বন্যার খবর কখনো কখনো পানির মতোই আসে—প্রথমে নিঃশব্দে, তারপর মুহূর্তের মধ্যে সবকিছু গ্রাস করে নেওয়া এক প্রবল স্রোতের মতো।
সকালের ঘুম ভাঙার পর মোবাইল হাতে নিয়েই যে দৃশ্য চোখে পড়ে, তা বিশ্বাস করা কঠিন। যে জায়গায় কিছুক্ষণ আগেও রাস্তা ছিল, সেখানে ঘোলা পানির স্রোত। কাগজের মতো ভেঙে পড়ছে সেতু। স্রোতের ধাক্কায় পাশ ফিরে যাচ্ছে বাস। জানালার ভেতর থেকে আতঙ্কিত মানুষের হাত দেখা যাচ্ছে। দৃশ্যগুলো এতটাই অবাস্তব যে প্রথম প্রশ্নই জাগে—এগুলো কি সত্যি, নাকি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার তৈরি?
আমাদের সময়ের এ এক অদ্ভুত সংকট। বাস্তবতা এত দ্রুত ভয়াবহ হয়ে উঠছে যে তাকে বিশ্বাস করতেও আমাদের এখন প্রমাণ প্রয়োজন।
কয়েক সপ্তাহ আগেও হিমালয়ের বরফ নিয়ে লিখেছিলাম। এভারেস্টের কাছে খুম্বু আইসফলের নীল বরফ, বরফের স্তরের ধীর অথচ অবিরাম নড়াচড়া, চারপাশের নৈঃশব্দ্য—সব মিলিয়ে মনে হয়েছিল সেটি যেন পৃথিবীর এক আলাদা জগৎ। কিন্তু বরফও যেন শেষ পর্যন্ত নীরব থাকে না। তার গলন নিচে নেমে আসে পানি হয়ে, তারপর কাদা, পাথর ও ধ্বংসের স্রোত হয়ে।
হিমালয়ের বিপদ আর দূরের কোনো বৈজ্ঞানিক সতর্কবার্তা নয়
হিন্দুকুশ হিমালয় অঞ্চলকে বলা হয় ‘তৃতীয় মেরু’। মেরু অঞ্চলের বাইরে পৃথিবীর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বরফভাণ্ডারগুলোর একটি এই অঞ্চল। বৈজ্ঞানিক গবেষণা বহুদিন ধরেই বলছে, এই পার্বত্য অঞ্চল বৈশ্বিক গড়ের তুলনায় দ্রুত উষ্ণ হচ্ছে।

কিন্তু বৈজ্ঞানিক পরিভাষা যতই জটিল হোক, তার ফলাফল বোঝার জন্য কোনো গবেষণাগারে যেতে হয় না। নেপালের সাম্প্রতিক বিপর্যয়ই তার বাস্তব উদাহরণ।
একটি হিমবাহ থেকে গলে পড়া সামান্য পানি একসময় আরেকটি পানির সঙ্গে মিশে জমতে থাকে। পাথর ও বরফের তৈরি প্রাকৃতিক বাঁধের পেছনে গড়ে ওঠে হিমবাহ-হ্রদ। দূর থেকে সেটি শান্ত, নীল ও সুন্দর। কিন্তু সেই সৌন্দর্যের ভেতরেই লুকিয়ে থাকতে পারে ভয়াবহ ঝুঁকি।
ভূমিকম্প, ভূমিধস, তুষারধস কিংবা অস্বাভাবিক দ্রুত বরফ গলার ফলে এমন হ্রদের বাঁধ ভেঙে গেলে নেমে আসতে পারে হিমবাহ-হ্রদের আকস্মিক বন্যা বা জিএলওএফ। নেপালসহ হিমালয় অঞ্চলে এ ধরনের ঝুঁকি ক্রমেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।
সমস্যার সবচেয়ে বড় দিক হলো, এই পানির কোনো জাতীয় পরিচয় নেই।
নদী সীমান্ত বোঝে না
হিমালয়ের উঁচু অঞ্চল থেকে নেমে আসা নদীগুলো তিব্বত মালভূমি অতিক্রম করে নেপালের গভীর গিরিখাত দিয়ে ছুটে যায়, তারপর সমতলে নেমে ভারত ও বাংলাদেশের দিকে প্রবাহিত হয়। একটি নদীর উজানে যে বিপর্যয় শুরু হয়, তার অভিঘাত অনেক দূরের ভাটিতেও পৌঁছাতে পারে।
মানুষ মানচিত্রে সীমান্ত টানে। নদী সেই সীমারেখা মানে না।
এ কারণেই হিমালয়ের পরিবেশগত পরিবর্তনকে শুধু নেপালের অভ্যন্তরীণ সমস্যা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। নেপালের পাহাড়ে বরফ গলার অর্থ বাংলাদেশের নদী অববাহিকায়ও তার প্রভাব পড়ার সম্ভাবনা। উজানের পানি, পলি, আকস্মিক বন্যা—সবকিছুর সঙ্গে ভাটির মানুষের জীবন কোনো না কোনোভাবে যুক্ত।
কাঠমান্ডু থেকে বরিশাল—দূরত্ব যতই হোক, পানির গল্পটি একই।

