক সংকটের সময় দেশটি প্রথম ইউরোপীয় ইউনিয়নের সদস্যপদের আবেদন করেছিল। পরে ইইউবিরোধী একটি সরকার ২০১৩ সালে সদস্যপদ নিয়ে আলোচনা বন্ধ করে দেয়।
এরপর কয়েক বছর বিষয়টি অনেকটা চাপা থাকলেও ইউক্রেন যুদ্ধ, মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত, যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্যনীতি এবং আর্কটিক অঞ্চলের ভূরাজনৈতিক প্রতিযোগিতা নতুন করে সদস্যপদ বিতর্ককে সামনে নিয়ে আসে।
ইইউপন্থীরা মনে করেন, ইউরোপীয় ইউনিয়নে যোগ দিলে আইসল্যান্ডের অর্থনীতি আরও স্থিতিশীল হতে পারে এবং ভবিষ্যতে ইউরো গ্রহণের সুযোগ তৈরি হলে ঋণের সুদ ও জীবনযাত্রার ব্যয় কমানোর পথও খুলতে পারে।
সুদের হার ও জীবনযাত্রার ব্যয়ও বড় ইস্যু
গণভোটের প্রচারে নিরাপত্তার চেয়ে অর্থনীতি, সুদের হার, মৎস্যসম্পদ এবং জীবনযাত্রার ব্যয়ই বেশি গুরুত্ব পেয়েছে।
আইসল্যান্ডে মূল্যস্ফীতি ও উচ্চ সুদের হার সাধারণ মানুষের ওপর চাপ বাড়িয়েছে। দেশটির কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সুদের হার ছিল ৮ শতাংশ, যেখানে ইউরোপীয় কেন্দ্রীয় ব্যাংকের হার ২ দশমিক ২৫ শতাংশ।
![]()
ইইউপন্থীরা বলছেন, সদস্যপদ এবং সম্ভাব্যভাবে ইউরো গ্রহণের মাধ্যমে অর্থনীতিতে স্থিতিশীলতা আসতে পারে। তবে বিরোধীরা এই যুক্তিকে অতিরঞ্জিত বলে দাবি করেছেন। তাদের মতে, আইসল্যান্ডের অর্থনৈতিক সমস্যার সমাধান ব্রাসেলস থেকে আসবে না; দেশের রাজনৈতিক নেতৃত্বকেই এসব সমস্যা মোকাবিলা করতে হবে।
মাছের জলে নিয়ন্ত্রণ হারানোর আশঙ্কা
আইসল্যান্ডের ভোটারদের কাছে সবচেয়ে আবেগঘন বিষয়গুলোর একটি ছিল মৎস্যসম্পদ। দেশটির অর্থনীতি ও জাতীয় পরিচয়ের সঙ্গে মাছ ধরার খাত গভীরভাবে যুক্ত।
ইউরোপীয় ইউনিয়নের নিয়ম অনুযায়ী মাছ ধরার কোটা নির্ধারণে ঐতিহাসিকভাবে কোথায় কত মাছ ধরা হয়েছে, সেটিও বিবেচনায় নেওয়া হয়। আইসল্যান্ডের কিছু কর্মকর্তা যুক্তি দিয়েছেন, বহু দশক ধরে অন্য কোনো ইউরোপীয় দেশ আইসল্যান্ডের জলসীমায় মাছ না ধরায় সদস্য হলেও দেশটি নিজেদের জলসীমার ওপর যথেষ্ট নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখতে পারবে।
তবে ইইউবিরোধীরা এ আশ্বাসে আস্থা রাখেননি। তাদের আশঙ্কা, সদস্য হওয়ার শুরুতে কিছু ছাড়ের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হলেও দীর্ঘমেয়াদে আইসল্যান্ডের মৎস্যসম্পদের ওপর বাইরের নিয়ন্ত্রণ বাড়তে পারে।
ইউরোপের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ বার্তা
প্রায় চার লাখ জনসংখ্যার আইসল্যান্ডের এই সিদ্ধান্ত ইউরোপীয় ইউনিয়নের জন্যও রাজনৈতিকভাবে তাৎপর্যপূর্ণ। ব্রাসেলসের কিছু কর্মকর্তা আইসল্যান্ডকে তুলনামূলকভাবে সহজ ও কম ঝুঁকির সদস্যপদপ্রার্থী হিসেবে দেখছিলেন। দেশটি ইইউতে যোগ দিলে ইউরোপীয় ইউনিয়নের সম্প্রসারণ নিয়ে সংশয় কমানোর পাশাপাশি আর্কটিক অঞ্চলে জোটটির কৌশলগত অবস্থানও শক্তিশালী হতে পারত।
কিন্তু গণভোটের ফল সেই সম্ভাবনায় আপাতত বাধা তৈরি করল। একই সঙ্গে আইসল্যান্ডের ভোটাররা বুঝিয়ে দিলেন, আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক সুবিধার যুক্তির চেয়েও জাতীয় সার্বভৌমত্ব এবং নিজেদের মৎস্যসম্পদের নিয়ন্ত্রণ তাদের কাছে বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















