০৮:১৪ অপরাহ্ন, সোমবার, ৩১ অগাস্ট ২০২৬
টোকিওর বসন্ত ২০২৭: ইয়োশিওকুবোর পোশাকে নতুন জাপানি নান্দনিকতার ছোঁয়া টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে ভারত সফর নিয়ে কী ঘটেছিল, প্রকাশ করলে অবাক হবেন: তামিম আওয়ামী লীগকে সংসদ নির্বাচন থেকে ‘মাইনাস’ করার অভিযোগ আইপিইউতে ‘স্বাস্থ্যকর’ ভাবা জাইলিটলেই হৃদ্‌রোগের ঝুঁকি? গবেষণায় মিলল উদ্বেগজনক তথ্য ভোটেকোশি আকস্মিক বন্যায় মৃত ৯০৩, নিখোঁজ ৪,২৪৭; উদ্ধার ১০,৫৪১ অসুস্থ হওয়ার সামর্থ্যও নেই: চিকিৎসার খরচে আফগান পরিবারের নিঃস্ব হওয়ার গল্প চাকরি পেতে নেটওয়ার্কিংয়ে যে ভুলগুলো আপনাকে সবার অপছন্দের করে তুলতে পারে ডেঙ্গুতে চলতি বছর মৃত্যু ৯৭, হাসপাতালে নতুন ১১৬৩ রোগী প্রিপেইড মিটারে ‘ঘোস্ট বিল’ নেই, দীর্ঘ টোকেনের কারণ জানাল ডিপিডিসি সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের আমানত ফেরত ৭ সেপ্টেম্বর থেকে, একবারে তোলা যাবে পুরো মূলধন

জাকারবার্গের ‘জনগণের জন্য এআই’ গল্পে কেন আস্থা রাখা কঠিন

  • ডেভ লি
  • ০৭:০০:৩৭ অপরাহ্ন, সোমবার, ৩১ অগাস্ট ২০২৬
  • 3

মার্ক জাকারবার্গের সাম্প্রতিক দীর্ঘ প্রবন্ধটি পড়লে মনে হতে পারে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ভবিষ্যৎ নিয়ে মেটা এবার যেন সাধারণ মানুষের পক্ষেই দাঁড়িয়েছে। তাঁর বক্তব্যের কেন্দ্রীয় দাবি—মেটার তৈরি ‘পার্সোনাল সুপারইন্টেলিজেন্স’ মূলত ব্যক্তি মানুষের জন্য কাজ করবে, ব্যবসা বা সরকারকেন্দ্রিক এআই ব্যবস্থার বিকল্প তৈরি করবে এবং প্রযুক্তির ক্ষমতা কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের হাতে কেন্দ্রীভূত হওয়া ঠেকাবে।

শুনতে আকর্ষণীয়। কিন্তু মেটার অতীত, বর্তমান ব্যবসায়িক স্বার্থ এবং এআই নিয়ে জাকারবার্গের অবস্থানের বারবার পরিবর্তন বিবেচনায় নিলে এই আত্মপ্রচারের প্রতি সংশয় তৈরি হওয়াই স্বাভাবিক।

এআই নিয়ে জাকারবার্গের অবস্থান কতটা স্থির?

মেটা ওপেন না ক্লোজড এআই মডেলের পক্ষে—এই প্রশ্নে জাকারবার্গের অবস্থান একাধিকবার বদলেছে। এখন চীনা ওপেন-ওয়েট মডেলগুলোর দ্রুত অগ্রগতি এবং তুলনামূলক কম খরচে সেগুলোকে নিজেদের প্রয়োজন অনুযায়ী ব্যবহার করার সুযোগ প্রযুক্তি দুনিয়ায় আলোচনার কেন্দ্রে আসায় মেটা আবার ওপেন মডেলের সুবিধার কথা জোর দিয়ে বলছে।

জাকারবার্গের যুক্তি হলো, ওপেন-ওয়েট মডেল তৈরি ও প্রকাশ সহজ ও সস্তা হওয়া উচিত। এমনকি একটি মডেলকে ব্যবহার করে আরেকটি মডেল প্রশিক্ষণের মতো ‘ডিস্টিলেশন’ পদ্ধতিও যেন বাধাগ্রস্ত না হয়। প্রতিদ্বন্দ্বী কিছু এআই প্রতিষ্ঠান এই ধরনের চর্চার বিরোধিতা করে।

