আফগানিস্তানে ২০২১ সালে তালেবান শাসন পুনঃপ্রতিষ্ঠার পর দেশটির অর্থনীতি বড় ধরনের সংকটে পড়েছে। অর্থনৈতিক সংকোচনের পর সামান্য ঘুরে দাঁড়ানোর লক্ষণ দেখা গেলেও মানুষের মাথাপিছু আয় কমছে, কর্মসংস্থানের সুযোগ সংকুচিত হচ্ছে এবং লাখ লাখ পরিবার ক্রমেই গভীর দারিদ্র্যের দিকে ঠেলে যাচ্ছে। এই পরিস্থিতির সবচেয়ে কঠিন বোঝা বহন করছেন নারী ও শিশুরা।
সঞ্চয় শেষ, সম্পদ বিক্রি
দেশটির সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার বাস্তব চিত্র দেখলে বোঝা যায়, দারিদ্র্য শুধু আয় কমে যাওয়ার বিষয় নয়। একটি পরিবার সংকটে পড়লে প্রথমে তারা নিজেদের সঞ্চয় ব্যবহার করে। এরপর প্রয়োজন হলে জমি, গবাদিপশু, গৃহস্থালির সামগ্রী কিংবা অন্য সম্পদ বিক্রি করে দেয়।
যাদের আগে ভালো চাকরি, কিছু সঞ্চয় ও সম্পদ ছিল, তারাও আকস্মিক অর্থনৈতিক ধাক্কায় দ্রুত নিঃস্ব হয়ে পড়ছেন। আর যারা আগে থেকেই দরিদ্র, তাদের সামনে সংকট মোকাবিলার সুযোগ আরও সীমিত।
পরিবারের হাতে থাকা শেষ সম্বলটুকুও যখন শেষ হয়ে যায়, তখন স্বজন, প্রতিবেশী কিংবা বাড়িওয়ালার কাছ থেকে ধার নেওয়া শুরু হয়। কিন্তু ঋণও যখন আর পাওয়া যায় না, তখন পরিবারগুলোকে আরও কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে হচ্ছে।
নারী ও শিশুরাই নামছেন আয়ের পথে
পরিবারের আয় কমে গেলে অনেক নারী ঘরে বসে অল্প পারিশ্রমিকের কাজ করছেন। কেউ কেউ রাস্তায় পণ্য বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছেন। শিশুরাও এই লড়াই থেকে বাদ যাচ্ছে না।
অনেক পরিবার ছেলেদের বিদ্যালয় থেকে সরিয়ে কাজে পাঠাচ্ছে। কেউ কেউ সন্তানদের এমন আবাসিক প্রতিষ্ঠানে পাঠাচ্ছেন, যেখানে অন্তত খাবার ও থাকার ব্যবস্থা পাওয়া যায়।
কিন্তু তাৎক্ষণিকভাবে পরিবারকে বাঁচানোর এসব পদক্ষেপ ভবিষ্যতের সম্ভাবনাকে আরও দুর্বল করে দিচ্ছে। শিক্ষা বন্ধ হয়ে যাচ্ছে, সম্পদ হারিয়ে যাচ্ছে এবং ভবিষ্যতে ভালো আয় করার সুযোগও কমে যাচ্ছে।
নারীদের জন্য সংকট আরও গভীর
আফগান নারীদের পরিস্থিতি আরও কঠিন হয়ে উঠেছে। শিক্ষা ও বেতনভিত্তিক কাজে নারীদের প্রবেশাধিকার কঠোরভাবে সীমিত হওয়ায় পরিবারের সংকট মোকাবিলায় তাদের হাতে থাকা পথও সংকুচিত হয়েছে।
বিশেষ করে যেসব পরিবারে কোনো পুরুষ উপার্জনকারী নেই, তাদের পরিস্থিতি ভয়াবহ। বিধবা মা অসুস্থ হয়ে কাজ করতে না পারলে পরিবারের দায়িত্ব কখনো কখনো ছোট মেয়ের কাঁধেও এসে পড়ছে।
এমনই এক ঘটনায় মাত্র ১১ বছর বয়সী এক মেয়েকে অসুস্থ মায়ের পরিবর্তে পরিবারের খরচ চালানোর চেষ্টা করতে হয়েছে।
একটি ধাক্কায় বদলে যাচ্ছে পুরো পরিবারের জীবন
আফগান পরিবারগুলোর দুর্দশার পেছনে শুধু দীর্ঘমেয়াদি দারিদ্র্য নয়, আকস্মিক ঘটনাও বড় ভূমিকা রাখছে। কাজ বন্ধ হয়ে যাওয়া, অসুস্থতা কিংবা পরিবারের উপার্জনক্ষম সদস্যের মৃত্যু মুহূর্তের মধ্যে একটি পরিবারকে চরম সংকটে ফেলতে পারে।