অবিশ্বাসের যুগে প্রকৃতির ভয়াবহতা
নেপালের বন্যার ভিডিওগুলো দেখতে দেখতে আরেকটি বিষয় আমাকে ভাবায়। আমরা এখন এমন এক সময়ে বাস করছি, যখন চোখের সামনে দেখা দৃশ্যকেও সহজে সত্য বলে মেনে নিতে পারি না।
কৃত্রিম ছবি, সম্পাদিত ভিডিও এবং গভীরভাবে নকল করা দৃশ্য আমাদের বিশ্বাসের ভিত নড়িয়ে দিয়েছে। ফলে বাস্তব কোনো দুর্যোগের ছবিও প্রথমে আমাদের মনে সন্দেহ তৈরি করে। অথচ প্রকৃতির নিজের ক্ষমতাই কখনো কখনো এতটা বিস্ময়কর যে সেটিকে কৃত্রিম বলে মনে হয়।
ঘোলা পানির স্রোত, ভেসে যাওয়া ঘরবাড়ি, ভেঙে পড়া সেতু কিংবা মানুষের অসহায়ভাবে বাঁচার চেষ্টা—এসব কোনো প্রযুক্তির কল্পনা নয়। এগুলো বাস্তব মানুষের বাস্তব জীবন।
আর এই বাস্তবতার সবচেয়ে ভয়ংকর দিক হলো, আমরা বিশ্বাস করি বা না করি, পানি তার পথ থামায় না।
দুর্যোগের সামনে মানুষের অভিন্নতা
হিমালয়ের কাছে বসবাসকারী একজন মানুষ এবং বাংলাদেশের বদ্বীপের একজন মানুষ হয়তো একই ভাষায় কথা বলেন না। তাদের রাষ্ট্র আলাদা, রাজনীতি আলাদা, জীবনযাপনও আলাদা। কিন্তু জলবায়ু ও পানির চক্র তাদের এমন এক সম্পর্কে যুক্ত করে, যা কোনো পাসপোর্ট বা সীমান্ত দিয়ে বিচ্ছিন্ন করা যায় না।
উজানের বরফ গলে যে পানি নিচে নামে, সেটি শেষ পর্যন্ত ভাটির মানুষের জীবনেও পৌঁছাতে পারে। পাহাড়ের দুর্যোগ তাই সমতলের জন্যও সতর্কবার্তা।
আমরা রাষ্ট্র গড়েছি সীমারেখা দিয়ে, কিন্তু প্রকৃতি কাজ করে সংযোগের নিয়মে। একটি অঞ্চলের পরিবেশগত বিপর্যয় অন্য অঞ্চলের নিরাপত্তা, অর্থনীতি ও মানুষের জীবনের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে। জলবায়ু পরিবর্তনের যুগে এই বাস্তবতা আরও স্পষ্ট হয়ে উঠছে।
তাই হিমালয়কে রক্ষা করা মানে শুধু পাহাড়ের বরফ রক্ষা করা নয়। এর সঙ্গে যুক্ত নদী, কৃষি, জনবসতি এবং কোটি কোটি মানুষের ভবিষ্যৎও রক্ষা করা।

দূর থেকে দেখা বিপর্যয়ের দায়
দুর্যোগের ছবি যখন মোবাইলের পর্দায় আসে, তখন নিরাপদ দূরত্ব তৈরি হয়। আমরা দেখতে পারি, আতঙ্কিত হতে পারি, কিছুক্ষণ দুঃখ প্রকাশ করতে পারি—তারপর ফোনটি পাশে রেখে স্বাভাবিক জীবনে ফিরে যাই।
এখানেই একজন প্রত্যক্ষদর্শীর অস্বস্তি।
কারও ঘর যখন পানিতে ভেসে যাচ্ছে, তখন অন্য কারও উষ্ণ ঘরে বসে সেই দৃশ্য দেখা এক ধরনের অসহায়ত্ব তৈরি করে। আমরা সাহায্য করতে চাই, কিন্তু একই সঙ্গে জানি যে আমাদের দৈনন্দিন জীবন থেমে থাকবে না।
এই দ্বন্দ্বের সহজ কোনো সমাধান নেই। হয়তো প্রথম দায়িত্বই হলো চোখ সরিয়ে না নেওয়া। দুর্যোগকে সাময়িক কোনো খবর হিসেবে না দেখে তার পেছনের দীর্ঘমেয়াদি বাস্তবতাকে বোঝা। জলবায়ু পরিবর্তন, হিমবাহের গলন, নদী ব্যবস্থাপনা এবং আন্তঃসীমান্ত সহযোগিতাকে তাই রাজনৈতিক বক্তৃতার বিষয় না বানিয়ে বাস্তব নিরাপত্তার প্রশ্ন হিসেবে দেখতে হবে।
কারণ আজ যে পানি নেপালের পাহাড়ে বিপদ হয়ে নেমে এসেছে, কাল তার অন্য রূপ হয়তো আরও নিচের কোনো জনপদে দেখা দেবে।
একটি শিশুর হাতের বৃষ্টির পানি, নেপালের নদীর ঘোলা স্রোত আর তিব্বতের পাহাড়ে ধীরে ধীরে গলে যাওয়া বরফ—সবই একই জলচক্রের অংশ।
আমরা দীর্ঘদিন ভেবেছি, উজান আর ভাটি আলাদা। পাহাড় আর বদ্বীপ আলাদা। এক দেশের দুর্যোগ আর অন্য দেশের নিরাপত্তা আলাদা।
কিন্তু পানি সেই বিভাজন মানে না।
শেষ পর্যন্ত আমরা সবাই ভাটির মানুষ।
জাকির কিবরিয়া 


