কিন্তু এখানে প্রশ্ন শুধু প্রযুক্তিগত নয়; প্রশ্ন বিশ্বাসযোগ্যতারও। যে প্রতিষ্ঠান দীর্ঘদিন ধরে বিপুল সংখ্যক মানুষের ডিজিটাল জীবনকে নিজের প্ল্যাটফর্মের ভেতরে কেন্দ্রীভূত করেছে, তাদের কাছ থেকে বিকেন্দ্রীকৃত প্রযুক্তির পক্ষে যুক্তি শুনলে অতীতের অভিজ্ঞতা মনে পড়বেই। উন্নয়নশীল দেশগুলোতে ইন্টারনেট ব্যবহারের কাঠামোকে নিজেদের প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে প্রভাবিত করার মেটার পুরোনো প্রচেষ্টাও এই সংশয়কে আরও জোরালো করে।

Mark Zuckerberg pens 6,500 words on why you need AI assistant

অর্থাৎ, মেটা সত্যিই বিকেন্দ্রীকরণ চায়, নাকি প্রতিযোগিতার বর্তমান পরিস্থিতিতে ওপেন এআইকে কৌশলগতভাবে বেশি সুবিধাজনক মনে করছে—এই প্রশ্ন এড়িয়ে যাওয়া যায় না।

‘মানুষের জন্য’ প্রযুক্তির বাস্তব হিসাব

জাকারবার্গ তাঁর বক্তব্যের পক্ষে মেটার বিনামূল্যের সেবা ব্যবহারকারী কোটি কোটি মানুষের উদাহরণ দিতে পারেন। একইভাবে লুইজিয়ানার রিচল্যান্ড প্যারিশের কথাও তিনি তুলে ধরেছেন। সেখানে মেটার ডেটা সেন্টার নির্মাণ থেকে পাওয়া কর-সুবিধার কারণে শিক্ষকরা ৫০ হাজার ডলারের বোনাস পেয়েছেন। স্থানীয় শিক্ষকদের গড় বেতন যখন প্রায় ৪০ হাজার ৯২০ ডলার, তখন এমন অর্থ অবশ্যই তাৎপর্যপূর্ণ।

কিন্তু একটি কর-সুবিধা থেকে পাওয়া সাময়িক অর্থনৈতিক লাভকে একটি প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের বৃহত্তর সামাজিক অবদানের প্রমাণ হিসেবে দেখানো কতটা যথার্থ?

এই গল্পের আরেকটি দিকও আছে। মেটা ডেটা সেন্টার নির্মাণে রাজ্য পর্যায়ে বিক্রয় করের ছাড় পায়। ২০২৫ সালে প্রতিষ্ঠানটির কার্যকর ফেডারেল আয়কর হারও ছিল মাত্র ৩ দশমিক ৫ শতাংশ। তাছাড়া নির্মাণকাজ শেষ হলে যে কর-রাজস্বের সুবিধা এখন দৃশ্যমান, সেটিও একই মাত্রায় থাকবে—এমন নিশ্চয়তা নেই। অথচ ডেটা সেন্টার দীর্ঘদিন ধরে বিপুল অর্থ উপার্জন করতে পারে।

তাই স্থানীয় জনগণের জন্য এককালীন বা স্বল্পমেয়াদি আর্থিক সুবিধা এবং এআই অবকাঠামো থেকে কোম্পানির দীর্ঘমেয়াদি মুনাফার মধ্যে ভারসাম্য কীভাবে তৈরি হবে, সেটিই আসল প্রশ্ন।

এক বিলিয়ন ডলারের প্রতিশ্রুতিই কি যথেষ্ট?

জাকারবার্গ তাঁর প্রবন্ধে ‘Future Is for Everyone Fund’ নামে ১ বিলিয়ন ডলারের একটি তহবিল গঠনের কথাও জানিয়েছেন। উদ্দেশ্য কী হবে, অর্থ কীভাবে বিতরণ করা হবে কিংবা এআই থেকে বিপুল রাজস্ব তৈরি হলে এই সহায়তার পরিমাণ কীভাবে বাড়বে—এসব বিষয়ে স্পষ্টতা খুবই সীমিত।