একজন বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষিকা চাকরি হারালে শুধু তার পরিবারই ক্ষতিগ্রস্ত হননি; তার অধীনে কাজ করা এক বিধবা পরিচ্ছন্নতাকর্মীও আয় হারিয়ে ভিক্ষা করতে বাধ্য হয়েছেন।
আবার কোনো ছেলে ইরান থেকে দেশে ফেরত পাঠানো হলে তার পাঠানো অর্থের ওপর নির্ভরশীল পুরো পরিবার এক রাতের মধ্যেই অর্থনৈতিক বিপর্যয়ের মুখে পড়তে পারে।
ইরান ও পাকিস্তান থেকে ফেরত আসার চাপ
আফগানিস্তানের অর্থনৈতিক সংকট আরও জটিল হয়েছে বিদেশে থাকা আফগানদের দেশে ফিরে আসার কারণে। ইরান ও পাকিস্তান থেকে লাখ লাখ আফগানকে ফিরে আসতে হচ্ছে। ফলে দেশে ফিরে আসা মানুষের জন্য কাজ, আয় ও বসবাসের সুযোগের ওপর নতুন চাপ তৈরি হচ্ছে।
অনেক পরিবার জীবিকার শেষ আশাটুকু হিসেবে ছেলেদের ঝুঁকিপূর্ণ পথে ইরানে পাঠাচ্ছে। উদ্দেশ্য একটাই—সন্তান সেখানে কাজ করে যে অর্থ পাঠাবে, তা দিয়ে দেশে থাকা পরিবারটি কোনোমতে টিকে থাকবে।
কিন্তু বিদেশে থাকা সেই উপার্জনক্ষম সন্তানও যদি আটক হয়ে দেশে ফেরত পাঠানো হয়, তাহলে তার ওপর নির্ভরশীল পরিবার মুহূর্তেই নিঃস্ব হয়ে যেতে পারে।
সাহায্যের সামাজিক বন্ধনেও চাপ
সংকটের মধ্যেও আফগান সমাজে আত্মীয়স্বজন, প্রতিবেশী ও পরিচিতদের পরস্পরকে সাহায্য করার প্রবণতা এখনো টিকে আছে। বিপদে পড়লে মানুষ একে অন্যকে ধার দেয়, খাবার বা আশ্রয়ের ব্যবস্থা করে এবং যতটা সম্ভব সহযোগিতা করে।
কিন্তু দীর্ঘস্থায়ী দারিদ্র্য এই সামাজিক সহায়তার ব্যবস্থার ওপরও চাপ তৈরি করছে। যখন একের পর এক পরিবার নিজেরাই সংকটে পড়ে, তখন অন্যকে সাহায্য করার সামর্থ্যও কমে যায়।
ফলে একটি পরিবারের সংকট ধীরে ধীরে আরেকটি পরিবারের ওপর ছড়িয়ে পড়ছে।
আজকের বাঁচা, কালকের ভবিষ্যৎ কেড়ে নিচ্ছে
আফগানিস্তানের এই পরিস্থিতির সবচেয়ে উদ্বেগজনক দিক হলো, পরিবারগুলো দারিদ্র্যের কাছে নিষ্ক্রিয়ভাবে আত্মসমর্পণ করছে না। তারা প্রতিদিন নতুন উপায় খুঁজছে বেঁচে থাকার জন্য।
কিন্তু একের পর এক বিকল্প শেষ হয়ে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে টিকে থাকার মূল্যও বাড়ছে। সঞ্চয় শেষ হচ্ছে, সম্পদ বিক্রি হচ্ছে, শিশুর পড়াশোনা বন্ধ হচ্ছে, নারীরা অল্প মজুরির কাজে নামছেন এবং তরুণদের ঝুঁকিপূর্ণ পথে বিদেশে পাঠানো হচ্ছে।
অর্থাৎ আজ একটি পরিবারকে বাঁচিয়ে রাখার যে সিদ্ধান্ত নেওয়া হচ্ছে, সেটিই অনেক সময় আগামী দিনের আয়, শিক্ষা ও নিরাপত্তার ভিত্তি দুর্বল করে দিচ্ছে।
শেষ পর্যন্ত কিছু পরিবার এমন এক পর্যায়ে পৌঁছে যাচ্ছে, যেখানে সন্তানদের ভবিষ্যৎ রক্ষা করা আর আজকের খাবারের ব্যবস্থা করার মধ্যে বেছে নিতে হচ্ছে। আর কোনো বাবা-মায়ের জন্য এর চেয়ে কঠিন সিদ্ধান্ত হয়তো আর কিছুই হতে পারে না।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