Zuckerberg says AI should empower people, not replace them, in new Meta  vision

এআই অবকাঠামোর অর্থনীতি যেখানে কয়েক বিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগ ও বিপুল শক্তি ব্যবহারের সঙ্গে যুক্ত, সেখানে ১ বিলিয়ন ডলারের একটি স্বেচ্ছামূলক তহবিলকে দীর্ঘমেয়াদি সামাজিক দায়বদ্ধতার বিকল্প হিসেবে দেখা কঠিন।

এখানেই জাকারবার্গের প্রচারের সঙ্গে বাস্তব রাজনীতির সম্পর্কটি স্পষ্ট হয়ে ওঠে।

এআই নিয়ে জনঅসন্তোষকে উপেক্ষা করা যাবে না

যুক্তরাষ্ট্রজুড়ে এআই কোম্পানি এবং তাদের ডেটা সেন্টার নির্মাণ নিয়ে জনমত ক্রমেই নেতিবাচক হচ্ছে। এসব স্থাপনা বিপুল পরিমাণ বিদ্যুৎ ও অন্যান্য সম্পদ ব্যবহার করে। ফলে বিভিন্ন এলাকায় নির্মাণ স্থগিত করার উদ্যোগ দেখা যাচ্ছে। এমনকি এআই অবকাঠামোর বিরোধিতাকে রাজনৈতিকভাবে স্পষ্ট অবস্থান হিসেবে নেওয়া প্রার্থীরাও বিভিন্ন নির্বাচনে সুবিধা পাচ্ছেন।

এই পরিস্থিতিতে জাকারবার্গের ‘সাধারণ মানুষের জন্য এআই’ বার্তা কেবল প্রযুক্তিগত দর্শন নয়; এর রাজনৈতিক তাৎপর্যও রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচন সামনে রেখে এআই কোম্পানিগুলোর প্রতি মানুষের ক্ষোভ কমানো তাদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

তাই জাকারবার্গ যখন বলেন, এআই উন্নয়নে এমনকি এক মাসের নীতিগত বিলম্বও চীনের জন্য এগিয়ে যাওয়ার সুযোগ তৈরি করবে, তখন সেটিকে শুধু প্রযুক্তিগত সতর্কতা হিসেবে দেখা যথেষ্ট নয়। এটি নীতিনির্ধারকদের ওপর চাপ তৈরির একটি রাজনৈতিক যুক্তিও বটে।

নিয়ন্ত্রণের বদলে ‘সহযোগিতা’—কার শর্তে?

জাকারবার্গের সমাধান হলো সহযোগিতা। কিন্তু সিলিকন ভ্যালির ভাষায় ‘সহযোগিতা’ শব্দটির অর্থ সবসময় সমান অংশীদারিত্ব নয়। অনেক সময় এর অর্থ দাঁড়ায়, কোম্পানিগুলো যেভাবে প্রযুক্তির বিকাশ চায়, নীতিনির্ধারণও যেন সেই সীমার মধ্যেই থাকে।

এখানেই সরকারের ভূমিকা নিয়ে মৌলিক প্রশ্ন ওঠে। এআই উন্নয়ন থামিয়ে দেওয়া যেমন বাস্তবসম্মত নয়, তেমনি দ্রুততার যুক্তিতে করনীতি, পরিবেশগত প্রভাব, স্থানীয় জনগণের স্বার্থ কিংবা প্রযুক্তিগত জবাবদিহিকে পাশ কাটানোও গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।

Turning the data center boom into long-term, local prosperity | Brookings

যুক্তরাষ্ট্রের স্থানীয় প্রশাসনগুলো যদি ডেটা সেন্টার নির্মাণের অনুমতি দেয়, তবে তাদের নিশ্চিত করতে হবে যে কোম্পানিগুলো দীর্ঘমেয়াদে ন্যায্য অংশ বহন করছে। সাময়িক কর-সুবিধা বা জনসংযোগমূলক অনুদান দিয়ে সেই দায় মেটানো সম্ভব নয়।

এআই যুগে প্রয়োজন নতুন কর কাঠামো

এআই অর্থনীতির সঙ্গে তাল মিলিয়ে করব্যবস্থাকেও নতুনভাবে ভাবতে হবে। প্রযুক্তি কোম্পানিগুলো যখন বিপুল অবকাঠামো তৈরি করে, বিপুল বিদ্যুৎ ব্যবহার করে এবং একই সঙ্গে বিপুল মুনাফার সম্ভাবনা তৈরি করে, তখন স্থানীয় সমাজের জন্য দায়বদ্ধতার বিষয়টি স্বেচ্ছামূলক অনুদানের ওপর ছেড়ে দেওয়া যায় না।

একটি কোম্পানি যখন রাজনৈতিক চাপের মুখে পড়ে তখন অনুদান দেবে, আর পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে সেই দায় কমে যাবে—এমন মডেল টেকসই নয়। দরকার এমন কর ও নিয়ন্ত্রণ কাঠামো, যেখানে এআই যুগের অর্থনৈতিক বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে কোম্পানিগুলোর অবদান নির্ধারিত হবে।

সবশেষে জাকারবার্গের প্রবন্ধের সবচেয়ে বড় দুর্বলতা সম্ভবত প্রযুক্তিগত নয়, বরং মানুষের সঙ্গে তাঁর দূরত্ব। স্মার্ট চশমা নিয়ে জনমনে যে গোপনীয়তা ও নজরদারির উদ্বেগ তৈরি হয়েছে, সেটিও তাঁর বক্তব্যে যথেষ্ট গুরুত্ব পায় না। একইভাবে সন্তানকে নিয়ে রান্নার জন্য এআই দিয়ে রেসিপি বেছে নেওয়া এবং স্বয়ংক্রিয়ভাবে উপকরণ অর্ডার করার উদাহরণও প্রযুক্তির মানবিক মূল্য নিয়ে অদ্ভুত এক ধারণা প্রকাশ করে। বাবা-মা ও সন্তানের একসঙ্গে কাজ শেখা, সময় কাটানো এবং নিজের হাতে কিছু করার অভিজ্ঞতাকে কেবল দক্ষতার ঘাটতি হিসেবে দেখা যায় না।

‘পার্সোনাল সুপারইন্টেলিজেন্স’ তাই এখনো একটি স্পষ্ট প্রযুক্তিগত রূপরেখার চেয়ে বেশি একটি আকর্ষণীয় ধারণা। এটি কীভাবে মানুষের জীবনে বাস্তব উপকার আনবে, কীভাবে ক্ষমতার কেন্দ্রীকরণ ঠেকাবে এবং এর সামাজিক ব্যয় কে বহন করবে—এসব প্রশ্নের উত্তর এখনো অস্পষ্ট।

জাকারবার্গের প্রচারণার সবচেয়ে বড় সমস্যা সেখানেই। এআইয়ের ভবিষ্যৎ নিয়ে মানুষকে আশ্বস্ত করতে শুধু ‘আমরা আপনাদের জন্য’ বলা যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন স্বচ্ছ নীতি, স্থায়ী আর্থিক দায়বদ্ধতা এবং এমন প্রযুক্তি ব্যবস্থা, যেখানে জনগণ কেবল ব্যবহারকারী নয়—সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রেও তাদের স্বার্থের বাস্তব মূল্য থাকে।

জনপ্রিয় সংবাদ

টোকিওর বসন্ত ২০২৭: ইয়োশিওকুবোর পোশাকে নতুন জাপানি নান্দনিকতার ছোঁয়া

জাকারবার্গের ‘জনগণের জন্য এআই’ গল্পে কেন আস্থা রাখা কঠিন

০৭:০০:৩৭ অপরাহ্ন, সোমবার, ৩১ অগাস্ট ২০২৬

মার্ক জাকারবার্গের সাম্প্রতিক দীর্ঘ প্রবন্ধটি পড়লে মনে হতে পারে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ভবিষ্যৎ নিয়ে মেটা এবার যেন সাধারণ মানুষের পক্ষেই দাঁড়িয়েছে। তাঁর বক্তব্যের কেন্দ্রীয় দাবি—মেটার তৈরি ‘পার্সোনাল সুপারইন্টেলিজেন্স’ মূলত ব্যক্তি মানুষের জন্য কাজ করবে, ব্যবসা বা সরকারকেন্দ্রিক এআই ব্যবস্থার বিকল্প তৈরি করবে এবং প্রযুক্তির ক্ষমতা কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের হাতে কেন্দ্রীভূত হওয়া ঠেকাবে।

শুনতে আকর্ষণীয়। কিন্তু মেটার অতীত, বর্তমান ব্যবসায়িক স্বার্থ এবং এআই নিয়ে জাকারবার্গের অবস্থানের বারবার পরিবর্তন বিবেচনায় নিলে এই আত্মপ্রচারের প্রতি সংশয় তৈরি হওয়াই স্বাভাবিক।

এআই নিয়ে জাকারবার্গের অবস্থান কতটা স্থির?

মেটা ওপেন না ক্লোজড এআই মডেলের পক্ষে—এই প্রশ্নে জাকারবার্গের অবস্থান একাধিকবার বদলেছে। এখন চীনা ওপেন-ওয়েট মডেলগুলোর দ্রুত অগ্রগতি এবং তুলনামূলক কম খরচে সেগুলোকে নিজেদের প্রয়োজন অনুযায়ী ব্যবহার করার সুযোগ প্রযুক্তি দুনিয়ায় আলোচনার কেন্দ্রে আসায় মেটা আবার ওপেন মডেলের সুবিধার কথা জোর দিয়ে বলছে।

জাকারবার্গের যুক্তি হলো, ওপেন-ওয়েট মডেল তৈরি ও প্রকাশ সহজ ও সস্তা হওয়া উচিত। এমনকি একটি মডেলকে ব্যবহার করে আরেকটি মডেল প্রশিক্ষণের মতো ‘ডিস্টিলেশন’ পদ্ধতিও যেন বাধাগ্রস্ত না হয়। প্রতিদ্বন্দ্বী কিছু এআই প্রতিষ্ঠান এই ধরনের চর্চার বিরোধিতা করে।

কিন্তু এখানে প্রশ্ন শুধু প্রযুক্তিগত নয়; প্রশ্ন বিশ্বাসযোগ্যতারও। যে প্রতিষ্ঠান দীর্ঘদিন ধরে বিপুল সংখ্যক মানুষের ডিজিটাল জীবনকে নিজের প্ল্যাটফর্মের ভেতরে কেন্দ্রীভূত করেছে, তাদের কাছ থেকে বিকেন্দ্রীকৃত প্রযুক্তির পক্ষে যুক্তি শুনলে অতীতের অভিজ্ঞতা মনে পড়বেই। উন্নয়নশীল দেশগুলোতে ইন্টারনেট ব্যবহারের কাঠামোকে নিজেদের প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে প্রভাবিত করার মেটার পুরোনো প্রচেষ্টাও এই সংশয়কে আরও জোরালো করে।

Mark Zuckerberg pens 6,500 words on why you need AI assistant

অর্থাৎ, মেটা সত্যিই বিকেন্দ্রীকরণ চায়, নাকি প্রতিযোগিতার বর্তমান পরিস্থিতিতে ওপেন এআইকে কৌশলগতভাবে বেশি সুবিধাজনক মনে করছে—এই প্রশ্ন এড়িয়ে যাওয়া যায় না।

‘মানুষের জন্য’ প্রযুক্তির বাস্তব হিসাব

জাকারবার্গ তাঁর বক্তব্যের পক্ষে মেটার বিনামূল্যের সেবা ব্যবহারকারী কোটি কোটি মানুষের উদাহরণ দিতে পারেন। একইভাবে লুইজিয়ানার রিচল্যান্ড প্যারিশের কথাও তিনি তুলে ধরেছেন। সেখানে মেটার ডেটা সেন্টার নির্মাণ থেকে পাওয়া কর-সুবিধার কারণে শিক্ষকরা ৫০ হাজার ডলারের বোনাস পেয়েছেন। স্থানীয় শিক্ষকদের গড় বেতন যখন প্রায় ৪০ হাজার ৯২০ ডলার, তখন এমন অর্থ অবশ্যই তাৎপর্যপূর্ণ।

কিন্তু একটি কর-সুবিধা থেকে পাওয়া সাময়িক অর্থনৈতিক লাভকে একটি প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের বৃহত্তর সামাজিক অবদানের প্রমাণ হিসেবে দেখানো কতটা যথার্থ?

এই গল্পের আরেকটি দিকও আছে। মেটা ডেটা সেন্টার নির্মাণে রাজ্য পর্যায়ে বিক্রয় করের ছাড় পায়। ২০২৫ সালে প্রতিষ্ঠানটির কার্যকর ফেডারেল আয়কর হারও ছিল মাত্র ৩ দশমিক ৫ শতাংশ। তাছাড়া নির্মাণকাজ শেষ হলে যে কর-রাজস্বের সুবিধা এখন দৃশ্যমান, সেটিও একই মাত্রায় থাকবে—এমন নিশ্চয়তা নেই। অথচ ডেটা সেন্টার দীর্ঘদিন ধরে বিপুল অর্থ উপার্জন করতে পারে।

তাই স্থানীয় জনগণের জন্য এককালীন বা স্বল্পমেয়াদি আর্থিক সুবিধা এবং এআই অবকাঠামো থেকে কোম্পানির দীর্ঘমেয়াদি মুনাফার মধ্যে ভারসাম্য কীভাবে তৈরি হবে, সেটিই আসল প্রশ্ন।

এক বিলিয়ন ডলারের প্রতিশ্রুতিই কি যথেষ্ট?

জাকারবার্গ তাঁর প্রবন্ধে ‘Future Is for Everyone Fund’ নামে ১ বিলিয়ন ডলারের একটি তহবিল গঠনের কথাও জানিয়েছেন। উদ্দেশ্য কী হবে, অর্থ কীভাবে বিতরণ করা হবে কিংবা এআই থেকে বিপুল রাজস্ব তৈরি হলে এই সহায়তার পরিমাণ কীভাবে বাড়বে—এসব বিষয়ে স্পষ্টতা খুবই সীমিত।

Zuckerberg says AI should empower people, not replace them, in new Meta  vision

এআই অবকাঠামোর অর্থনীতি যেখানে কয়েক বিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগ ও বিপুল শক্তি ব্যবহারের সঙ্গে যুক্ত, সেখানে ১ বিলিয়ন ডলারের একটি স্বেচ্ছামূলক তহবিলকে দীর্ঘমেয়াদি সামাজিক দায়বদ্ধতার বিকল্প হিসেবে দেখা কঠিন।

এখানেই জাকারবার্গের প্রচারের সঙ্গে বাস্তব রাজনীতির সম্পর্কটি স্পষ্ট হয়ে ওঠে।

এআই নিয়ে জনঅসন্তোষকে উপেক্ষা করা যাবে না

যুক্তরাষ্ট্রজুড়ে এআই কোম্পানি এবং তাদের ডেটা সেন্টার নির্মাণ নিয়ে জনমত ক্রমেই নেতিবাচক হচ্ছে। এসব স্থাপনা বিপুল পরিমাণ বিদ্যুৎ ও অন্যান্য সম্পদ ব্যবহার করে। ফলে বিভিন্ন এলাকায় নির্মাণ স্থগিত করার উদ্যোগ দেখা যাচ্ছে। এমনকি এআই অবকাঠামোর বিরোধিতাকে রাজনৈতিকভাবে স্পষ্ট অবস্থান হিসেবে নেওয়া প্রার্থীরাও বিভিন্ন নির্বাচনে সুবিধা পাচ্ছেন।

এই পরিস্থিতিতে জাকারবার্গের ‘সাধারণ মানুষের জন্য এআই’ বার্তা কেবল প্রযুক্তিগত দর্শন নয়; এর রাজনৈতিক তাৎপর্যও রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচন সামনে রেখে এআই কোম্পানিগুলোর প্রতি মানুষের ক্ষোভ কমানো তাদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

তাই জাকারবার্গ যখন বলেন, এআই উন্নয়নে এমনকি এক মাসের নীতিগত বিলম্বও চীনের জন্য এগিয়ে যাওয়ার সুযোগ তৈরি করবে, তখন সেটিকে শুধু প্রযুক্তিগত সতর্কতা হিসেবে দেখা যথেষ্ট নয়। এটি নীতিনির্ধারকদের ওপর চাপ তৈরির একটি রাজনৈতিক যুক্তিও বটে।

নিয়ন্ত্রণের বদলে ‘সহযোগিতা’—কার শর্তে?

জাকারবার্গের সমাধান হলো সহযোগিতা। কিন্তু সিলিকন ভ্যালির ভাষায় ‘সহযোগিতা’ শব্দটির অর্থ সবসময় সমান অংশীদারিত্ব নয়। অনেক সময় এর অর্থ দাঁড়ায়, কোম্পানিগুলো যেভাবে প্রযুক্তির বিকাশ চায়, নীতিনির্ধারণও যেন সেই সীমার মধ্যেই থাকে।

এখানেই সরকারের ভূমিকা নিয়ে মৌলিক প্রশ্ন ওঠে। এআই উন্নয়ন থামিয়ে দেওয়া যেমন বাস্তবসম্মত নয়, তেমনি দ্রুততার যুক্তিতে করনীতি, পরিবেশগত প্রভাব, স্থানীয় জনগণের স্বার্থ কিংবা প্রযুক্তিগত জবাবদিহিকে পাশ কাটানোও গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।

Turning the data center boom into long-term, local prosperity | Brookings

যুক্তরাষ্ট্রের স্থানীয় প্রশাসনগুলো যদি ডেটা সেন্টার নির্মাণের অনুমতি দেয়, তবে তাদের নিশ্চিত করতে হবে যে কোম্পানিগুলো দীর্ঘমেয়াদে ন্যায্য অংশ বহন করছে। সাময়িক কর-সুবিধা বা জনসংযোগমূলক অনুদান দিয়ে সেই দায় মেটানো সম্ভব নয়।

এআই যুগে প্রয়োজন নতুন কর কাঠামো

এআই অর্থনীতির সঙ্গে তাল মিলিয়ে করব্যবস্থাকেও নতুনভাবে ভাবতে হবে। প্রযুক্তি কোম্পানিগুলো যখন বিপুল অবকাঠামো তৈরি করে, বিপুল বিদ্যুৎ ব্যবহার করে এবং একই সঙ্গে বিপুল মুনাফার সম্ভাবনা তৈরি করে, তখন স্থানীয় সমাজের জন্য দায়বদ্ধতার বিষয়টি স্বেচ্ছামূলক অনুদানের ওপর ছেড়ে দেওয়া যায় না।

একটি কোম্পানি যখন রাজনৈতিক চাপের মুখে পড়ে তখন অনুদান দেবে, আর পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে সেই দায় কমে যাবে—এমন মডেল টেকসই নয়। দরকার এমন কর ও নিয়ন্ত্রণ কাঠামো, যেখানে এআই যুগের অর্থনৈতিক বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে কোম্পানিগুলোর অবদান নির্ধারিত হবে।

সবশেষে জাকারবার্গের প্রবন্ধের সবচেয়ে বড় দুর্বলতা সম্ভবত প্রযুক্তিগত নয়, বরং মানুষের সঙ্গে তাঁর দূরত্ব। স্মার্ট চশমা নিয়ে জনমনে যে গোপনীয়তা ও নজরদারির উদ্বেগ তৈরি হয়েছে, সেটিও তাঁর বক্তব্যে যথেষ্ট গুরুত্ব পায় না। একইভাবে সন্তানকে নিয়ে রান্নার জন্য এআই দিয়ে রেসিপি বেছে নেওয়া এবং স্বয়ংক্রিয়ভাবে উপকরণ অর্ডার করার উদাহরণও প্রযুক্তির মানবিক মূল্য নিয়ে অদ্ভুত এক ধারণা প্রকাশ করে। বাবা-মা ও সন্তানের একসঙ্গে কাজ শেখা, সময় কাটানো এবং নিজের হাতে কিছু করার অভিজ্ঞতাকে কেবল দক্ষতার ঘাটতি হিসেবে দেখা যায় না।

‘পার্সোনাল সুপারইন্টেলিজেন্স’ তাই এখনো একটি স্পষ্ট প্রযুক্তিগত রূপরেখার চেয়ে বেশি একটি আকর্ষণীয় ধারণা। এটি কীভাবে মানুষের জীবনে বাস্তব উপকার আনবে, কীভাবে ক্ষমতার কেন্দ্রীকরণ ঠেকাবে এবং এর সামাজিক ব্যয় কে বহন করবে—এসব প্রশ্নের উত্তর এখনো অস্পষ্ট।

জাকারবার্গের প্রচারণার সবচেয়ে বড় সমস্যা সেখানেই। এআইয়ের ভবিষ্যৎ নিয়ে মানুষকে আশ্বস্ত করতে শুধু ‘আমরা আপনাদের জন্য’ বলা যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন স্বচ্ছ নীতি, স্থায়ী আর্থিক দায়বদ্ধতা এবং এমন প্রযুক্তি ব্যবস্থা, যেখানে জনগণ কেবল ব্যবহারকারী নয়—সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রেও তাদের স্বার্থের বাস্তব মূল্য থাকে।